দেশের বই ঈদ সাময়িকী

তৌফিকুর প্রামাণিক-এর ছোটগল্প ‘আত্মহত্যা’

শুক্রবার, ২১ মে ২০২১ | ৮:১৪ অপরাহ্ণ | 99 বার

তৌফিকুর প্রামাণিক-এর ছোটগল্প ‘আত্মহত্যা’

আত্মহত্যা
।। তৌফিকুর প্রামাণিক ।।


 

বাদলের দিন। তুমুলভাবে বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে ফসলের ক্ষেতে। মাত্র ধানগাছ থেকে দুধের মতো সাদা অংশটা বেরিয়েছে৷ বৃষ্টির এই অবিরত ধারা নিয়মিত চললে ফসলের যে আর প্রাণ থাকবে না৷ অকালেই ঝড়ে পড়ে যাবে। শোঁ শোঁ বাতাস বইছে আর মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি আর বাতাসের এ এক মনোমুগ্ধকর খেলা যেমন তেমনি অসহায়, দারিদ্র্য খেটে খাওয়া কৃষকের হাসি মুখখানিও কেমন বিষাদে ভরা। কেমন গোমরা মুখি৷ যারা ফসলের হাসিতে হাসে। যারা সোনালি ফসলের দোল খাওয়া দেখে দোল খায় আনন্দে। যাদের কেবলমাত্র একুটু ফসলই সারাজীবনের সঞ্চয় তাদের কাছে এই শোঁ শোঁ বাতাস আর বৃষ্টির খেলা মোটেই খুশির বার্তা নয়৷ বাতাসের সাথে ফসলগুলোও কেমন নাচানাচি করছে। দুধের মতো সাদা অংশটা যদি ঝড়ে যায় তবে আর ধান পাওয়া হলো না৷ যতদূর চোখ যায় এই ক্ষেতে ততদূর সবুজের সমারোহ। ততদূর হাসিমুখ। কিন্তু এই বর্ষা হাসি মুখখানি নিমেষেই অদৃশ্য করে দিচ্ছে। কৃষকের চোখে-মুখে যেন দুঃখের বন্যা বয়ে যাচ্ছে৷ এই দুশ্চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন৷

গ্রামের নাম সোনাকান্দি। ছোট্ট এই গ্রামটিতে শিক্ষার হার খুবই কম৷ শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়ার যে কেউ ছিল না। করুণ হতাশা আর বিষাদগ্রস্তে তাদের জীবন কাটে। সেই গ্রামেরই একজন সম্পদশালী লোক ফয়জার মিয়া৷ নাম ডাক ভালোই তবে আচরণ পশুদের চাইতেও ভয়ংকর রকমের৷ শুনেছি ছোটবেলা থেকেই নাকি এরূপ আচরণ করেন। মানুষটার বয়স ৫০ হবে। দেখতে ইয়া লম্বা, দরাজ কণ্ঠ, দেখলে যে কেউ মাথা নিচু করে সালাম দেয় একটু দূরে গেলেই মুখ ভরে থুথু ফেলে। তিনি যতটা সম্মান পান তা শুধু বাইরে থেকেই ভেতর থেকে ঘৃণা আর ঘৃণা। মানুষটা বড্ড অহংকারী। সম্পদের বড়াই আর কিছু নয়। বাবা পেয়েছিলেন তার বাবার থেকে ১০০ বিঘা জমি৷ ফয়জারকে দিয়ে গেলেন ৫০ বিঘা৷ এই জমিও এটা-ওটা করে শেষের পথে। অহংকারী মানুষের জমি আর কতদিনই বা থাকে।
ইটের বাড়ি, শ্যাওলা ধরেছে কিছুটা। মানুষটার বয়সের সাথে সাথে বাড়িটাও বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। মানুষের ভালো ব্যবহার চিরকালই নতুন। কিন্তু বাড়ি কিছুদিন পর ক্ষয়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়, আবার মেরামত করা লাগে৷ মানুষ চাইলেই আচরণের মেরামত করতে পারে৷ কিন্তু বংশ পরম্পরায় যে এই অহংকারটাই তাদের অমূল্য সম্পদ।

