দেশের বই ঈদ সাময়িকী

তাহিরা কোহিনূর-এর ছোটগল্প ‘প্রায়শ্চিত্ত’

শনিবার, ১৫ মে ২০২১ | ১১:৩৮ অপরাহ্ণ | 842 বার

তাহিরা কোহিনূর-এর ছোটগল্প ‘প্রায়শ্চিত্ত’

।। তাহিরা কোহিনূর ।।


 

সায়মা না ঘুমিয়েও চমৎকারভাবে ঘুমিয়ে থাকার অভিনয় করতে পারে। পাশে শুয়ে থেকেও কারো বুঝে ফেলবার কোনো সম্ভাবনা নেই । যেমন এই মুহূর্তে সে না ঘুমিয়েও ঘুমানোর অভিনয় করছে। ভান করে শুয়ে আছে ঠিক কিন্তু তার পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ। সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে সাজিদও ঘুমায়নি। এই জীবনে সায়মা যে অভিনয়টা প্রচুর পরিমাণে করেছে সেটা হলো, না ঘুমিয়েও ঘুমানোর অভিনয়। সেই অভিনয় করতে গিয়ে সে অনেককিছু আবিষ্কার করেছে। যেমন একটা সত্যিকার ঘুমন্ত মানুষ ও ঘুমানোর ভান করা মানুষের মধ্যের তফাতগুলো কেমন হয়। সে টের পেলো, সাজিদ ফোঁস করে আলগোছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এরপর তার পরবর্তী নিঃশ্বাসগুলোর মধ্যেও সর্তকতার আভাস স্পষ্ট। একজন ঘুমন্ত মানুষ কখনও এত সতর্কতার সাথে নিঃশ্বাস ছাড়ে না, ঘুমন্ত মানুষের নিঃশ্বাসে এতটা সতর্কতা থাকে না। ঘুমন্ত মানুষ আবার নিঃশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে না। সব হিসেব মিলিয়ে সায়মা নিশ্চিন্ত হয়েছে সাজিদ ঘুমানোর ভান করলেও আসলে ঘুমায়নি। জেগে আছে সে। গোপন কোনো উদ্বেগ তাকে যেন ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। হঠাৎ করেই সাজিদের মধ্যে অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। সায়মা তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ্য করে যাচ্ছে তাকে নানা এঙ্গেল থেকে বেশ কয়েকদিন ধরে।

 

টুং করে টেক্সটের শব্দে সচকিত হয়ে উঠল সায়মার সমস্ত চিত্ত। আলগোছে নড়ে উঠল সাজিদও। সায়মা অনুমান করার চেষ্টা করল, এখন ঠিক ক’টা বাজে? ঘুমের ভান করে পড়ে থাকার কারণে পাশে ফোন থাকার ফলেও দেখার সুযোগ নেই। তবে এখন যে গভীর রাত সেটা নিশ্চিত। বিগত কয়েক রাতের মতো আজও একটা টেক্সট আসার পরপরই আলগোছে উঠে দাঁড়ালো সে। চাঁদের জোৎস্নার আলোর মতো মিষ্টি নরম ডিমলাইটের আলোতে আলগোছে পোশাক বদলালো। আলগোছে নিঃশব্দে চাবির গোছাটা তুলে নিলো। তারপর বিড়ালের মতো ক্ষীণ পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে মেইন দরজায় বাইরে দিয়ে তালাবদ্ধ করে গেল। দরজায় তালা দেওয়ার শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যেতেই সায়মা অভিনয় বাদ দিয়ে লাফিয়ে নামল বিছানা থেকে, দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। দু’তলার বারান্দা থেকে রাস্তাটা দেখা যায়। সাজিদকে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে ল্যাম্পপোস্টের আলোয়, হেঁটে কোথাও একটা চলে যাচ্ছে। প্রায় রাতেই সাজিদ কোথায় যায়? সায়মার মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।
বিগত কয়েকদিন ধরেই বিষয়টা লক্ষ্য করছে সে। শুধু রাতই নয়, দিনেও কাউকে কিছু না বলেই হুট-হাট বেরিয়ে যায় বাসা থেকে। আর যতক্ষণ বাসায় থাকে ততক্ষণই ল্যাপটপ, মোবাইলে কী কী সব করে বসে বসে। চেহারার মধ্যেও থাকে কেমন একটা উদ্ভ্রান্ত ভাব।
সায়মা গতকাল জিজ্ঞেস করেছিল, ‌‌‘সাজিদ কোনো সমস্যা?’
এই প্রশ্নে সাজিদ এমন প্রশ্নাকূল চোখে তাকালো যে, সায়মা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। প্রশ্ন করে যেন উলটা বোকার পরিচয় দিলো বলে মনে হচ্ছিল । তারপরও আবারও জিজ্ঞেস করল, ‘না মানে, বলতে চাচ্ছি, অফিসে যাচ্ছো না ঠিকঠাক। হয়তো লকডাউন এজন্যই হয়ত যাচ্ছ না। কিন্তু সারাক্ষণ ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত থাকছ। ফোন নিয়ে মগ্ন থাকছ। এজন্য জিজ্ঞেস করলাম।’
– ‘ওহ না। অফিসে তো করোনার জন্য যেতে পারছি না, বন্ধ। তাই অফিসের কাজ বাসায় বসে করতে হচ্ছে।’
সায়মা আর কথা বাড়ায়নি। সাজিদের কথাটা বিশ্বাস করে ভেবেই নিয়েছিল হয়তো অফিসের কাজই হবে। কিন্তু আজ খুব খটকা লাগছে। এই রাত দুপুরে আবার কীসের কাজ? সায়মা বুঝতে পারে না।
সায়মার মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। সাজিদ এত রাতে কোথায় যায়? কী কাজ থাকতে পারে? কত আকাশ-পাতাল ভেবে কতকিছু মেলাতে চায়, হয় না। যে গল্প মেলে সেটা মন মানতে চায় না, আবার মনের মতো গল্প সাজালে প্রেক্ষাপট মেলে না।

