ঈদ সাময়িকী ॥ ছোটোগল্প

তাহিরা কোহিনূর-এর ছোটোগল্প অন্তর্দহন

শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২০ | ৫:২৫ অপরাহ্ণ | 316 বার

তাহিরা কোহিনূর-এর ছোটোগল্প অন্তর্দহন

অন্তর্দহন
॥ তাহিরা কোহিনূর ॥

খোলা জানালা দিয়ে এক চিলতে জোসনা এসে পড়ছিল আমার বিছানায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। ঝকঝকে জোসনা চারপাশে। খোলা মাঠ তারপর সাদা বাউন্ডারিটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মাঠের পাশ ঘেঁষেই কোথাও চলে গিয়েছে হাইওয়েটা। হাইওয়ে ধরে হঠাৎ হঠাৎই হুশ-হাশ করে চলে যাচ্ছে দূর পাল্লার কোনো গাড়ি। আর সব নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে দলবেঁধে থেমে থেমে ডেকে যাচ্ছে ঝিঝিরা। এই ডাক রাতটাকে আরও গভীর করে দিচ্ছে। নিজেকে ছাড়া সারা পৃথিবীটাকেই ঘুমন্ত লাগছিল। ঘুম নেই দু’চোখে। একটা হাহাকার, একটা বেদনা বারবার হৃদয়টাকে বিদীর্ণ করে যাচ্ছে। হারানোর বেদনা। প্রিয় কেউ একজন হারানোর বেদনা…।

 

 

বুকের ভেতর ধূ ধূ শূন্যতা আর দীর্ঘ নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। না পাওয়ার বেদনা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। তাসফির শেষ মেসেজটা বুকের ভেতরে একটা ভারি পাথরের মতো চেপে আছে।
“নতুন কাউকে নিয়ে নতুনভাবে জীবনটা সাজানোর চেষ্টা কর।”-মেসেজটা দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া থমকে গিয়েছিল আমার। মাথার ভেতরটায় কেমন যেন একটা যন্ত্রণা ব্রেনটাকে আঘাত করে যাচ্ছিল তীব্রভাবে। নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।
তারপর প্রায় এক সপ্তাহ চলে গেছে। ওর সাথে আমার সকল যোগাযোগ বন্ধ। ফোন বন্ধ, মেসেঞ্জার থেকে ব্লক, ইমু হোয়াটস-অ্যাপ সব জায়গা থেকে আমাকে সে ব্লক করেছে। নিঃশ্বাসের সাথে সাথে যেন কেউ এক মণ বোঝা বেঁধে দিয়েছে। ভারি নিঃশ্বাস।

মেসেজটা দেওয়ার পর থেকে তাসফির সাথে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছি না। হঠাৎ এমন কী করলাম? কী ভুল করলাম? কেন তাসফি হঠাৎ এমন করল আমার সাথে? যতদূর মনে পরে আমাদের মধ্যে কোনোরকম ঝামেলা ছিল না। কী সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিল আমাদের। কোনো রকম ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার মতো তো কিছু হয়নি। তাসফির আমার উপর রাগ হতে পারে এমন কোনো কাজও তো করিনি। তাহলে কী এমন হলো হঠাৎ, তাসফি আমাকে সবকিছু থেকেই আমাকে দূরে সরিয়ে দিল? তাহলে তার এতদিনের সেই ভালোবাসা প্রদর্শনীটা কী ভুল ছিল? ভুলও এত নিখুঁত হতে পারে?
কোনো কারণে তাসফির ফোন ধরতে একটু দেরি হলেই যে কান্নাকাটি করে অস্থির হয়ে পড়ত, সেই চোখের অশ্রুটুকু কী মিথ্যে হতে পারে?
বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আমার। তাই নিজেকে শান্তনা দিয়ে যাচ্ছি, তাসফির কাছ থেকে যে মেসেজটা এসেছে হয়ত সেটা ভুল করে পাঠিয়েছে আর নয় তো এটা তাসফির কোনো সাজানো নাটক। ও হয়তাে দেখতে চাচ্ছে, ওর কাছ থেকে হঠাৎ এমন মেসেজ পেয়ে আমার প্রতিক্রিয়াটা কী হয়! এটা দেখার জন্যই হয়তাে এ কাজ করেছে। নির্ঘাত আড়াল থেকে চুপিচুপি আমাকে ঠিকই দেখছে। এর মধ্যে কয়েকবার তাসফির বাসার সামনে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে এসেছি তাসফির দেখা মেলেনি। মনটা তখন আর শান্ত রাখতে পারি না। কী করে রাখব? দিনের মধ্যে এক ঘণ্টা অন্তর মেয়েটার সাথে কথা হতো আমার। কত কী কথা? মেয়েটার কণ্ঠে জাদু আছে। কী যে মায়া সে কণ্ঠে! আহ্লাদি ঢঙ্গে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলত আমার সাথে। তার আহ্লাদি কণ্ঠ কানে বাজতেই বুকের ভেতরটা কেমন শিহরিত হয়ে উঠত। কেমন যেন একটা ভালোলাগা আমাকে ঘিরে রাখত সারাক্ষণ। সারাদিন ভর সেই কণ্ঠের মায়া আমাকে ঘিরে রাখত।মনের ভেতর কেমন একটা স্বর্গীয় আনন্দে বিভোর হয়ে থাকতাম আমি।