ফয়জারের দুই ছেলে এক মেয়ে। ছেলে দুজন ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করে৷ বিয়ে করে ঘর-সংসার করছেন। দুজনেরই একটি করে মেয়ে। মেয়ে দু’টির পিঠাপিঠি জন্ম। বয়স এক বছরের নিচে। ছেলে দুজনের প্রশংসা করতেই হয়। দেখতে যেমন ফর্সা কমলালেবুর মতো চেহারা তেমনি আচরণও মাশাল্লাহ অনেক ভালো। তবে বাবার মতো রগচটা নয়।
ফয়জার মিয়ার শেষজন মেয়ে। মেয়েটি ঠিক উলটো ইনি হয়েছেন বাবার মতো। বয়সের হিসেব করলে ২০-এর নিচেই হবে। এইবার এসএসসিতে পৌরনীতি বিষয়ে পাশ করতে পারেনি৷ এ নিয়ে বাবার তো মহারাগ। তোকে পড়াশুনা করিয়ে আমার টাকা নষ্ট শুধু শুধু। তুই বিয়ের জন্য প্রস্তুত হ। মেয়েতো শুনেই নেচে উঠলো। বিয়ের জন্য পাত্র দেখা হচ্ছে। যে কোনো ছেলে দেখলেই অপছন্দ করতে পারবে না। শুধু রক্তে যে বইছে বাবার হিংস্র আচরণ!

ফয়জার মিয়ার জমির সাথে গা ঘেষে আছে অনেকের জমি। অন্যদের থেকে জমিতে অর্থ একটু বেশি খরচ করায় ফলনও অন্যদের থেকে ভালো পান৷ ফারাক্কায় তার সব জমি। উঁচু করে বাঁধা একটা জায়গায় তার লাগা অনেকগুলো ইউক্যালিপটাস, মেহগনির গাছ রয়েছে। গাছের ছায়ায় রহিমের জমি অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। সূর্যের আলো না পেলে কোনো ফসলই ভালো হয় না৷ রহিমের জমি এক বিঘা। তার অনেকটা অংশই গাছের ছায়ায় ঢেকে যায়। এ নিয়ে ফয়জার মিয়ার সাথে কথা বলতেও ভয় পান। কি জানি কী করে বসেন এই ভয়ে। গাছের পাতা দিয়ে ভরে থাকে জমির দক্ষিণের অনেকটা অংশ৷
শুধু রহিমের জমি না অনেকের জমি এই গাছের ছায়ায় নষ্ট হয়। সবাই এক হয়ে যখন ফয়জারের কাছে যায়, তখন ছেলেদের চাপে তিনি গাছের ডালাপালাগুলো কেটে দেন যাতে করে আর জমিতে ছায়া না পড়ে৷ এটা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেন৷
ফয়জার উঠোনে বসে আছে৷ বৃষ্টি একটু থেমেছে। ইজি চেয়ারে বসে আছেন। একটু শীত শীত লাগায় গায়ে চাদর জড়িয়ে আছেন৷ চোখে একটা পুরনো ফ্রেমের চশমা৷ চশমাটার বয়স হয়েছে। পায়ের ওপর পা দিয়ে ধোঁয়া ওঠা চা খাচ্ছেন। বৃষ্টির দিনে গরম গরম চা মন্দ নয়৷ ভেতর থেকে আলাদা একটা অনুভূতি আসে ভালো লাগার অনুভূতি। আহা!এই অনুভূতিটা যদি সারাজীবন থাকতো! কয়েকটা নেংটো ছেলে তার উঠোনের সামনে কাঁদা মাখামাখি
করছে৷ ফয়জার অনেকক্ষণ তাদের দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকলেন৷ তিনি ফিরে গেলেন শৈশবে৷ দিন গড়িয়ে রাত এলেও শৈশব ফিরে আসে না। সেই ছোটবেলায় এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ফুটবল খেলেছি। সারা শরীর কাঁদায় মেখে, কাঁধে একটা কলাগাছের বন্দুক বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছি। সেই ছেলেবেলা ন্যাংটো হয়ে পুকুরে খেলা করেছি। ছুলছুল খেলা। ডুব দিয়ে কে কার মাথা ছুতে পারে। বন্যা আসলে বন্যার পানিতে জাল ফেলে মাছ ধরার কথা আমরণ বেঁচে থাকবে। সেই মোয়া মাছ জাল ভরে ওঠা, পুটি মাছ, মাঝেমধ্যে নদী থেকে আসা বোয়াল, চিতল মাছের ফলফলা হাসিমুখ৷ সেই ছেলেবেলা নাক ধরে পুল থেকে ঝাঁপ দেয়া।ঝাঁপের পর কারো মালকোচা খুলে গেলে সে কি যে বিরক্তিকর একটা অবস্থা। মালকোচা খুলে গেলে সাঁতার কাটার মতো এত কষ্ট আর নেই তাও আবার যদি হয় গভীর।
সেই ছেলেবেলা এইরকম বর্ষার দিনে ভিজে ভিজে স্কুলে যাওয়া। সাদা শার্টের তিলে ধরা দাগটা এখনও চোখে ভাসে৷ অনেকেরই ছাতা ছিল না সে সময়। ব্যাগও ছিল না যে বই খাতাগুলোকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানো যায়। পলিথিনে মুড়ে রাখতো সবাই৷ আর যাদের ছাতা নেই কলার বড় বড় পাতা মাথার ওপরে রাখতো যাতে বৃষ্টির ফোটা মাথায় না পড়ে। ভিজে ভিজে বাড়ি ফিরলে মা গামছা দিয়ে মাথাটা ভালোভাবে মুছে দিত। তারপর সরিষার তেল বেশি করে নিয়ে মাথায় ঘষে দিত। আঁচল দিয়ে মুখখানি মুছে দিয়ে বলত, আর বাইরে যাস না। কম্বল গায়ে সুয়ে পরে ঘুমা।
মাঝরাতে মা জেগে উঠে কপালে হাত রেখে দেখতো শরীরের তাপমাত্রাটা বেড়েছে কি না। আমরা তো এখন জ্বর মাপা থার্মোমিটার পেয়েছি। বিদেশে পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে এসেছে মাত্র কয়েকবছর হলো৷ মায়েরা হাত দিয়েই বুঝতে পারতেন সন্তানের জ্বর কি না। তাদের থার্মোমিটার লাগে না৷
কিছুক্ষণ পর ফয়জার মিয়া একটা ধমকের স্বরে ছোট ছোট বাচ্চাদের তাড়িয়ে দিলেন৷
বাচ্চাগুলো দৌড়ে ওখান থেকে সরে গেল৷ একজন দৌড়াতে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। কান্না শুরু করে দিলে মা এসে পাছায় কয়েকটা কষা থাপ্পর মেরে বলল, ‘তোকে বাইরে আইতে কইছে কেডা। তোরে কই নাই শরীলে কাঁদা ভরাবি না৷ তোর বাপের কত টেকা আছে যে, তোরে সাপান কিনে দিব।’ গ্রামের ছেলেমেয়েরা একটু সৌখিন হলেই মায়েরা সবসময় বাবাকে খোটা দিয়ে বলেন, ‘তোর বাপের কয় লাখ টেকা আছে। এহ্! জমিদার হয়া গেছে।’

