দেশের বই ঈদ সাময়িকী

তামান্না ফেরদৌস-এর ছোটগল্প ‘স্বপ্ন কারিগর’

বৃহস্পতিবার, ২০ মে ২০২১ | ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ | 110 বার

তামান্না ফেরদৌস-এর ছোটগল্প ‘স্বপ্ন কারিগর’

স্বপ্ন কারিগর
।। তামান্না ফেরদৌস ।।


 

অরু ভীষণ তাড়াহুড়ো করে লাগেজ গোছাচ্ছে। ওর হাতে বেশি সময় নেই। অল্প কিছু সময়ের মধ্যে তাকে রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। আর ঘণ্টা দেড়েক পরে তার রাজশাহী যাবার ট্রেন ছাড়বে। অরু ভাবছিল, আজকাল ভরদুপুরেও ঢাকার রাস্তাঘাটে যে পরিমান যানজট থাকে হাতে কিছু সময় নিয়ে বের না হলেই নয়। তাই লাগেজ গুছিয়ে সে চটপট তৈরি হয়ে নিলো। অরুর স্বামী রফিক তাদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে একটা ইংরেজি পত্রিকা হাতে নিয়ে চুপচাপ বসেছিল। এতক্ষণ সে কিছু বলেনি। অবাক হয়ে অরুর ব্যাগ গোছানো দেখছিল। এতক্ষণে সে মুখ খুলল।
‘তুমি তাহলে যাচ্ছোই?’
অরু শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে বলল, ‘তুমিও চাইলে যেতে পারতে।’
রফিক কাতর গলায় বলল, ‘তোমার কী না গেলে হয় না অরু?’
অরু নরম গলায় বলল, ‘না রফিক হয় না।’
রফিক অরুর সাথে আর তর্কে গেল না। গত ত্রিশ বছরে সে নিজের স্ত্রীকে খুব ভালোমতো চিনেছে। একবার যখন বলেছে সে যাবে, এর মানে সে যাবে।
অরু রফিকের ম্লান মুখ দেখে তার কাছে এসে বসলো। তার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম গলায় বলল, ‘আমি কি তোমার কাছে কখনো খুব দামী কিছু চেয়েছি? দামী শাড়ি, দামী গয়না, তোমার অন্য সব কলিগদের স্ত্রীদের মতো বছর বছর ইউরোপ ট্যুর- এসব কিছু চেয়েছি? শুধু চেয়েছি আমার ইচ্ছেগুলোকে, আমার ভালো লাগার জায়গাগুলোকে তুমি একটু মুল্য দাও। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্কুল শিক্ষক বাবার মেয়ে আমি। আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি বোধহয় সারাজীবন গরীব স্কুল শিক্ষক বাবার মেয়ে হয়েই রয়ে গেলাম। তোমার মতো বড়লোক ইঞ্জিনিয়ারের বউ আর আমার হয়ে ওঠা হলো না।’
রফিক আলতো করে অরুর গাল ছুঁয়ে বলল, ‘আমার স্কুল শিক্ষকের মেয়েই ভালো।’

 

ঘণ্টাখানেক হলো ট্রেন ছেড়েছে। ট্রেন ছাড়ার পরেই অরু স্টেশন থেকে কেনা একটা বাংলা পত্রিকায় মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনোভাবেই মন বসাতে পারলো না। সে আড়চোখে একবার রিফাতের দিকে তাকালো। রিফাতও তার মতো ভেতর ভেতর ভীষণ উত্তেজনায় ছটফট করছে। অথচ রিফাতের পাশে রিফাতের মা স্বপ্না বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।
‘রিফাত।’
‘জি বড় মা।’
‘কেমন লাগছে তোমার?’
অরুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রিফাত বলল, ‘তোমার কেমন লাগছে বড় মা?’
‘আমাকে দেখে তুমি বুঝতে পারছো না?’
রিফাত লাজুক গলায় বলল, ‘তোমার কারণেই তো এসব হলো।’
‘তাই? শুধু আমার কারণে? তোমার নিজের চেষ্টা ছিল না? তোমার গর্ভধারিণী মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল না?’
‘তা ছিল। তবে তোমার অবদান সবচেয়ে বেশি।’
‘অনেক হয়েছে। এসব কথা আর নয়। দয়া করে এবার পড়াশোনাটা আরও মনোযোগ দিয়ে করো। অল্পের জন্য বুয়েটে চান্স পাওনি। রুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেয়েছো বলে ভেবো না তোমার সব অধ্যবসায়ের এখানেই সমাপ্তি। মনে রেখো, সবে তো শুরু। সামনে আরও অনেক পথ বাকি।’
‘জানি বড় মা। তুমি দেখো তোমাকে আমি হতাশ করবো না। ক্লাস শুরু হলেই আমি টিউশনি শুরু করব। মাসে মাসে মাকে টাকা পাঠাব। তাহলে আর মাকে বাড়ি বাড়ি কাজ করতে হবে না।’
অরু হেসে বলল, ‘খুব ভালো কথা। কিন্তু খেয়াল রেখো, এসব করতে গিয়ে তোমার পড়াশোনার যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আর শোনো, তোমার মাকে মাসে হাজার তিনেক টাকা পাঠালেই চলবে। বাকিটা আমি দেখব।’
‘তুমি আর কত দেখবে বড় মা? গত পাঁচ বছর থেকে তুমিই তো দেখে আসছো। লেখাপড়াসহ আমার যাবতীয় সব খরচ তুমি সামলিয়েছো। মাকে অন্য বাড়ির তুলনার দেড়গুণ বেশি বেতন দিয়েছো। তোমার এসব ঋণ কীভাবে শোধ করি বলো তো?’
অরু কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হতে না হতেই ছেলের মুখে খুব কথা ফুটেছে দেখছি। তোমাকে এসব ঋণ নিয়ে ভাবতে হবে না। রুয়েটে পড়ালেখার খরচ নিয়েও তুমি ভেবো না। পাশ করে ভালো একটা চাকরি করো। তারপর দেখবো এই বড় মাকে কত মনে রাখো।’