 

ধীর পায়ে বারান্দা থেকে ফিরে আসে। ঘড়ির দিকে তাকায়, সময় পৌনে তিনটা। সাজিদ ঠিক কতক্ষণ পর ফিরে আসে সে দেখবে। সে ভাবে, বিষয়টা নিয়ে কী সাজিদের সাথে সরাসরি আলোচনা করবে? নাকি আরো কিছুদিন দেখবে? কিছুক্ষণ ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়, আরো কিছুদিন দেখা যাক। সাজিদকে এখন থেকে চোখে চোখে রাখবে সে। পারলে ওর পেছনে গোয়েন্দা লাগাবে। সে কোথায় যাচ্ছে, কী করছে- সব ডিটেইল জানার জন্য। নতুন আরেকটা হৃদয়বিদারক সন্দেহ উঁকি দিতে লাগল মনে। সাজিদ কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়ে যায়নি তো আবার। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। আর ভাবতে পারে না। মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়ে উঠছে ক্রমেই। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। মাথা গরম করা যাবে না। ঠান্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ে ভাবতে হবে।
বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে কখন দু’চোখ লেগে এসেছে। টেরই পায়নি সায়মা। তার ইচ্ছে ছিল সাজিদকে হাতে-নাতে ধরার। যখনই সাজিদ বাইরে থেকে তালা খুলে ভেতরে ঢুকতে যাবে, সায়মা চোখে-মুখে ঘুম ঘুম একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এমন ভাব নিবে যে সে ওয়াশ রুমে যাওয়ার জন্য উঠেছে।
কিন্তু তার পরিকল্পনা মতো কিছুই হয়নি। কখন ঘুমিয়ে গেছে টেরও পায়নি। যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেলা এগারোটা।
চোখ মেলেই শুনতে পেল, রান্নাঘর থেকে টুকটাক আওয়াজ আসছে। তাড়াতাড়ি উঠে রান্নাঘরে উকি দিয়ে তো তাজ্জব বনে গেল সে। সাজিদ দিব্যি স্বাভাবিক মানুষের মতো নাস্তা বানাচ্ছে। তাকে দেখে একগাল সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলল, ‘ঘুম ভাঙল তাহলে মহারানীর। যাও ফ্রেস হও, তারপর একসাথেই ব্রেকফাস্ট করি।’
সাজিদের আচরণে মনে হচ্ছিল কোথাও কিছু ঘটেনি। সবকিছু ঠিক-ঠাক আছে। তার আচরণে সায়মা ডিলিউসনে ভোগে, তাহলে গতরাতের ঘটনাটা কী তার মস্তিষ্কপ্রসূত কোনো ভ্রম? তা কী করে হতে পারে? একই ভ্রম বারবার কী করে হবে? সে তীক্ষ্ণ চোখে সাজিদকে লক্ষ্য করে। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খুব স্বাভাবিক। তাতে কোনো আড়ষ্টতা নেই, ঠোঁটের কোণে কোনো উশখুশ ভাব নেই। চোখে রাজ্যের নির্লিপ্তিতা।
ওয়াশরুম থেকে এসে সবেই বেডরুমে ঢুকেছে সায়মা, তখনই টুং করে একটা টেক্সট আসার শব্দ সাজিদের ফোনে। সায়মা দ্রুত গিয়ে বালিশের পাশে রাখা ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। স্ক্রিনে ফিল্টারিং হয়ে ভেসে আছে, একটা সাংকেতিক মেসেজ। সে ভেবেছিল মেসেজটা লিখে রাখবে কোথায়? ডায়েরি আনতে টেবিলের কাছাকাছি পৌঁছার আগেই ট্রেতে খাবার নিয়ে হাসি হাসি মুখে সাজিদ এসে বলল,
‘চলো চলো খাই, প্রচুর খিদা পাইছে। আসো হারি আপ।’