 

এই তো সেদিনের কথা, বাইরে বৃষ্টি। গায়েও সামান্য জ্বর। গুটি গুটি হামের মতো কিছু হয়েছে গায়ে। বৃষ্টিকে অজুহাত করে অসুস্থ ব্যাপারটা তাসফির কাছে চেপে বাসায় বসেছিলাম। ফেসবুকে ঢুকতেই তাসফির স্ট্যাটাসে চোখ আটকে গেল। তিন বাক্যের একটা স্ট্যাটাস। তাতে লেখা,
“জুম বৃষ্টির এমন দিনে খুব মনে পরে তাকে
একগুচ্ছ কদম হাতে আমার পছন্দের পোশাকে?
আসত যদি সে আমার এই একলা দুপুরের বেলকুনিতে…”

 

পাঁচ মিনিট আগেই তাসফি আমার সাথে কথা বলে ফোনটা রেখেছিল মাত্র। হয়তাে স্ট্যাটাসটা দিয়েই আমাকে কল করেছিল। কী জানি ছিল সেই স্ট্যাটাসে। কীসের জ্বর? কীসের হাম? কটকটে নীল জিন্সের সাথে সাদা শার্ট ওর পছন্দনীয়। সেই পোশাকেই সেই বৃষ্টির মধ্যে চলে গিয়েছিলাম ওর বাসার সামনে। ওর মনের মতো করেই একগুচ্ছ ভেজা কদম নিয়ে। সেও বেলকনিতেই ছিল, আমার প্রিয় রং, ঘন নীল রংয়ের জামা পরে।
কী যে খুশি হয়েছিল মেয়েটা। যা বর্ণনা করার সাধ্য আমার নেই!

যে মেয়েটা আমাকে মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকতে পারত না অথচ আজ তিন মাস অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, সে ঠিক ভুলে আছে। আমি আর আমি নেই। জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে আছি। যন্ত্রের মতো রোজ স্বাভাবিকভাবে জাগি, অফিসে যাচ্ছি, কাজ করছি, সন্ধ্যায় ফিরে আসছি। রাতগুলো আমার কীভাবে কাটে কেউ জানে না।

 

