তাহলে আমার এ্যাসাইনমেন্ট?

রবিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:৫৫ অপরাহ্ণ | 157 বার

তাহলে আমার এ্যাসাইনমেন্ট?

ঢাকায় তেমন একটা শীত নেই। অফিস থেকে গমনাদেশ গ্রহণ করেছি। গমনাদেশ নেওয়ার একটা কারণও ছিল, সুবিদ সাপেক্ষর বিয়ে। পরিকল্পনা ছিল শুক্রবার অফিস থেকে ফিরে গাইবান্ধার উদ্দেশে রওনা দেবো, সেই মোতাবেক আনতারা (প্রাক্তন স্নান সম্পাদক)‘র কাছে একহাজার টাকা ধার করি। বাড়িতে কথা বলেছি, আব্বা দুহাজার পাঠাতে চেয়েছেন। বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরে সোজা হেমের (হেমকান্তি চণ্ডাল, কথাকার) কাছে গেলাম। যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে শাহজাদপুর। তারপর গলিধরে মিনিট দশেক হেঁটে তার কাছে। এর ভেতর আব্বা টাকা পাঠিয়েছেন। হেমের সাথে দেখা হলো, বললাম, গাইবান্ধায় কাল সন্ধ্যায় রওনা হবো, চল তুইও। ওর ছুটি নেই, যাবে না। এর ভেতরে আব্বার ফোন, বললেন, ‘টাকাটা ব্যাক কর’। জানতে চাইলাম না কেন ব্যাক করব। তিনি নিজেই জানালেন, দোকানদারকে টাকা পাঠাতে বলেছিলেন। একজনের কাছে ধার নিয়ে তাকে দেওয়ার কথা। তিনি দিতে পারেন নি। আর কোন উপায়ও নেই, তাই ব্যাক করতে হবে। আব্বার যাতে মন খারাপ না হয় এজন্য বললাম, টাকা কিছুক্ষণ আগে একজনের কাছে পেয়েছি। কাজেই চিন্তা করার কিছু নেই। সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, কি করবো? গাইবান্ধা হয়ে ঢুকলে এই টাকায় হবে না। এখন টাকার অজুহাতে না গেলে ব্যাপারটা খাপছাড়া দেখায়। শুক্রবার অফিসে গেলাম মামুন (কবি মামুন মুস্তাফা) ভাই বললেন, কি প্রস্তুতি ঠিক আছে? কখন রওনা দিচ্ছ? শনিবার কার কার সাথে দেখা করবা? কাজটা এখান থেকে ফোনে ঠিকঠাক করে নাও। বললাম, ভাই সব ঠিকঠাক আছে। শুক্রবার রাতের ট্রেনে উঠবো, সকালে পৌঁছাবো। তারপর রেস্ট করে কাজে বেরুবো। অফিস থেকে ফিরলাম ৫টার মধ্যে। টিকিট এখনো কাটি নাই। সুবিদ সাপেক্ষ, বারবার জানতে চাচ্ছেন, কখন উঠবো? রুমে এসে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ভাবছি, স্টেশনে যাই তারপর সিদ্ধান্ত। স্টেশনে পৌঁছালাম ৯ টা ৩০ মিনিটে। গায়ে একটা ব্লেজার। ঢাকার বাইরে শীত কেমন সেটা বুঝতে পারছি না। কেউ কেউ বলছিলো, শীত কমেছে, হালকা গরম কাপড়েও চলে। টিকিট কাউন্টারে দাঁড়িয়েও জানি না, কোথায় যাবো। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ শুনছি, আরে ভাই যাবেন কোথায়? কোন ট্রেন? অস্পষ্ট করে বললাম রা-জ-শা-হী।

২.
একপ্যাকেট রয়েল’স নেক্সট আর একটা দেশলাই বক্স নিয়ে ট্রেনে উঠলাম। ট্রেন জয়দেবপুরে আসতেই ঠাণ্ডা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। এর ভেতর জয়দেবপুর দেখেই কলিজাটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। ক্যাম্পাসে থাকতে যে মেয়েটা আমাকে ভালোবাসতো তার বাড়ি জয়দেবপুর। জয়দেবপুরে দশ মিনিট ট্রেন দাঁড়াবে। ওখানে নেমে একটা সিগারেট ধরালাম। আর জয়দেবপুরের বাতাসে তার গন্ধ শোকার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মরে যাওয়া প্রেমের ভেতর থেকে কোন চম্পা-চামেলির গন্ধ এলো না। শুধু একটা ছাই ছাই গন্ধ এলো। রেলের বস্তিতে কয়েকজন কাগজ জ্বালিয়ে বসে আছে। সেদিকে তাকাতেই- ট্রেন হুইসেল দিল, ছেড়ে দেবে। মনে হলো হুইছেলের ভেতর এক করুণ ভায়োলিন বেঁজে উঠলো। উদাসী টান দিল প্রাণে!