 

সায়মার ইচ্ছে হলো, গতরাতের সবটুকু রাগ-ক্ষোভ একসাথে উদগিরন করে দিতে। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে এখনই কলার চেপে ধরে জিজ্ঞেস করে, গভীর রাতে আমি ঘুমিয়ে গেলে কোথায় যাও?
কিন্তু ইচ্ছে হলেও ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রাখে। সাজিদ যেমন তার কাছে বহুকিছু লুকিয়ে দিব্যি ভালো মানুষী আচরণ করছে। সেও সাজিদের অনেককিছু জেনেও না জানার ভান করে থাকবে ততদিন, যতদিন না সবকিছু খুঁটিনাটি জানতে পারছে।
সায়মা একটা কৃত্রিম হাসি মুখে ছড়িয়ে দিয়ে বসল খেতে কিন্তু তার অন্তর্ভেদী দৃষ্টিটা প্রসারিত করে রাখল সাজিদের ওপর। খাওয়ার চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠল সাজিদের আচরণ প্রত্যক্ষ করতে। সাজিদ নিশ্চিন্ত মনে খাচ্ছে ঠিক। কিন্তু তবুও কোথায় যেন অস্বাভাবিক লাগছে সায়মার। তার অতিরিক্ত স্বাভাবিক আচরণই কি তার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে।
সাজিদের ফোনে টুং শব্দে আরেকটা টেক্সট আসতেই সায়মার শ্রবনীন্দ্রিয় সতর্ক হয়ে উঠল। আড়চোখে তাকালো সাজিদের দিকে। খাওয়ার গতি কেমন শ্লথ হয়ে এলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার। পরপরই পাউরুটির শেষ টুকরাটা মুখে দিয়ে গ্রোগ্রাসে যেন গিলল। হঠাৎ করে যেন তার ভেতর কীসের একটা তাড়া বেড়ে গেল । চট করে উঠে, বাইরে যাওয়ার পোশাক পড়ে ফোনটা নিয়ে কিছু না বলেই বেরিয়ে গেল।
সায়মাও দেরি না করে প্রায় সাজিদের পেছন পেছনই বের হলো বাসা থেকে। আজ সে দেখেই ছাড়বে কোথায় যায় সাজিদ? ফোনে মেসেজ আসার পরপরই, কোথায় বেরিয়ে যায় সে? আর তার ফোনে আসা সেই সাংকেতিক মেসেজেরই বা মানে কী? মনে করার চেষ্টা করল সে, কী কী যেন লেখা ছিল? ইংরেজিতে ক্যাপিটাল লেটার, সেই সাথে সংখ্যাও আছে কিছু। কিন্তু স্পষ্টভাবে মনে পড়ল না।

 

