তেইল্যা চোরা : সমাজ বর্জিত মানুষের গল্প

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:৫৮ অপরাহ্ণ | 118 বার

তেইল্যা চোরা : সমাজ বর্জিত মানুষের গল্প

লেখকের ভাষ্যমতে মুক্তিযুদ্ধের আছে সাত কোটি বিচিত্র আনন্দ ও বিষাদের গল্প । আর সেই গল্পগুলোর আছে নানান চরিত্র, যারা মুক্তির অকাট্য আন্দোলনকে দেখেছে নিজের মতো করে । যুদ্ধের বাজারে ধনী-গরিব সবাই সমান ,এখানে কে কার ক্ষেতের আলু চুরি করলো আর কার সাথে কার বংশপরম্পরাইয়ের দ্বন্দ্ব এগুলো বিবেচনায় আসে না । অনেক নদীর স্রোত যখন একমুখি হয়ে তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়, তখন তাদের লক্ষ্য থাকে একটাই- আর তা হলো সমুদ্র। যুদ্ধের সে ভয়াল কষাঘাত হিন্দু-মুসলিমকে ভাত খাওয়ায় এক পাতে, চোর-সাধুদের ঘুম পাড়ায় এক বিছানায়। এখানে সুযোগ নেই আবদারের বা অভিযোগের। কারণ শ্রেণি বৈষম্যের থেকেও তাদের কাছে এখন মুখ্য তাদের অধিকার আদায় আর মুক্তির আস্বাদন করা।

‘তেইল্যা চোরা’ সেই সাত কোটি বিচিত্র গল্পের একজন প্রতিনিধি । তবে এই গল্পের চরিত্রগুলো হলো মানবীয় আদর্শের বাহিরে থাকা কতগুলো বিচ্ছিন্ন মানুষ, যারা সমাজ বর্জিত এবং মানুষের চোখে ঘৃণিত ও অবহেলিত । মানুষের অশ্রাব্য অভিশাপে শুরু হয় তাদের দিন আর এর মুক্তি মেলে মাঝরাতের অন্তিম কান্নায়। এমন একটি চরিত্রের বাস এই গল্পে, যার নাম নাদির গুণ্ডা । গল্পে তার স্থান ও সংলাপ সামান্যের থেকেও অনেক কম। তবুও নিকৃষ্ট এই চরিত্রে অনুভাবের প্রভাব পরে গল্পের অন্যান্য চরিত্রগুলোর মাঝে। বিশেষ করে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ফজর আলীর উপরে। যাকে সবাই চেনে তেইল্লা চোরা নামে।

কাইল্লা চোরা কসর আলীর সুযোগ্য পুত্র আমাদের এই তেইল্লা চোরা। সমাজে চোর থাকে দুই ধরনের- স্বভাবের আর পেটের।সাধারণত, স্বভাবের চোরদের তোয়াজ করতে আমাদের ধর্মে বাধে না কিন্তু পেটের ক্ষুধা নিবারণের নিমিত্তে চোরদের জন্য আমাদের আছে নিয়ম কানুন আর সালিশ-আদালত। সেই ক্ষুধার চোরদের বিচার-সালিশে থাকেন আমাদের স্বভাবের চোরেরা ,মানুষের চোখে তারা আদর্শ এর প্রতিমূর্তি। তাদের বিচারে একঘরে করে রাখা হয় ফজর আলী নামের তেইল্লা চোরাদের। তাদের দেয়া হয় না কোনো কাজের এলান বা কর্মের সুযোগ। কারণ সমাজে তাদের পরিচয় চোর ও ডাকাত। এরাও স্বপ্ন দেখে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের কিন্তু সমাজে ক্ষুধার চোরদের থেকে স্বভাবের চোরদের সম্মান ও চাহিদা থাকে সব সময় বেশি। এতকিছুর মাঝেও তারা পণ করে সন্তানদের নামে ছেড়ে দেবে সেই অকৃতজ্ঞ পথকে, যেখানে এক লোকমা ভাতের সাথে মিশে থাকে অজস্র অভিশাপ আর ঘৃণা।

তেইল্যা চোরাও তাদের একজন, কোনো এক রাতে অভিমানী স্ত্রী আমেনার কাছে একমাত্র পুত্র মজিদের কসম খেয়ে সেও ফিরে আসতে চায় স্বাভাবিক একটা জীবনে। যেখানে আমেনাকে শুনতে হবে না কোনো অশ্রাব্য অপমান, সন্তান মজিদকে পেতে হবে না মিথ্যে অন্যায়ের শাস্তি। সেখানে ক্ষুধার নিবারণ হবে সততায় আর নিষ্ঠার ছুপছুপে ঘামে। কিন্তু সমাজ ব্যাবস্থায় ক্ষুধার চোরদের হার মানতে হয় স্বভাবের চোরদের কাছে। দোষ না করেও তাদের হাতে পরে আইনের হাতকড়া, অথচ সেই হাত অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে সব অতীত কুকর্ম। তেইল্লা চোরা ফজর আলী নিজের সততাকে যতোই প্রমাণ করতে চাক না কেনো তা সব কিছুর নষ্ট সমাজের কাছে শূন্য ও মূল্যহীন।