 

পাঁচ বছর আগের কথা…

এক শীতের সকালে অরু খুব মনোযোগ দিয়ে টিভি সেটের সামনে বসে জনপ্রিয় একটা বাংলা টিভি সিরিয়াল দেখছিল। এমনিতে সে খুব একটা বাংলা সিরিয়াল দেখে না। তবে এই সিরিয়ালটা ছিল প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্যের খুব জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কাছের মানুষ’ অবলম্বনে তৈরি। অরু টিভি দেখছিল। আর স্বপ্না নামে যে মেয়েটা মাত্র সাতদিন আগে তাদের বাসায় ছুটা বুয়া হিসেবে কাজে লেগেছে সে ঘরদোর পরিষ্কার করছিল। টিভি দেখার মাঝেই স্বপ্নার একটা কথায় অরু ভীষণ অবাক হয়ে স্বপ্নার দিকে তাকালো।
‘আমিও এই সিরিয়ালটা রোজ রাতে দেখি খালাম্মা। আমারও খুব পছন্দ। সিরিয়ালের এই গল্পটাও আমি পড়েছি।’
অরু ভীষণ অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি সুচিত্রা ভট্টাচার্যের “কাছের মানুষ” উপন্যাসটি পড়েছো?’
‘জি খালাম্মা। বই পড়া আমার খুব পছন্দ।’
‘তাই বলে এত মোটা বই?’
‘খালাম্মা শুধু কাছের মানুষ না, সুনীলের গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলো, সমরেশের মজুমদারের সাতকাহন, শীর্ষেন্দুর দূরবীন সব বই আমি পড়েছি।’
সেই মুহূর্তে আকাশ থেকে একটা ডানাসমেত পরী নেমে এলেও অরু বোধহয় এতটা অবাক হত না, যতটা না সে স্বপ্নার কথা শুনে অবাক হয়েছিল।
সে অবাক হয়ে স্বপ্নাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছ তুমি?’
‘ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছি খালাম্মা।’
‘সারাদিন বাসা বাড়িতে কাজ করে, নিজের সংসার সামলে কখন এসব পড়ো তুমি?’
‘রাতে পড়ি খালাম্মা। আমার বাবারও লেখাপড়া করার খুব শখ ছিল।’
‘কী করতেন তোমার বাবা?’
‘একটা ফ্যাক্টরিতে নাইট গার্ড ছিল খালাম্মা। তিন বছর আগে একটা এক্সিডেন্টে মারা গেছে। ওই এক্সিডেন্টে আমার বাবার সাথে আমার স্বামীও মারা গেছে।’
এতক্ষণে অরু স্বপ্নার বাসা বাড়িতে কাজ করার কারণটা বুঝতে পারলো। সে নরম গলায় বলল, ‘তোমার বাড়িতে আর কে কে আছে?’
‘আমার একমাত্র ছেলে রিফাত আছে। ছেলেটাও তার নানার অভ্যাস পেয়েছে। সে-ও অনেক লেখাপড়া করে।’
‘কোন ক্লাসে পড়ে তোমার ছেলে?’
‘ক্লাস এইটে।’
‘তুমি জানো কি না জানি না, রোজ সন্ধ্যার পর আমি প্রায় ঘণ্টাদুয়েক আশেপাশের কিছু গরীব বাচ্চাদের ফ্রিতে পড়াই। আজ থেকে আমার রাতের স্কুলে তোমার ছেলেকেও পাঠাবে। কেমন?’