এখন আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি পড়া আপাতত বন্ধ আছে। গ্রামের সব বাবারা গেলেন জমি দেখতে। কিছু কিছু জায়গায় ফসলগুলো হেলে পড়েছে। ওগুলো দাঁড় করিয়ে রাখলেন৷ কাঁধে একটা গামছা নিয়ে রহিম তার জমির দিকেই আসছেন।
রহিমের চোখ পড়ল ফয়জার মিয়ার দিকে। ফয়জার মিয়াও ধীরে ধীরে দুঃশ্চিন্তা মন নিয়ে এদিকেই আসছেন।
‘ভাইজান, আসসালামু আলাইকুম।’
‘অলাইকুম আসসালাম।’
‘ভাইজানের শরীর কেমন?’
‘এই আল্লাহ যেমন রাখে। তা রহিম তোমার ত দেখি ভালোই ফসল বাড়তেছে। এইবার বন্যা না হইলে ভালা ফলন পাবা মনে হইতেছে৷’
‘সে তো খোদাতালার মেহেরবানি।’ রহিমের মুখে একটু চাপা হাসির ঝলক৷
‘ভাইজান, আফনের জমিও কিন্তু মাশাল্লাহ ভালোই হইছে।’ ‘রহিম, তুমি ত জানোই আমি সচরাচর ভালোই ফলন পাই৷ তয় এবারে একটু সমস্যার মধ্যে আছি।’
‘কী সমস্যা ভাইজান।’
‘এই যে আগের থাইকা মানুষের গরু-ছাগলটা একটু বেশি পালন হইতাছে। উৎপাতটা একটু বাড়ছে। শুনলাম, তুমি নাকি আরও ছাগল কিনছো?’
‘হ ভাইজান। কী করুম অভাবের সংসার৷ মাইয়াটার লেহাপড়া৷ কেমনে যে সংসার চালামু এইডা ভাইবা চোখের জল থামায় রাখতে পারি না। তাই ঠিক করছি এই ছাগল বড় কইরা বাজারে বেইচা মাইয়াডারে কলেজে পড়ামু।’
ফয়জার হাসলেন হো হো করে৷ ‘তোমার মাইয়রে কলেজে পড়াবা৷’
‘হ ভাইজান, ডাক্তার বানামু৷ এই গেরামে ত একজনও ডাক্তার নাই। আমার মাইয়া হবো এই গেরামের প্রথ্থম ডাক্তার। আমি কইছি তুই ডাক্তার হইলে এই গেরামের মানুষের চিকিৎসা বিনামূল্যে করবি। কতজন আছে চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। টাকা-পয়সার অভাবে অকালেই কত শিশু, যোয়ান, বৃদ্ধ মারা যায়। আল্লাহ না করুক৷ ভাইজান দেইখেন এই গ্রামটা কত বদলায় যাইবো। সবাই পড়ালেহা করবো, শিক্ষিত হইব। ভালা মানুষ হইব৷ এই গ্রাম হইব আলোকিত গ্রাম।’
ফয়জার বললেন, ‘এইবার থামো রহিম মিয়া৷ আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন আর দেইখো না। গরীবের আবার পড়ালেখা। মাইয়া নাকি আবার ডাক্তার হইব। তোমার কোনো ধারণা আছে ডাক্তার হইতে কত টাহা লাগে। নিজেরে বেঁচলেও ডাক্তার বানাইতে পারবা না।
যেটা তোমারে বলতেছিলাম। ছাগলগুলারে সাবধানে রাইখো। আমার ফসলের ধারে কাছে যেন না আসে। কখনও যদি দেহি তোমার ছাগল আমার ফসলে মুখ লাগাইছে ওখানে কুরবানি দিমু কথাটা মাথায় রাইখো।’
‘আইচ্ছা ভাইজান।’
ফয়জার মিয়া চলে গেলেন৷ রহিমের আর মন খারাপ লাগে না তার কথায়। এগুলো শুনতে শুনতে অভ্যস্ত তিনি৷
মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘আমি ত আমার মাইয়ারে ডাক্তার বানায় ছাড়মু দেহি কে আটকায়।’ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ তুমিই মেহেরবান৷ আমার একটু সহায় হয় রহম করো। আমার মাইয়া যাতে ডাক্তার হয়।’
হঠাৎ আকাশ গর্জন দিয়ে উঠলো। আবার গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। রহিম ঘরে ফিরলেন। কিন্তু কিছুতেই ফয়জার মিয়ার কথাটা মাথা থেকে সরাতে পাচ্ছেন না।