সাজিদ ফোনে কথা বলছে আর ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। সায়মাও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সাজিদকে অনুসরণ করছে। সায়মার শরীরে গোয়েন্দার রক্ত। তার বাবা ছিল, এনএসআই এর একজন সিনিয়র এজেন্ট। তার বর সাজিদের রহস্যময় গতিবিধি সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য সায়মার এই গোয়েন্দাগিরিটা দায়িত্বের মতো।
কিছুদূর হেটে গিয়ে, সাজিদ একটা রিকশায় চড়ে বসল। সায়মা দ্রুত একটা রিকশা নিয়ে সাজিদের রিকশাটা ফলো করল। সাজিদের রিকশাটা বারিধারার একটা বহুতল ভবনের নিচে গিয়ে দাঁড়াল। সায়মা তার রিকশাটা সাজিদের রিকশা থেকে কিছুটা পেছনে থামালো। কী কাজ এই ফ্ল্যাটে তার কিছুই বুঝতে পারল না? ফ্ল্যাট দেখে কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না এটা অফিস? সে বেশ অনেকক্ষণ ফ্ল্যাটের সামনে একটা দোকানে এটা-সেটা দেখে সময় কাটালো কিন্তু সে বাসা থেকে সাজিদের বের হওয়ার নাম-গন্ধও নেই। বিরক্ত হয়ে সে বাসায় ফিরল ঠিকই কিন্তু কোথাও শান্তি পাচ্ছিল না। কী করবে সে, কী করা উচিত তার কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। মনের মধ্যে প্রশ্নবোধক হয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন জট পাকাচ্ছিল, কে তাকে টেক্সট করে? ওরকম সাংকেতিক ভাষায় কেন টেক্সট করে? তার ওই ফ্ল্যাটে কী কাজ? কেন যায় সে সেখানে? এই উত্তরগুলো কোথায় পাবে সে?
সে সিদ্ধান্ত নিলো আজ রাতেও সে সাজিদের পিছু করবে, দেখবে সে কোথায় কী করে এত রাতে? রাতে বের হওয়ার সকল রকমের প্রস্তুতি সে নিয়ে রাখল। তবুও যেন কোথাও শান্তি পাচ্ছে না সে। বেশ অনেকক্ষণ ভাবার পর একটা বুদ্ধি উঁকি দিলো মাথায়। তার ক্লাসমেট মাহমুদের কথা মনে পড়ল। ছেলেটার সাথে তার হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক ছিল বিয়ের আগে। মাহমুদ উন্মাদের মতো ভালোবাসত তাকে। পরিবারের চাপে তখন বেকার মাহমুদকে প্রশ্রয় দিতে পারেনি। বিয়ের আগেরদিনও ভালোবাসার আকুতি নিয়ে এসেছিল ছেলেটা। পরিবারের বাধ্য সুবোধ মেয়ে হওয়ার ফলে সেদিন তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। শুধু সেটাই না, মাহমুদের চেয়ে সাজিদ খুব সুদর্শন ছিল। তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার এটাও একটা কারণ ছিল। শুনেছে সাতমাস আগে তার খুব ভালো একটা চাকরি হয়েছে। সাইবার পুলিশের সাথে সম্পৃক্ত। মূলত সে আইটি ইঞ্জিনিয়ার, মোবাইল নেটওয়ার্কিংয়ের সবকিছু তার জানা। তার কাজই হলো অপরাধীদের মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করা। এতক্ষণ পরে এই ছেলেটার কথা মনে পড়ল বলে তার আফসোস হচ্ছিল। আরেকটু আগে তার মনে হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তাকে কল দিতে খুব ইতস্তত লাগছে। কারণ বিয়ের পর দেড় বছরে ভুল করেও কখনও কল দেয়নি সে। তবে মাহমুদ চাকরি হওয়ার পর নিজেই কল করে তাকে জানিয়েছিল। মাসে এক কী দুবার কল করে। কিন্তু সায়মা রিসিভ করে না।

 