অফিসের কোনো কাজই মনোযোগ দিয়ে করতে পারছি না। বড়াে অংকের একটা ডিলের অফার দিয়েছিল অফিসের বস, ইকরাম স্যার। আমি নেইনি, বস খুব অবাকই হলেন। আজকাল সবকিছু অর্থহীন লাগে সেটা বসকে কী করেই বা বোঝাই। আজকাল খুব ইচ্ছে হয়, চাকরিটাও ছেড়ে দিয়ে ঘরের এক কোণে ঝিম মেরে বসে থাকি। কিন্তু তার উপায় কী আর আছে? যেদিন থেকে বাবা প্যারালাইজড সেদিন থেকে আমার ইনকামের ওপর অনেকাংশে আমার পরিবার নির্ভর করে আছে। অন্যদিকে বাবার চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে যায়। এমতাবস্থায় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
পরিবারের অসহায় প্রিয় মুখগুলোর কাছে আমি অসহায়। নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করি। হয়তাে তাসফি অন্যকারো, আমার নয়। তাই চলে গেছে, এতে কষ্ট পাওয়ার কী আছে? জীবনে সঠিক মানুষটার সন্ধান হয়তাে পেয়ে যাব, মুভ অন নাহিয়ান। কিন্তু মনকে বোঝাতে পারি না, শরীরটাও বুঝতে চায় না। দীর্ঘ তিন বছরের অভ্যেসগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতি মুহুর্তে। আমি ভালো নেই, এই কথাটা প্রাণ খুলে বলবার মতো কেউ নেই আশেপাশে। আমি উঠে দাঁড়াতে পারছি না, আমার হাসতে কষ্ট হচ্ছে, বাঁচতে কষ্ট হচ্ছে, এই সব কী বসকে বলা যাবে?

অফিসের বস হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আর আমি তার মুখোমুখি নত মুখে বসে আছি। বস কণ্ঠে বিস্ময় ঝেড়ে জানতে চাইলেন, “নাহিয়ান সাহেব, আপনি ঠিক আছেন তো? কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত লাগে আজকাল আপনাকে? সবসময় একটা মলিন মুখ নিয়ে ঘুরে-বেড়ান। আগের মতো প্রাণবন্ত ভাবটি নেই আপনার মাঝে। মাসে দুটো করে করে প্রেজেন্টেশন করতেন আপনি অথচ কতদিন আপনার প্রেজেন্টেশন দেখছি না, এতাে বড়াে একটা ডিল, অফিসের আর কাউকে জানাইনি আপনাকে দিবো বলে, অথচ আপনি…।”

 

আমার হু হু করে কান্না পেয়ে যায়। কেউ অতি সাধারণভাবে ‘কেমন আছেন, নাহিয়ান সাহেব?’ জিজ্ঞেস করলেই আজকাল আমার কান্না পেয়ে যায়। সেখানে বস আজ সবকিছু ভেঙেচুরে জানতে চাচ্ছেন। নিজেকে আর সামলাতে পারি না। লাজ-লজ্জা ভুলে আমি হু-হু করে কেঁদে উঠি। বস অপ্রস্তুত হয়ে যান। তিনি উঠে এসে আমার কাঁধে হাত রাখেন, আহত কণ্ঠে জানতে চান, “হোয়াটস রং, নাহিয়ান সাহেব?”

নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে একটা যুক্তিযুক্ত উত্তর খুঁজি, মিথ্যা উত্তর। হুট করেই পেয়েও যাই, ভাঙা কণ্ঠে বলি, “স্যার, আমার বাবা খুব অসুস্থ। সেজন্য মন-মেজাজ খুব খারাপ থাকে, খুব চিন্তা হয় তার জন্য। কোনো কাজে মন বসাতে পারি না।”
বস একটা দুঃখ-দুঃখ চেহারা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হয়তাে আমাকে শান্তনা দেবার মতো উত্তর খুঁজছেন। ওনি আমার ওপর খুব আস্থা রাখেন, সকল বিশ্বস্ত কাজগুলো আমাকে দিয়েই করান। এমনকি মাঝে মাঝে ব্যক্তিগত অনেককিছুই আমার সাথে খোলাখুলি আলোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেন না। এই তো কয়েকদিন আগে, উত্তরায় একটা ফ্ল্যাট কিনলেন, আমাকে সাথে নিয়ে গিয়েই বুকিং দিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করতে যাচ্ছেন, নতুন বউকে নিয়ে এখানেই উঠবেন। তার নতুন বিয়ের খবরটা কেউ না জানলেও আমি জানি। হয়ত বস সবসময় আমাকেই প্রেফার করেন তার কারণ হয়তাে, এই অফিসে আমি একমাত্র বসের কাছাকাছি বয়সের বাকি কলিগ সবাই বয়স্ক। তার ফ্ল্যাট ইন্টেরিয়র ডিজাইন থেকে শুরু করে ফুল ফার্নিশড করার দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আমার তো কোনো ভাই নেই। একা আমি, নানা কাজ সামলাতে গিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে রীতিমতো। ভাই ভেবে কাজ করানোর দায়িত্বটা আপনাকে দিলাম।”