রহিমের মেয়ের নাম রিমু। রিমু এবার ইন্টারমেডিয়েটে উঠলো। সায়েন্সের স্টুডেন্ট। অনেক মেধাবী। এই দরিদ্র পরিবার থেকে পড়ালেখা করা যে কত কষ্টের সেটা শুধু ঐ পরিবারগুলোই জানে। তার মধ্যে আবার সায়েন্সের পাঁচ ছয়টা প্রাইভেট। রিমু অবশ্য তার পাশের ঘরের এক বড় ভাইয়ের কাছে পড়েন। এতে টাকা-পয়সা কম লাগে। এবারে বৃত্তি পেয়েছেন এসএসসিতে। গোলগাল চেহারা শ্যামা বর্ণের। সাজগোজ বলতে যে একটা জিনিস আছে মেয়েদের তা তিনি তা জানেনই না। সাজলে মেয়েদের সুন্দর থেকে আরও সুন্দর দেখায় কিন্তু এই মেয়েটা? এই মেয়েটা না সাজলেও চোখ ফেরানো কষ্টসাধ্য। চোখের নিচে ছোট্ট একটা তিল আছে। আহা! মুগ্ধ হবার মতো। ভ্রু যেন পার্লার থেকে সাজিয়েছেন অথচ কোথাও সাইনবোর্ডে পার্লারের নাম দেখলেও চোখ সরিয়ে নেন। গরীবের যে বড়লোকি করার অধিকার নেই এটা হয়তো ভেবেই মুখ ফিরিয়ে নেন।
কখনো কখনো চতুর্ভূজের মতো ছোট্ট একটা আয়নায় নিজের চেহারা দেখেন। চুলগুলো একটু এলোমেলো করেন।মাঝেমধ্যে কপালে একটা টিপ দেন। পরক্ষণেই আবার টিপ ফেলে দেন। আয়নার দিকে তাকালে নিজের জন্যই কেমন মায়া হয়। বাবা এত খাটুনি করে মুখে এক লোকমা ভাতের দানা তুলে দেন। পড়ালেখার টাকা দেন৷ আমাকে তো ডাক্তার হতেই হবে৷ এই একটা স্বপ্ন বুকে নিয়ে মেয়েটি সারাক্ষণ পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ডাক্তার হলেই যে বাবার খাটুনিটা একেবারেই থাকবে না। শেষ বয়সে বাবা একটু শান্তিতে ঘুমোতে পারবে।