তার উপর আবার নিজের বরের ফোন ট্রেস কীভাবে করতে বলবে সে ভেবে পায় না। কিন্তু এছাড়া উপায়ও নেই। অনেক ভেবে অবশেষে কল দিলো মাহমুদকে। তার পুরো নাম মাহমুদ কায়সার। সায়মা কিছুক্ষণ সৌজন্যমূলক আলাপচারিতা শেষে, মূল ঘটনাগুলো তাকে খুলে বলল। মাহমুদ কায়সার তাকে কথা দিলো, তাকে সর্বাত্মক সহায়তা করবে। কথা শেষ করে ফোন রাখার পরও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারল না সে। সায়মা এবার খুব নিশ্চিত। তার বর অন্যকোনো মেয়ের সাথে মেলামেশা করছে। বুকের ভেতরটা কেমন জ্বালা করে ওঠে। চারদিকে ভয়াবহ মারণ ভাইরাস করোনার উপস্থিতি। প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়া নিষেধ। অথচ সে যখন-তখন বের হয়ে যায়, কোনো রকম প্রোটেকশন ছাড়াই। তাও আবার যায় একটা ফ্ল্যাটে, কোথায় যায়, কার কাছে যায়, কী কাজে যায় কে জানে?

সেই যে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে গেল সাজিদ, সন্ধ্যা হবে হবে এমন সময় সে বাসায় ফিরল। সাথে বাজার ও আরো নিত্যব্যবহার্য অনেক কিছু নিয়ে ফিরল।
এত এত শপিং দেখে অন্যদিন হলে খুশি হতো সায়মা। কিন্তু আজ ছুঁয়েও দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ছুঁয়েও দেখল না। সারা সন্ধ্যা মুখ ভার করে বারান্দায় বসে থাকল। সে স্বাভাবিক আচরণ করতে চেয়ে পারছিল না। সাজিদ উঁচু স্বরে কয়েকবার ডেকে কোনোরকম সাড়া না পেয়ে, বারান্দায় এসে আলগোছে পাশে দাঁড়ালো। আলতো করে কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘মন খারাপ কোনো কারণে।’
সায়মা নিজেকে অনেকবার কন্ট্রোল করতে চেয়েও পারল না, চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, ‘সারাদিন কোথায় ছিলে? আর যখন-তখন বেরিয়ে যাচ্ছ কোনো প্রোটেকশন ছাড়া। চারপাশে যেভাবে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, তোমাকে ধরে বসলে কী করবে তুমি?’
সাজিদ অনেকটা জোর করেই সায়মাকে নিজের বুকে টেনে নিলো। কপালে ছড়িয়ে পড়া চুলগুচ্ছ আলতো হাতে সরিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘কিচ্ছু হবে না আমার দেখো, একদম চিন্তা করো না। প্লিজ, কন্ট্রোল ইয়্যুর টেম্পার। চলো ভেতরে চলো এখন।’

 