৩.
অন্ধকারে আর কিছুই দেখা যায় না। দূরে দূরে কিছু রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট, জানালার কিংবা ঝুল-বারান্দার আলো ছাড়া কিছুই বোঝা যায় না। ট্রেন চলছে, শো শো হাওয়া কাটিয়ে একেকটা প্লাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে। নামলাম ৫টা ২০ এর দিকে। নেমে বিনোদপুরের অটোতে। অটোতে উঠে বসে আছি, যেহেতু মাস্কপরা, একটা মেয়ে এসে উঠলো, চেনাচেনা লাগছে। আমার মাস্কটা খুললাম, যদি পরিচিত হয়, যেন সেই আগে কথা বলে। মাস্কটা খুলতেই বললো, আরে আদিত্যদা, আপনি? মেয়েটা ডিপার্টমেন্টের ছোটবোন, ঢাকায় বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। আজ ফিরলো। বিনোদপুরে নেমে বললাম, কই যাবি? মেস কোনদিকে? তখনো ফজরের আজান দেয়নি। বললাম, চল, তোকে মেসে দিয়ে আসি। ফাঁকা রাস্তা, কুয়াশা-শীত। তারপরও মেয়েরা কোনভাবেই নিরাপদ নয়। এখনো তো ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন চলছে। ক’দিন আগে সম্পাদকীয়ও লিখলাম, ধর্ষণ নিয়ে। জুনিয়রের নাম মনে করতে পারছি না, বাকি সবকিছুই মনে পড়ছে। বললো, দাদা উঠবেন কার কাছে? বললাম, কারো সাথে তো কথা বলিনি, এখন ফোন দেবো। মুস্তাককে ফোন দিলাম; রিসিভ হলো না। আনছারুলকে ফোন দিলাম, একই অবস্থা। একটা সিগারেট ছিল, সেটি ধরিয়ে ভাবলাম, প্যারিসে হাঁটতে হাঁটতে সকাল হয়ে যাবে। কি মনে করে কমরেড ফিদেল মনিরকে ফোন দিলাম। রিসিভ হলো। বললাম, কই তুই? -মেসে। বললাম, এই ঠাণ্ডার ভেতর রাস্তায় রাস্তায় নেড়ি কুত্তার মতো ঘুড়ে বেড়াচ্ছি। বললো, আয় গেট খুলে দিচ্ছি। ব্যাগ রেখে, কম্বলের নিচে মাথা ঢোকালাম, উঠলাম দেখি এগারোটা বাজে। প্রফেসর বীরবিক্রম এস আলমের সাথে কথা ছিল, তাঁর কাছে এগারোটায় পৌঁছাবো। বুঝতে পারলাম না এগারোটা বাজলো কি করে!