রাত হয়েছে। মেয়ের পাশে বসে রহিম বললেন, ‘কীরে মা ঘুমাবি না। মেলা রাইত হইছো তো।’
‘বাবা, আরেকটু পড়ি। নাইলে যে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যাবে।’
রহিম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা পড়। তয় বেশি রাইত জাগিস না। শরীল খারাপ করবো।
‘বাবা, তুমি কোনো টেনশন করো না তো। যাও ঘুমাও।’
‘আচ্ছা মা, পড়। তাড়াতাড়ি ঘুমাইস।’
‘আচ্ছা৷’
রিমু ফিজিক্স বইটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। বইয়ের ভেতর যে একটা দশ টাকার নোট কবে রেখেছিল রিমুর মনেই ছিল না। বইয়ের পাতা উলটাতেই দেখলো একটা দশ টাকার নোট। নোটটার মাঝখান দিয়ে সাদা টেপ মারা। টাকাটা হাতে নিয়ে এপাশ ওপাশ করে দেখলেন। টাকাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল যদি এই টাকাটা কখনোও পাই তাহলে টাকাটা দিয়ে বাবার এক প্যাকেট মধুবিড়ি কিনে দেব। রিমু বিছানায় বসে ফিজিক্সের ম্যাথ করা শুরু করলো। হঠাৎ আবার বৃষ্টি টপটপ টিনের চালে পড়ছে। যারা ছাদ পেটানো ঘরে ঘুমায় তাড়া জানেই না যে বৃষ্টি টিনের চালে পড়লে কেমন এক অনুভূতি কাজ করে। টিনের চালের ফুটা বেয়ে চুয়ে চুয়ে পানি পড়ছে টেবিলের উপরে। রিমু দৌড়ে গিয়ে একটা বাটি এনে তাতে দিলো। এ রকম অসংখ্য ফুটা রয়েছে তাদের ঘরে। শুধুমাত্র একটি ফুটা তার টেবিলের উপর। জানালাটা খোলা ছিল। হালকা বাতাসে জানালাটা দুলে দুলে শব্দ করছে। রিমু জানালা দিয়ে হাত বের করে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখলে শরীরটা কেমন কাঁপিয়ে উঠলো। বৃষ্টির কিছু ছিঁটেফোটা তার শরীরে লেগে থাকলো। অন্য ঘরে মা-বাবা না ঘুমিয়ে জেগে জেগে মেয়ের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলছে।
‘কী গো রিমুর বাপ, মাইয়াটা কি সত্যিই সত্যিই ডাক্তার হইব?’
‘কী যে কও না তুমি? হইব না ক্যান? হইব হইব। তুমি দেইখো একদিন ঠিকই হইবো।’
‘আল্লাহ যেন আমার মাইয়াটারে অনেক বড় ডাক্তার বানায়। আমারে তহন মানষে ডাক্তারের মাও বইলা ডাকবো। আমার ভাবতেও আনন্দ লাগতাছে।’
‘তোমাকেই শুধু ডাকবো, আমাকে ডাকবো না? আমাকে ডাক্তারের বাপ বইলা ডাকবো। দেইখো গ্রামে আমাদের একটা আলাদা সম্মান থাকব। লোকে আমাগোরে সালাম দিব সালাম।’
‘তাই যেন হয় রিমুর বাপ। মাইয়াটারে ত ঠিক মতোন ভালো পুষ্টিকর খাওয়ন দিতে পারি না। ভালো খাওয়ন না দিলে পড়া মনে রাখবো কেমনে।’
‘তুমি কোনো চিন্তা কইরো না রিমুর মাও৷ আমি আছি না? আল্লাহ আমাদের সহায় থাকলে আমাদের কোনো অসুবিধা হইবো না। তুমি নামাজ পইরা দোয়া কইরো। আল্লাহর কাছে চাইও। গত জুম্মায় আমাগো মসজিদের ইমাম কইছে,বাপ মার দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। সুবহানাল্লাহ।’
‘আমি বেশি বেশি কইরা দোয়া করমু। তোমার জন্য করমু, তোমার মাইয়ার জন্য করমু। আমাগো পূর্বপুরুষের লাইগা করমু।’
‘আরও কী কইছে জানো? যে বাপ মার কথা শুইনা চলবো তার পরকালে জান্নাত পাইবো। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। আমাগো মাইয়া ত কহনও আমাগো কথার অবাধ্য হয় নাই। দেইখো দুনিয়ায় যেমন ও শান্তিতে থাকবো পরকালেও থাকবো। ইনশাআল্লাহ বলো?’
রিমুর মা ইনশাআল্লাহ বললেন৷
‘দেখো তো মাইয়াটা ঘুমাইছে কি না?’
‘না থাক আমারে যাইতে নিষেধ করছে।’
‘আচ্ছা এহন ঘুমাও।’