সাজিদের সামান্য আদর পেয়েই হুট করেই তার রাগে ভাটা পড়ে গেল। আবেগগুলো অদ্ভুত কত! এই আবেগঘন মুহূর্তে সাজিদকে নিয়ে আর বাজে কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছিল না। সাজিদ বলল, লকডাউনের জন্য অনেকদিন বাইরে খাওয়া হয় না, তাই খাবার কিনে নিয়ে এলাম। চলো তোমাকে খাইয়ে দেই।’
সায়মা আবেগে ভুলেই গেল সে সাজিদের উপর ভীষণ রেগে ছিল। খাওয়া শেষে দুজনে মিলে একটা চমৎকার মুভি দেখতে দেখতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিল টেরই পায়নি।
যখন ঘুম ভাঙল, তখন রাত সাড়ে তিনটা। বিছানায় সাজিদ নেই। মেইন দরজায় পরীক্ষা করে দেখল, সেটি বাইরে থেকে তালা দেওয়া। এভাবে আর না, সে আজকে সরাসরি সাজিদকে ফোন করবে ভেবে, ফোন হাতে নিতেই দেখল, স্ক্রীনে মাহমুদের ছয়টা মিসডকল ভেসে আছে। চোখ কপালে উঠল তার। ছয়বার কল! নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য আছে। মাহমুদকে কল ব্যাক করতে গিয়ে বুঝল, ফোনে ব্যালেন্স শূন্য। মেজাজ খারাপ হলো খুব। এখন সে কী করবে? এমন এমন সময় ফোনের ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায় না!
সাজিদের ল্যাপটপ থেকে মেসেঞ্জারে ঢুকে মাহমুদকে নক করবে, ভেবে ওর ল্যাপটপ অন করতেই একটা পেজ ওপেন হয়ে গেল। হয়ত সাজিদ এই পেজটাতে ছিল শেষবার যখন বসেছিল। একটু আগ্রহবোধ করল সে। সারাদিন ল্যাপটপে কী কাজটা করে বুঝতে চাইল। উপরে ওয়েবসাইট-এর নাম হলো ‘এসকর্ট সার্ভিস’। ওয়েবসাইটের নামটা দেখে খুব খটকা লাগল তার। সেখানে একটা ফাইলে ক্লিক করতেই, এমন এমন কিছু ছবি বেরিয়ে এলো, তা দেখে সে কিছুক্ষণ ট্রমাটাইজড হয়ে রইল। নিজের চোখকে বারবার যাচাই করতে হচ্ছিল। সে যা দেখছে তা ঠিক নাকি তার চোখের ভ্রম! সাজিদের ন্যূড ছবি, সেই সাথে আরো ন্যূড নারীদের ছবিতে ভরপুর সেই ওয়েবসাইটের ফটো গ্যালারি।
ওয়েবসাইটের ডেসক্রিপশন পড়ে যতদূর বুঝতে পারল সেটি অনলাইন এসকর্ট সার্ভিস। তার ফোনটা ঝংকার দিয়ে বেজে উঠল। স্ক্রীনে মাহমুদ কায়সারের নাম। ফোন কানে উঠাতেই ওপাশ থেকে মাহমুদ কায়সার জানালো, ‘তোমার বরের ফোনে কল আসা বেশিরভাগই নাম্বার আননোন এবং প্রত্যেকটা কলই নারীদের। সেই কল রেকর্ডগুলো সংগ্রহ করেছি। আমার মনে হয় সেগুলো তোমার না শোনাই ভালো হবে। তবে একটা কথা তোমাকে না জানালেই নয়। হয়তো তোমার স্বামীর অনেকগুলো নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক আছে।’
সায়মা স্থির কণ্ঠে বলল, ‘তুমি কি কাল একটু আমার বাসায় আসতে পারবে?’
‘কখন?’

 

‘যেকোনো সময় তবে সকালে এলে ভালো হয়। খুব সম্ভবত আমি সাজিদকে ত্যাগ করব।’
‘আরেহ্ ধুর! কী বলছ এসব? শান্ত হও, ঠান্ডা মাথায় একটু ভাবো। তারপর সিদ্ধান্ত নাও। তুমি তো সবসময়ই ভুলভাল সিদ্ধান্ত নাও। এই বিয়েটাও তো ছিল তোমার একটা ভুল সিদ্ধান্ত। এখন বুঝো।’
‘সাজিদকে ডিভোর্সের পর তুমি আমাকে বিয়ে করবে?’
‘বিয়ের আগে একটা কথা বলেছিলাম। আমলে নাওনি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলে। কথাটা আবারও বলছি। তোমার পাঁচ সন্তান হয়ে যাওয়ার পরও যদি আমার কাছে ছুটে আসো। আই উইল এক্সেপ্ট ইয়্যু। মনে আছে?’
‘আছে। কাল টাইমলি চলে এসো। বাসার এড্রেস টেক্সট করে দিচ্ছি। রাখছি।’
ফোনটা রেখে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলের বৃত্তে বিমূঢ় হয়ে বসে রইল। এরকমটা সাজিদ করতে পারে? বিশ্বাস ভঙের বেদনায় মুচড়ে যায় সায়মা।

 