৪.
এ্যাসাইমেন্ট হলো, বাংলাদেশের ৫০ বছর। শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি-শিক্ষাব্যাবস্থা-মুক্তিযুদ্ধ- সবটা মিলিয়ে রাজশাহী অঞ্চল কাভার করতে হবে। হাতে সময় ৪ দিন। ফ্রেশ হয়ে ক্যাম্পাসে গেলাম, স্যারের (প্রফেসর শহীদ ইকবাল) সাথে দেখা করা দরকার। স্যারের লেখা আগেই মেইলে পেয়েছি। হাসান আজিজুল হক স্যারের বাসায় যাওয়ার সময়টা করে উঠতে পারবো না। তাই হাসান স্যারের লেখক সম্মানীর চেকটা স্যারের কাছে দিলাম। শনিবার দেখা হলো গোলাম সরওয়ার স্যারের সাথে, তাঁর লেখাটা প্রস্তুতই আছে, টাইপ করতে দিয়েছেন। দুপুরে ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক স্যারের সাথে দেখা হলো, কথা হলো। তাঁর চেম্বারে যেতেই বললেন, কানে শুনতে পাই না, কাগজে লিখে দাও। বললেন, নতুন লেখা লিখতে পারবেন না, একটা লেখা সদ্য শেষ করেছেন, অপ্রকাশিত, ওটা নিলে দিতে পারি। লেখাটা প্রাসঙ্গিক, স্যারের লেখাপত্র যিনি গোছগাছ করেন, তার কাছে লেখাটার বিষয়ে কথা হলো। বিকেলে গেলাম বিধান স্যারের (বিধানচন্দ্র দাস) কাছে, বাংলাদেশের ৫০ বছরের বিজ্ঞানচর্চা বিষয়ক লেখার জন্য। স্যার এখন নিউটনের জীবনী লিখছেন। তার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, বিজ্ঞানচর্চার বর্তমান অবস্থা, হিমালয় যাপনের স্মৃতি নিয়ে প্রায় ঘণ্টা তিনেক আড্ডা হলো। সন্ধ্যার পরে এলাম এনামুল ভাইয়ের চায়ের দোকানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো এখানে কাটিয়েছি। দেখা হলো প্রসেন দা, রিমেল ভাই, কৌশিক দা, রাজু স্যার আরও অনেকের সাথে। রবিবার সকাল ৮টায় এলার্ম দেয়া। রাজশাহী মহানগরের মেয়র মহোদয়ের সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা আজ ১.৩০ মিনিটে। মেয়রের সাথে সময় ঠিক করে দিলেন কবি আরিফুল হক কুমার ভাই। বেলা ১.০৮ মিনিটে মেয়র সাহেবের পিএ ফোন দিয়ে জানালেন, আজ হবে না। রাজশাহীতে পুলিশের মহাপরিচালক ঢুকবেন। ব্যস্ততা আছে। রাস্তার পাশে খেয়ে দেয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকলাম। ক্যাম্পাসে রফিক সানি ভাই, নাজ আপু এসেছেন। আড্ডা হলো। বিকেলে দেখা করলাম বখতিয়ার আহমেদ স্যারের সাথে। সন্ধায় কাজী মামুন হায়দার রানা স্যারের চেম্বারে গিয়ে দেখি মুড়িপার্টি। তারপর কথাবার্তা শেষে বেরিয়ে পড়লাম। ক্যাম্পাসে শীতের ভেতর হাঁটছি। হাঁটার ভেতর দারুণ এক শূন্যতা ছড়িয়ে আছে। দারুণ এক হাহাকার আছে। সুবিনয় নেই। বর্ণও নেই। স্নানচত্ত্বর নেই। আর সব আছে। কিন্তু, তবুও বুকে বাজে- ‘নেই কিছু নেই’।

৫.
সোমবার কবি, মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক রুহুল আমীন প্রামাণিকের সাক্ষাৎকার, নাজমুল হাসান পলক ভাইসহ গেলাম শাহ মখদুমের দরগায়। পদ্মার গাঁ ঘেঁষে। সেখানেই ট্রাস্টির একটা অফিসকক্ষে কথা হলো। দুপুর হয়ে এসেছে। ট্রাস্টির প্রধান জানালেন, দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে, পলক ভাইয়ের আপত্তি ছিল। কিন্তু আমি রাজি হয়ে গেলাম, দরগার তবারক- কত স্মৃতি আছে। একটু পুরোনো স্মৃতির সাথে দেখা হোক। মঙ্গলবার নাট্যজন, শিক্ষাবিদ মলয় ভৌমিক স্যারের সাথে বসলাম। রবীন্দ্রভবনে স্যারের চেম্বারে। ঘণ্টাখানেক কথা হলো। পলক ভাই দুর্দান্ত কিছু প্রশ্ন করলেন। স্যার প্রশ্ন শুনেই অত্যন্ত তুষ্ট হয়েছেন। পলক ভাই চর্চার মধ্যে থাকা মানুষ। এবং, ক্যাচও করতে পারেন খুব সহজে। ফলে, জমলো। মলয় স্যারের কাছ থেকে বের হয়েই মধ্যাহ্ন ভোজনের দাওয়াত। রোমিও ভাইয়ের বাসায়। গান, আবৃত্তি, খাওয়া দাওয়া- মনে রাখার মতো একটা সময় কাটলো। ফিরলাম ক্যাম্পাসে। লিটনের চায়ের দোকানে বসে ভাবলাম, দেখি কেমন রেকর্ড হলো? বাজাতে গিয়ে দেখি একটা রেকর্ডও নেই। মনে হলো হার্ট এ্যাটাক হয়েছে আমার। আর কোন কোলাহল শুনতে পাচ্ছি না। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তাহলে আমার এ্যাসাইনমেন্ট?

Facebook Comments Box