বলা হয় জীবন আকাশের রং থেকেও দ্রুত মোড় পাল্টায়। কারাগারের চারদেয়ালের মাঝে ফজরের দেখা হয় জীবনের অন্য চরিত্রের যারা সবাই অপরাধী, কেউ খুনের অথবা চুরির আর কেউ বা আদর্শের। সবার আছে ফজরের মতো নিজেদের নিরাপরাধের গল্প আর চাপা দীর্ঘশ্বাস। মাঝে মাঝে তারা শেখ সাহেব আর আইয়ূব সাহবকে নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। মজিদ নিরবে কান পেতে সব শুনতে পায়, কিন্তু অজ্ঞতার দরুন সে জানে না মুক্তিযুদ্ধ কি। সে শুধুই জানে আমেনার নিরব অভিমানকে আর খুঁজে বেড়ায় সন্তান মজিদের স্মৃতিগুলোকে। ইউসুফ মুন্সী বা সুজনের কাছে জানতে পারা সেই যুদ্ধের থেকেও বড় যুদ্ধ সে জীবনভর করে এসেছে আর তা হলো ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের যুদ্ধ, যেখানে তার বিপরীতে ছিল ঘুণে ধরা এক সমাজ ব্যাবস্থা। তবে সুজনের কথায় সে নতুন এক আশার আলো খুঁজে পায়, শেখ সাহেব নামে কে যেন তাদের অধিকার আদায়ের জন্য নেমেছেন, মনের অজান্তের ফরজ আলীর মনে সেই আশার সঞ্চার তাকে নতুন স্বপ্ন দেখায় বেঁচে থাকার। এই চারদেয়ালের খুনোসুটিতে সে একমনে অপেক্ষায় থাকে সেই আলোক কিরণের আশায়, সেই মুক্তির আশায়। মাঝে মাঝেই তার চোখ পড়ে একজন মানুষের দিকে, যার চোখজোরা আবদ্ধ থাকে শুধুমাত্র বইয়ের কয়েকটি পাতায়। যার গল্প ফরজ আলীর ক্ষুধার গল্পকেও হার মানায় । নাদির গুণ্ডার মতো সেও সমাজের কাছে একজন ঘৃণিত ও অবহেলিত একজন মানুষ। তবুও সমাজকে এরাই পথ দেখায় আর নিয়ে যায় মুক্তি সংগ্রামে, যেখানে শেখ সাহেবের অগ্নিঝড়া দীপ্ত কণ্ঠ তাদের দেয় বেঁচে থাকার নতুন আশা ও প্রতীক্ষা।

গল্পের আবহ আর চারিত্রিক বিশ্লেষণের পর যে কথা না বললেই সব বাকি থেকে যায়, তা হলো লেখকের লেখনীশক্তি। চরিত্রের পূর্ণতা দান যে কোনো লেখায় আমি আবশ্যিক বলে মনে করি, ‘তেইল্যা চোরা’র গল্পের প্রয়োজনে উঠে এসেছে নানান চরিত্র। নসু মাঝি থেকে রোশনী বা হুরমতি সব চরিত্রে পেয়েছে পূর্ণ মর্যাদা। গল্পের শুরুতে যারা আমার নিগ্রহের স্বীকার হয়েছে, লেখকের লেখনীতে তারাই আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে তাদের নির্মম ও লুকোনো এক বাস্তবতাকে। বাহিরের খোলসে তাদের সেই মানবিক গুণ আমাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছে তাদের কাছে, বিশেষ করে হুরমতির কাছে। যে হুরমতির খারাপ ব্যবহার আমেনাকে নিরব ক্রন্দনে ভাসিয়েছে সেই হুরমতির মানবীয় আবির্ভাব ছিল অপ্রত্যাশিত এবং প্রজ্বলিত। শুধু হুরমতি নয় ইউসুফ মুন্সী থেকে বাচ্চুর মতো অনেক মানুষের সরল ও স্বাভাবিক চিন্তাগুলো একাত্তরের সেই মানুষগুলোকে মনে করায়। যারা একটা ভ্রান্ত স্বপ্নের নৌকায় বাস করে নিজেদেরকে ঠেলে দিয়েছিল অন্তিম সংকটে। যেখানে কোনো অনুশোচনাই কাজে আসে না ।


বই : তেইল্লা চোরা
লেখক : ওবায়েদ হক
প্রকাশনী : বিদ্যানন্দ


  • দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com
Facebook Comments