পরিশিষ্ট
সায়মার বসার ঘরে মাহমুদ কায়সার, সায়মা ও সাজিদ বসে আছে। তবে তাদের বসে থাকার ধরন একেকজনের একেক রকম। সাজিদ মুখ কালো করে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। সায়মার লাল টকটকে ফুলে ওঠা চোখ, উদ্ভ্রান্ত থমথমে চেহারায় বুকে হাত বেঁধে বসে আছে। স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধের পূর্বমুহূর্তের ভয়ংকর আক্রোশ নিয়ন্ত্রণের মনোভাব নিয়ে কিছুটা ইতস্তত নিয়ে বসে আছে মাহমুদ। সাজিদের সামনে খোলা সেই সাজিদের ন্যুড ছবির সেই ওয়েবসাইটের হোম পেজ। থমথমে গম্ভীর রুক্ষ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কতদিন ধরে চলছে এসব? আমাকে বিয়ে করার আগে থেকেই?’
সাজিদ নীরব। সায়মা মাহমুদের সামনে নিজের রাগটা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল অনেকক্ষণ ধরেই। সাজিদের নীরবতায় তার সকল ধৈর্য ভেঙে খান খান হয়ে গেল। হিংস্র বাঘিনীর মতো চড়াও হলো সাজিদের ওপর। থাপ্পড়, খামচি, কিল-ঘুষি অন্ধের মতো এলোপাথাড়িভাবে মারতে মারতে বলল, ‘হারামজাদা, কুলাঙ্গার আমার জীবনটাকে এভাবে নষ্ট করলি কেন? সারা শহর জুড়ে তোমার ইয়ে রেখে আমাকে বিয়ে করতে গেলি ক্যান?’
সাজিদ সায়মার পা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করো সায়মা এবং বিশ্বাস করো, আমি এসবে কখনও জড়িয়ে যেতাম না যদি না আমার চাকরিটা চলে না যেত। করোনার জন্য কোম্পানি ছাটাই করে দিয়েছে আমাকে। চাকরিবিহীন এই বিলাসবহুল ঢাকা শহরে কী করে টিকে থাকব, তোমার ভরণ-পোষণ কীভাবে করব বুঝতে পারছিলাম না কিছুই। অন্যদিকে বাসাটাও ছেড়ে দিতে পারছিলাম না। কারণ বিগত দুইমাসের বকেয়া ছিল। বাড়িওয়ালা ভাড়ার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। সামনের মুদির দোকানে মাস শেষে পরিশোধ করতে হতো সারা মাসের বাকিগুলো। বেতন না পাওয়ায়, চারপাশ এত এত টাকার চাপ, অন্যদিকে আবার এমন পরিস্থিতিতে তোমাকেও না খাইয়ে রাখতে পারব না। নানা জায়গায় আরেকটা চাকরির জন্য ঘুরেছি হন্যে হয়ে। এই প্যান্ডেমিকে নাজেহাল স্থবির পৃথিবীতে কে-ই বা চাকরি দিবে আমাকে? বেশ কয়েকদিন বিভিন্ন অনলাইনে নানারকমের চাকরির সন্ধান করতে গিয়ে এই সার্ভিসটা চোখে পড়ল। তখন বিপদের মুখে আগে-পিছে কিছু না ভেবেই যুক্ত হয়ে যাই মূলত এটার সাথে। বিগত একমাস হলো এটার সাথে কাজ করছি।
সায়মা ঘৃণায় পা সরিয়ে নিতে নিতে বলে, ‘তোমার কীভাবে সাহস হয়, তোমার নোংরা, অপবিত্র হাতে আমাকে ছোঁয়ার। আমি আজ এবং এই মুহূর্তে তোমাকে এবং তোমার জীবন থেকে চলে যাচ্ছি। ডিভোর্স পেপারটা পাঠিয়ে দিও স্বাক্ষর করে দিবো।
মাহমুদের দিকে তাকিয়ে সায়মা বলল, ‘আমাকে একটু আমার বাসায় পৌঁছে দিতে পারবে?’
‘শিউর। চলো।’
সায়মা উঠে গট গট করে হাঁটা দেয় দরজার দিকে। সাজিদ দৌড়ে গিয়ে সায়মার পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ‘প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দাও। কথা দিলাম সবকিছু বাদ দিবো। আমাকে ছেড়ে যেও না।’
সায়মা দু’কদম পিছিয়ে যায়। ‘কিপ ডিসটেন্স এবং ডোন্ট টাচ। কোনো ক্ষমা নেই। এটা তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত।’
টুং করে একটা মেসেজ আসে সাজিদের ফোনে। সায়মা কঠিন দৃষ্টিতে শব্দ অনুসরণ করে তাকায় সেদিকে। তারপর সায়মা দরজার বাইরে পা রাখে। শেষবারের মতো আবার ফিরে তাকায় সে। দেখে,পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিঃস্ব ও অপরাধীর মতো করে দু’পা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে অসংলগ্নভাবে বসে আছে সাজিদ। দেখে বড্ড মায়া হয় সেই সাথে রাগও।

Facebook Comments Box