বস তার চেয়ারে ফিরে গিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে সেই ফ্ল্যাট নিয়ে কথা তুললেন, “নাহিয়ান সাহেব, আপনার কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমার। ফ্ল্যাট ফার্নিশডটা দারুণ হয়েছে। সেই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আপনার জন্য এই ডিলটা সাইন করিয়েছি। আপনি দুই-তিনমাস সময় নিন, তারপর না হয় হাতে নিয়েন এটা। সমস্যা নেই তো। যাইহোক, আপনাকে অগ্রিম দাওয়াতটা দিয়ে দিচ্ছি। যদিও অফিসিয়ালিভাবে বিয়েটা হয়ে গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে কোরবানি ইদের দুদিন পর। হোটেল রেডিসনে ঘরোয়াভাবে অনুষ্ঠান করব। অফিসের লোকজন আর আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ছাড়া আর কেউ থাকবে না। বস আমাকে আরো একবার আশ্বস্ত করে বললেন, “জানেনই তো, আপনাকে আমি ভাইয়ের মতো দেখি বলেই আনঅফিসিয়ালি অনেক কাজ আপনাকে দিয়ে করাই। তো আমার বিয়ের কার্ড বিলিটাও আপনার হাত দিয়ে হোক।” বলেই একগাদা কার্ড হাতে ধরিয়ে দিলেন কলিগদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য। নিরসভাবে কার্ডগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই, বস বলল, “আর হ্যাঁ, আপনার কিন্তু দায়িত্ব শেষ হয়নি, আরো অনেক কাজ বাকি আছে! কী আপনাকে খুব খাটিয়ে ফেলছি নাকি?”

আমি অভিভূত হই। বস আমাকে এত বেশি ভরসা করেন যে, নিজের বিয়ের অনেক কিছুই আমার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আমার পদোন্নতি দিয়েছেন। আমার ভালো মন্দ খোঁজ-খবর রাখছেন। বস হলেও কেন যেন তাকে খুব কাছের লাগে। খুব আপন আপন লাগে। কিছু একটা শোনার জন্য আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি আবেগ ধরে রেখে বললাম, “ভাইয়ের স্থানে জায়গা দিয়েছেন আমাকে। খুব বড়াে একটা জায়গা। সে তুলনায় তো এই কাজগুলো অল্পই। আমার ভাইয়ের বিয়ে। ভাই হিসেবে তো এসব আমার কর্তব্য।”

বস চেয়ার ছেড়ে এসে একেবারে আমাকে বুকে নিতে নিতে বললেন, “এমন একটা ভাই থাকতে আমার কীসের চিন্তা?”
হঠাৎ মনে হলো, এইভাবে অনেকদিন কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরে না। আবারও আমার চোখ ভিজে এলো। আমি সতর্কতার সাথে চোখ মুছে নিলাম। বস আমাকে আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করে দিয়ে ব্যস্ত হয়ে বলল, “বরযাত্রী হিসেবে আমার সাথে আপনি যাবেন। আমার ওরকম কোনো ক্লোজ কেউ নেই যাবার মতো সাথে।”

নিজের ডেক্স থেকে একটা কাগজ এনে, হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এই কাজগুলো তোমাকে করতে হবে। ইদের তো আর মাত্র দুইদিন বাকি আর বিয়ের চারদিন। তোমাকে লিভ দিচ্ছি অফিস থেকে। তোমার ডিউটিটা এই চারদিন আনঅফিসিয়াল। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক। যেহেতু তোমার ভাইয়ের বিয়ে, ছুটিটা তো তোমার প্রয়োজনই। আর হ্যাঁ, আজ থেকে তুমিই সম্বোধন করব তোমাকে।”