 

অরু প্রথম দিনেই রিফাতকে দেখে বুঝেছিল এই ছেলে আর দশটা গরীব ঘরের সাধারণ ছেলেদের মতো নয়। ছেলেটার ভেতরে একটা আগুন আছে। স্কুল শিক্ষকের মেয়ে অরু। শিক্ষক বাবার কিছু গুণ তার নিজের মধ্যেও আছে। সেই সময় অরুর একমাত্র ছেলে অর্ক ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লাইড কেমেস্ট্রিতে পড়তো। অর্কর খুব ইচ্ছে ছিল বাবার মতো সে-ও ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু বেচারা অনেক পরিশ্রম করেও ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো প্রতিষ্ঠানে চান্স পায়নি। অরু রিফাতকে পড়ানোর দায়িত্ব অর্কর উপরেই ছেড়ে দিয়েছিল। অর্ক প্রথমে একটু গাই-গুই করলেও পরে সে মায়ের কথামতো রিফাতকে অনেকদিন সময় দিয়েছিল।

 

ট্রেনটা সময়মতো রাজশাহী পৌঁছে গেছে। অরু এর আগে কখনো রাজশাহী আসেনি। তাই এখানকার রাস্তাঘাট, জায়গা সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই।
সে একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে রিফাতকে বলল, ‘রিফাত আমরা সার্কিট হাউজে যাব কীভাবে?’
রিফাত হাসিমুখে বলল, ‘তুমি কোনো চিন্তা করো না বড় মা। এখানে আসার আগে আমি সব খবর নিয়ে এসেছি। স্টেশন থেকে বের হলে এখানে অনেক অটোরিকশা পাওয়া যাবে। একটা অটোরিকশা নিয়ে আমরা সার্কিট হাউজে যেতে পারব।’
কথাগুলো বলে রিফাত স্বপ্নার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলো। অরু খেয়াল করলো, স্বপ্নাও রিফাতের দিকে তাকিয়ে কেমন করে যেন হাসছে। ওদের মা-ছেলের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, তারা দু’জন অরুর কাছ থেকে কিছু একটা লুকোনোর চেষ্টা করছে। অরু মনে মনে একটু অবাক হলেও মুখে কিছু বলল না।
স্টেশন থেকে বের হতেই রিফাত আর স্বপ্নার এমন আচরণের কারণ অরুর কাছে স্পষ্ট হলো। স্টেশনের বাইরে অরুর জন্য মন ভালো করে দেয়ার মতো একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল। অরু অবাক হয়ে দেখল, রফিক আর অর্ক হাসিমুখে স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। রফিকের হাতে খুব সুন্দর একটা ফুলের তোড়া।
অর্ক অরুদের দেখতে পেয়েই গালভর্তি হাসি নিয়ে বলল, ‘কেমন সারপ্রাইজ দিলাম মা! আমাদের দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গেছো, তাই না?’
‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। তোরা কখন রাজশাহী এলি? আমি তো স্টেশনে আসার আগেও দেখে এলাম তোর বাবা ড্রয়িংরুমে বসে পত্রিকা পড়ছে। তুই-ও রোজকার দিনের মতো আজ সকালেও তাড়াহুড়ো করে নাস্তা খেয়ে অফিসে গেলি।’
‘সব ক্রেডিট তুমি নিলে হবে মা? কিছু ক্রেডিট তো আমাদেরও দিতে হবে। আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলাম রিফাতের রুয়েটে ভর্তির মতো এত স্পেশাল একটা দিনে ওর সাথে আমরাও থাকব। তাই তোমাদের টিকিট কাটার পরপর আমরা বাপ-ছেলে প্লেনের টিকিট কেটে রেখেছি।’
‘এত সব নাটক করার কী দরকার ছিল?’
‘তোমার সাথে এই নাটকটুকু না করলে তোমার এই আনন্দ অশ্রু কী আমরা দেখতে পেতাম?’

স্বপ্নের মতো সুন্দর এই পরিবারটি রিফাত আর স্বপ্নাকে নিয়ে ওদের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে চলল।
অরু আড়চোখে নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। ওর হাতে এখনো অনেক কাজ বাকি। গতকাল রাতে ওর স্কুলে নতুন একটা মেয়ে পড়তে এসেছে। মেয়েটাকে দেখেই অরুর মনে হয়েছে মেয়েটার চোখ ভর্তি অনেক স্বপ্ন। ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। মানুষের মতো মানুষ হবার স্বপ্ন। অরু ভেবে নিয়েছে, সে মেয়েটার এই স্বপ্নগুলোকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দিবে না। স্বপ্ন পূরণের কারিগর হয়ে মেয়েটার পাশে সে আজীবন থাকবে।

Facebook Comments Box