বৃষ্টি এখনও অবিরত পড়ছে। রিমু অনেকক্ষণ বিছানায় বসে বসে কী যেন ভাবলেন। তারপর কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

সকাল হয়েছে। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যাচ্ছে। তবে অন্যদিনের থেকে আজকে একটু সূর্যের ঝলকানো হাসি দেখা গেল। রিমুর জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে তার বিছানার উপর পড়ছে।
এদিকে রিমুর বাবা খুব ভোরেই অন্যের জমিতে কাজ করতে বেরিয়ে পড়েন। মা রান্নাঘরে আলু কুটছেন।
‘মা, আজকে কী রাধছো?’
‘এই ত রে মা, আলু, বেগুন দিয়া ঝোল। সাথে ডিম ভাজিও আছে। তোর জন্যে ডিম পোচ কইরা দিমুনে। তুই খাস।’ ‘আইচ্ছা মা।’ এই বলে রিমু চলে গেল৷
রিমুদের ছাগল ৪ টা। কালো রংয়ের সবগুলাই। ছাগলগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জমির আইলের ধারে যে দূর্বাঘাস থাকে ওগুলোতে ছাগলগুলোর বিচরণ। ভ্যা ভ্যা করছে আর ঘাস খাচ্ছে। ছাগলগুলো খেতে খেতে ফয়জারের জমির কাছে চলে এসেছে। ফয়জারের জমির ধান খেতে একটা ছাগল মুখ লাগিয়ে খাওয়া শুরু করলো। অনেকক্ষণ যাবত খাচ্ছে। কোথাও কেউ নেই এসময়। শুধু শনশন বাতাস আর রোদের ঝলমলে তীব্র হাসি। বর্ষার এমন দিনে হুট করেই সূর্য হারিয়ে যাবে কয়েকদিনের জন্য।
কিছুক্ষণ পর ফয়জার তার জমির দিকেই আসছে। তিনি দূর থেকেই দেখলেন তার জমিতে কিছু ছাগল ধানগাছ খাচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরেই আসলেন। একটা ছাগলের থুতনিতে কিছু দাঁড়ি ছিল। এটাই বোধহয় সব থেকে বয়স্ক ছাগল। এই বৃদ্ধ ছাগলটাকে ধরতে পারলেও বাকিগুলা দৌড়ে পালায়। ছাগলটাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসলেন। অনেক বিশ্রী বিশ্রী ভাষায় ছাগলটাকে গালি দিলেন। ঘর থেকে একটা কাঁচি এনে ছাগলটার দাঁড়িগুলো কেটে দিলেন। ছাগলটা লাফালাফি করেও রেহাই পেলো না। এবার ফয়জার ছাগলটার হাত-পা বেঁধে তার বড় পুকুরে ফেলে দিলেন। কিছু লোক এই দৃশ্য স্বচোখে দেখলেন। কিন্তু কিছুই বলতে পারলেন না। মনে মনে শুধুই ছি ছি করে মুখ ভরে থুথু ফেলা ছাড়া আর যে তাদের কিছুই করার নেই। ক্ষমতা থাকলে সবকিছুই করা যায়।
রবীঠাকুর বলে গেছেন, গায়ের জোরে সব কাজ করা যায় কিন্তু গরু হওয়া যায় না।
ছাগলটা দাপাতে দাপাতে পানির নিচে তলিয়ে গেল। এই খবরটা রহিমের কানে পৌঁছালে রহিম ছুটে আসেন ফয়জারের বাড়িতে। ফয়জার বিড়িতে সুখ নিয়ে টান দিচ্ছেন। যেন তিনি কোনো মহৎ কাজ করে ফেলেছেন। রহিম তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভাইজান আমার ছাগলটারে এইভাবে মাইরা ফেললেন?’
‘রহিম, তোমারে আগেই বলছি আমার জমির ধারে কাছেও যদি তোমার ছাগলরে দেহি তাহলে ভালো হবে না। আইজ তোমার ছাগল আমার ধানগাছ খাইছে তাই ওরে ধইরা পানিতে ফেলায় দিছি। শরীর ভালা না তাই বাকিদের ধরতে পারি নাই।’
রহিম বলল, ‘ভাইজান কাজটা কিন্তু ভালা করলেন না। এর বিচার আল্লাহ করবো।’ চোখ বেয়ে দু’ফোটা চোখের জল ফেলা ছাড়া রহিমের আর কি বা করার আছে৷

কয়েকদিন হয়ে গেল। মনে হচ্ছে এই যে ছাগলটা রহিমের সামনেই আছে। মুখ নাড়িয়ে ঘাস চিবুচ্ছে। এই যে এখনই গুটির ন্যায় পায়খানা করলো। ভোর হলেই ছাগলগুলো ডাকাডাকি করে, মাঝরাতেও পাল্লা দেয়।
শিয়ালের ডাক কানে এলেই ছটফটিয়ে লাফালাফি করে।
কোনোমতেই রহিম ছাগলটাকে ভুলতে পারছে না।
রিমুরও মন খারাপ। রিমু বাকি ছাগলদের গা ছুঁয়ে আদর করছে। নিয়ম করে ঘাস, কাঠাল পাতা, নিম পাতা খেতে দিচ্ছে।

কিছুদিন পর। রিমুর বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হওয়া অবস্থা। সাধারণত সন্ধ্যার বাহিরে রিমু বের হয় না বাড়ির ঐ উঠোনটা ছাড়া। রাতে ভয় পায়। একা একলা একটা মেয়ে অন্ধকার বাঁশঝাড় পেরিয়ে মাথা নিচু করে জোরে জোরে পা ফেলে বাড়ির দিকেই আসছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কোথাও কেউ নেই। শুধু মনে হচ্ছে এখনই কোনো ভূত এসে তার সামনে দাঁড়াবে আর রিমু চিৎকার দিয়ে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। ফয়জার মিয়া এই পথেই দাঁড়িয়ে আছে লাইট নিয়ে। গায়ে একটা কালো মোটা চাদর। চোখে ঐ চশমা। পরণে লুঙ্গি আর হাফ শার্ট সাদা রংয়ের। রিমু দেখার সাথে সালাম দিলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’
‘অলাইকুম আসসালাম। কেমন আছো রিমু?’
‘জ্বী ভালো। আপনি কেমন আছেন?’
‘এই ত আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ রাখছে ভালো।’
‘তা কোথায় গেছলা?’
‘এই পড়তে গেছলাম।’
‘শুনলাম তুমি নাকি বড় ডাক্তার হইবা?’
‘আপনাদের দোয়ায় ইনশাআল্লাহ। স্বপ্নত আছে বাকিটা আল্লাহর উপর। আমি যাই রাইত হয়ে যাইতেছে। মা দুঃশ্চিন্তা করবো।’
‘রিমু দাঁড়াও দাঁড়াও, কই যাইতেছো। ভদ্রতাও শেখো নাই আমি তোমারে যাইতে কইছি?’
‘না মানে, রাইত হইয়া যাইতেছে তাই।’
‘আমি রাইখা আসমু সমস্যা নাই।’
‘আপনি কিছু বললে বলেন তাড়াতাড়ি।’
রিমুর শরীর কাঁপছে৷। তার ইচ্ছে হচ্ছে দৌঁড়ে যেতে এই অমানুষটার কাছ থেকে। রিমুর কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে আসছে। শরীর ঘামতে শুরু করেছে।

‘কীরে মা? তোর মন খারাপ?’
‘না মা, এমনি ভাল্লাগছে না।’
‘তোর কী হয়েছে আমাকে বল। মায়ের কাছে লুকাস না। তোর চেহারাই বলে দিচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।’
‘বললাম ত কিছু হয়নি। তুমি এখন যাও ভাল্লাগছে না।’
সকাল হয়েছে। পৃথিবীর সবাই নিয়ম করে ঘুম থেকে উঠেছে।পাখিরা আকাশে উড়ছে, হাসেরা পানিতে খেলছে, ছোট ছোট বাচ্চারা ন্যাংটো হয়ে কাঁদায় মাখছে। জেলেরা মাছ ধরছে। নিয়ম করে সব চলছে। শুধু রিমু ঘুম থেকে ওঠেনি। আর কখনোই ঘুম থেকে উঠবে না সে। সেদিন রাতেই চলে গেছে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না ফেরার দেশে। সাধারণ মৃত্যু নয়। ‘আত্মহত্যা’। রহিম আর রিমুর মা অনেকক্ষণ যাবত মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। কিছু কিছু মানুষ শুধু স্বপ্নই দেখে পূরণ আর হয়ে ওঠে না। রিমু আর কখনও ডাক্তার হতে পারবে না। রিমুর স্বপ্ন অকালেই ঝড়ে পড়ল।
সেদিন সন্ধ্যায় ফয়জার রিমুকে ধর্ষণ করে। রিমুর নরম মোলায়েম শরীরে ফয়জার কলংকের দাগ লাগায়। রিমু চিৎকার করলেও কেউ সেদিন এগিয়ে আসেনি। রিমুর নিষ্পাপ দেহখান ফয়জার মিয়া কি অবলীলায় ভক্ষণ করেছে সেদিন। সেই লজ্জা আর অপমানে রিমু আত্মহত্যা করেছে। রায়হানের মা ছাড়া এই ঘটনা কেউ জানে না। তখন রায়হানের মা রাস্তার পাশেই ছিল। রিমুর এমন অবস্থা দেখে শুধু দু’ফোটা চোখের জল ফেলেছেন।
রিমুর আত্মহত্যার কারণ রায়হানের মা ছাড়া কেউ জানে না। সবাই রিমুকে দেখতে এলো। রিমুর ঐ কলঙ্কিত দেহ সবাই একনজর দেখলো। যার পুরোটা জুড়ে ছিল স্বপ্ন আর স্বপ্ন। শুধু তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। মৃত্যুবরণ করেছে বাপ-মায়ের স্বপ্নও।
রিমুর মৃত্যুর একদিন পর রায়হানের মা রহিমকে সব খুলে বলে। রহিম চুপচাপ সব শুনে যায়।
পরেরদিন রাতে। রান্না করা বটি গামছায় পেঁচিয়ে রহিম রওনা হয় ফয়জারের বাড়ি। বাড়ির পেছন দিক দিয়ে রহিম প্রবেশ করে দেয়াল টপকে জাম্বুরা গাছটার নিচে। ফয়জার বাথরুম থেকে ঘরের দিকে যাচ্ছিল। রহিম ধারালো বটি দিয়ে ফয়জারের গলায় মারে। ঘটনাস্থলেই ফয়জার মৃত্যুবরণ করে। তাজা টকটকে রক্ত বটিতে লেগে আছে। চিরিত করে কিছু রক্ত রহিমের চোখে-মুখে লাগে। রহিম গামছা দিয়ে বটিটা মুছে দেয়াল টপকে চলে গেল। ফয়জারের চিৎকারে সবাই ছুটে এলো। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হলো না। নিজের মেয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ মৃত্যু দিয়েই নিলো রহিম।

তারপর থেকে রহিমকে আর গ্রামে দেখা যায়নি। রিমুর মাও আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে মেয়ের পাশেই ঘুমিয়ে পড়লেন চিরদিনের মতো।

Facebook Comments Box