“ইট’স ওকে। আমি খুশি হবো ‘তুমি’ সম্বোধন করলেই। “বলতে বলতে হাসি দিয়ে কাগজটা নিয়ে বের হয়ে গেলাম।
সব কলিগদের বিয়ের কার্ড বিলি করে বসের পরবর্তী কাজের জন্য বের হলাম অফিস থেকে। বসের বাসর ঘর সাজানোর দায়িত্বটাও আমার কাঁধেই। ওয়েডিং প্ল্যানারদের সাথে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে বসের সদ্য কেনা উত্তরার ফ্ল্যাটটা সাজানো শুরু হয়ে গেল। একে একে ঘনিয়ে এলো বিয়ের দিন। বস আমার কাজে অভিভূত হলেন। বিয়ের শপিং করতে গিয়ে, আমার জন্য প্রচুর শপিং করেছেন। বিয়ের আগের রাতেই সেগুলো আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। শত-শত কাজের মধ্যে থেকেও যেন আমি ভুলে থাকতে পারছিলাম না তাসফিকে। বরাবরের মতোই তার বন্ধ ফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে দেখি, যদি ভুল করেও খুলে সে ফোনটা। বসের বাসর ঘর সাজাতে গিয়ে, কত-শতবার ভেঙে চুরমার হয়েছি।

 

বিয়ের দিন সকাল থেকেই একটু একটু পর বসের কল আসতে লাগল, “নাহিয়ান, কই তুমি? এখনো তো এলে না। খুব নার্ভাস লাগছে, প্রথম বিয়ে তো পাশে একজন থাকলে ভালো লাগত, সাহস পেতাম।”
বসের কথা শুনে হাসি পায়। বিয়ে তো বেশিরভাগ মানুষের প্রথমই হয়। আমি ঝটপট রেডি হয়ে যাই। নিজেকে ওয়েডিং ফ্যাশনে প্রস্তুত করতে গিয়ে হঠাৎই মনে হলো, বহুদিন পর যেন কিছুটা হলেও ভালো অনুভূত হচ্ছে। কেমন একটা খুশি খুশি লাগছে। সেরকমই একটা খুশি মন নিয়ে বসের বাসায় গিয়ে পৌঁছলাম। আমাকে দেখে যেন বস কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন। আমি পৌঁছতেই গাড়ি-বহর নিয়ে রওনা দেওয়া হলো রেডিসনের উদ্দেশ্যে। জামাই সেজে বসে থাকা বসের পাশে আমি বসে আছি। গাড়িতে এসি থাকা স্বত্ত্বেও বস দরদর করে ঘামছিলেন। একটু একটু পর পর টিস্যু এগিয়ে দিচ্ছি, সে একটু পর পর মুছে নিচ্ছে ঘর্মাক্ত মুখ। দেখেই মনে হচ্ছে খুব স্নায়ুবিক দুর্বলতায় ভুগছেন।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। বেশ কয়েকজন এসে বর নামিয়ে নিয়ে চলে গেল, আমি থেকে গেলাম বাইরে। অফিসের কলিগ যারা আসছে সবাইকে তদারকি করে ভেতরে নিয়ে যেতে হবে। সবাইকে নিয়ে যখন ভেতরে গেলাম, চোখ আটকে গেল বসের পাশের সোফায় কনের সাজে বসে থাকা মেয়েটার দিকে। মনে হলো, আমার হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ করেই লাফিয়ে উঠল। বসের পাশে বসে থাকা মেয়েটা আর কেউ নয়, আমার তাসফি। আমার পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠল যেন। পৃথিবীটা যেন ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসছে! আমি ভিড়ের মধ্যে টলতে টলতে আলগোছে সরে এলাম আড়ালে। বের হয়ে এলাম রেডিসন থেকে।

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments