ঢাকার বই বাজার ও ব্যতিক্রমী পাণ্ডুলিপি সন্ধানী গল্প…

বুধবার, ০২ জানুয়ারি ২০১৯ | ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ | 737 বার

ঢাকার বই বাজার ও ব্যতিক্রমী পাণ্ডুলিপি সন্ধানী গল্প…

বন্ধুত্ব…
আড্ডা, নানা বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান বা বক্তৃতা শোনা আমাদের কয়েকজনের একটা বিশেষ কাজ। আনন্দেরও বটে। কয়েক বছর থেকে এসব মনের খোরাকের কাজে আমি গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সহযাত্রী। দিন দুয়েক আগে এমন এক আড্ডায় যাবার সুযোগ হলো আমাদের। যেখানে ছিল শুধু শুধু সৃষ্টিশীল দেশি-বিদেশি গ্রন্থের এক সফল বুকশপের মালিক। তাঁর সাথেই গল্পে আসবো আজ প্রথমে।

আমাদের দেশের অনেক অনেক দিনের এক গ্রন্থসুহৃদ ও লেখক অনেক দিন থেকে সুদূর আমেরিকা প্রবাসী। তিনি ওখানেও প্রকাশনা, লেখালেখি এবং গবেষণা কাজের অন্দরমহলে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। চেষ্টা করছেন বইয়ের ব্যবসা ও বিপণনটা বুঝতে। গতকাল গভীর রাতে তার সঙ্গে কথা হলো। আমার ইদানীংকার লেখায় তিনি পরামর্শ ও উৎসাহ দিলেন।

তার সঙ্গে যা গল্প হলো তারই একটু আধটু…

সেদিনের গল্পটি…
……………………………
আড্ডায় উপস্থিত ওই বুকশপের মালিক আমার মূল পেশা সম্পর্কে জানেন না। জানেন একজন সাধারণ বইয়ের ক্রেতা বা পড়ুয়া হিসেবে। মিষ্টি করে হাসেন, আস্তে কথা বলেন। যা বলছেন তার প্রত্যেকটা বর্ণ স্পষ্ট ও স্বচ্ছ বলে মনে হয়। আমি একটু সুযোগ নিলাম, এভাবে অনেক সময় নিয়ে কখনও ওনাকে পাইনি। তিনি যে বুকশপটি চালান, সেটি ঢাকায় ৯০ দশকের শুরু থেকে আমার বিশেষ পাঠসংস্কৃতি সৃষ্টির অন্যতম স্থান। যেখানে আমি আড্ডার পেছনে বসে বা দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘন্টার পর ঘন্টা…
আড্ডা দিচ্ছেন নানা সময়ের আলাদা আলাদা তারকা মানুষ। সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ, আবুল বাশার, সৈয়দ হক, শামসুর রাহমান, বেলাল চোধুরীসহ আরো আরো অনেকে….
দেশি-বিদেশিও বটে। এপার ও ওপারের।
সঙ্গে তখনকার সময়ের নাটক, সাহিত্য ও সাংবাদিক ঘরানার গ্রন্থের কাছের মানুষ তো আছেনই…

সে গল্পে অন্যসময়ে আসবো…

এখন এই আড্ডায় আসি।

যাঁর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তিনি এই কাজটি পরিচালনা করছেন প্রায় ২০ বছর থেকে। এই দোকানেই বই বিক্রি করে ওনার স্বচ্ছন্দ আসার পাশাপাশি তিনি এই ব্যবসা করে ঢাকায় বাড়ি করেছেন। আনন্দও কুড়িয়েছেন অঢেল। পরিচিতিও। এখন কয়েক বছর থেকে পাঠক যেনো সোনার হরিণ। এই বইকর্মী একসময় আড্ডা দিতেই এই বুকশপে আসতেন, আনন্দ পেতে ও বইসংস্কৃতির ছোঁয়া নিতে।

তখন তিনি ব্রিকফিল্ডের ব্যবসা করতেন।
কাজ সেরে বিকাল ও সন্ধ্যাটা বইয়ের কাছে কাটাতেন। এখন তাঁর বয়স ৫০-এর নিচে। সব বাদ দিয়ে এখনো বই ও মিউজিক নিয়ে আছেন। তাঁর কাছে সরাসরি জানতে চাইলাম, দেশের বাইরের বইয়ে আপনার কেমন থাকে বা লাভ, আর দেশি বইয়ে কেমন?
তিনি সরাসরি বললেন, বাইরের বইয়ে ৪০% এর কম কোনো সময় নয়। কোনো কোনো সময় একটু বেশি। দেশি বইয়ে ১০-২০%।
আমাদের দেশে বইয়ের মূল্য নির্ধারণ, কমিশন ও বিক্রয়মূল্য অস্পষ্ট। বাজারও জনসংখ্যার তুলনায় একদম ছোট। তাই আমরা লেখক, প্রকাশক এবং বুকশপ নিজেদের, নিজেরাই অনেক লাভবান হই না অনেকাংশে।

জানতে চাইলাম, ইদানীং বই কেন চলছে না?
মোবাইল হাতে হাতে…
আগে উপহার দিত বই, এখন ডিভাইস। আর বইসংস্কৃতি তো মন ও মগজের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখন যেন মানুষ একটু অন্য রকম রোবট রোবট হয়ে বড় হচ্ছে।
তবু চলছে, চলবে, এটা সাময়িক। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই বই পড়বে…

এই ব্যতিক্রমী মানুষটি বই বিক্রেতাই থাকতে চান। প্রকাশক হবারও কোনো আগ্রহ নেই তাঁর, যা আমাদের ঢাকায় প্রচলিত হয়ে গেছে…

এবার আসবো প্রকাশকের গ্রন্থ বিপণন চেষ্টায়।
বুকশপে শপে ঘোরা, বইমেলায় বই প্রদর্শন, বইমেলায় অংশগ্রহণের শুরুর কিছু খুঁটিনাটি ইঙ্গিতে গল্পে গল্পে বলবো…

আমি অ্যাডর্নের নামে গ্রন্থ প্রকাশ শুরু করেছি ১৯৯৫-এর পরে। ৯৯ পর্যন্ত ৭টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছি। শুরুতেই বুঝে নিতে চেষ্টা করেছি গ্রন্থ নির্মাণ কী। লেখক লিখলে সেই পাণ্ডুলিপি নিয়ে কী কী করতে হয়।বই প্রকাশ করলে কী কী করতে হবে, বই প্রকাশ না করলে কী করতে হবে।
আর প্রকাশকের কাজ কী? সেই গল্প আর কোনো দিন হবে..
এখন আসি বইকে বাজারে তোলার শুরুর গল্পে।
একজন সহযোগী নিয়ে কয়েকটি ব্যাগে নিজে ও সহযোগীর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ছুটলাম।বাংলাবাজার। নিউমার্কেট। আজিজ মার্কেট এবং আরো আরো বইয়ের দোকানে ও মার্কেটের দিকে…
আগে ছিলাম বইয়ের পাঠক হিসেবে ক্রেতা, এখন প্রকাশক হিসেবে বিক্রেতা…

বাংলাবাজারে অনেক দোকান বই বাকিতেও রাখতে রাজি নয়। রাখলেন একজন প্রকাশক কাম বিক্রেতা। ২টি বইয়ের ৩০টি করে। অন্যগুলো ১০টি করে। এতেই আমি আনন্দিত ও উৎসাহিত…
পরের গল্প আর না-ই বলি।
তাঁর মাধ্যমে ঢাকা বইমেলায় একটি করে বই প্রদর্শনের সুযোগ নিতে ছুটে গেলাম মাঠে, তিনি বললেন সুযোগ সীমিত, নিয়মনীতির ব্যাপার।

তারপর এলো একুশে গ্রন্থমেলা। ওখানেও গেলাম কোনো কোনো প্রকাশকের স্টলে একটি করে হলেও বই শুধু প্রদর্শনের জন্য রাখা যায় কি না?
সেটাও হলো না।
তবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সুযোগের খবরটি পেয়ে ওখানে প্রদর্শন ও বিক্রিরও সুযোগ মিললো। এই না পারা বেদনা ঘুচাতে, এর পর আমরা বইমেলায় অংশগ্রহণ করার পর থেকে, কোনো নতুন প্রকাশক বা ভালো বইয়ের লেখক তাঁদের নতুন বই আমাদের স্টলে প্রদর্শন ও বিক্রয়ের জন্য রাখতে চাইলে আমরা নিয়ম মেনে এই কাজটি এখনও করি।

আমাদের বই জাতীয় গ্রন্থমেলায় প্রদর্শন হচ্ছে তখন সেই কাজটিই আমার লেখক ও সহকর্মীদের কাছে গর্বের ব্যাপার। তারপর নিউমার্কেটে। ২টি দোকান নগদ টাকা দিয়ে ২ বা ১টি করে কিনে নিলেন, আর কয়েকটি বাকিতে…
আজিজ মার্কেটেও তাই…

পরে টাকা পেয়েছি কি না সেই গল্পে না গিয়ে একটি গল্প বলে এই বিষয় শেষ করবো।
বাকিটা তোলা থাকলো…

একজন বইবিক্রেতা অনেকগুলো বই নিলেন, রসিদ দিলেন, সিল মেরে চিরকুটে। মাস যায় বছর যায়। বই বিক্রির টাকা পাই না। তবু খুশি বই তো প্রদর্শন হচ্ছে। একসময় বইয়ের তাকে বই কমতে লাগলো…

কয়েক মাস দেরি করে গেলাম এক বইকর্মীসহ। সোজা জবাব, আপনারা অনেক দিন আসেননি, আমরা সেরদরে বইগুলো বিক্রি করে দিয়েছি। ওখানে আবু রুশদ-এর আত্মজীবনীও ছিলো। অনেকগুলো কপি।

চুপে চুপে বলি, ওনারা এখন অন্যতম বইবিক্রেতার পাশাপাশি কয়েক বছর থেকে প্রকাশকও। বই বিক্রয় একটি পেশা ও ব্যবসা। বই প্রকাশনাও। প্রকাশক নিজের প্রকাশনার বই বিক্রির জন্য অবশ্যই বিক্রয়কেন্দ্র করবেন। যখন ২টি কাজ একসঙ্গে করবেন, তখন কোনটির কী কাজ কীভাবে সমাধান বা পরিচালনা করবেন, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি ইদানীং দেখা যাচ্ছে, অনেক অনেক শুধুও বইবিক্রেতা বই প্রকাশও শুরু করেছেন, মেলায়ও অংশ নিচ্ছেন।

গ্রন্থ একজন লিখবেন, একটা পেশাদার গ্রুপ নির্মাণ করবে, আরেকটি গ্রুপ বিপণন করবেন…
এখানে আমরা সবই একটু একটু করি তা-ই, এখনো যা হবার তাই হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে আলাদা আলাদাভাবে পেশাদারিত্ব ও পাঠ সংস্কৃতি গড়ে উঠছে না। কোনোটারই আলাদাভাবে পেশাদারিত্ব তৈরি তেমন হচ্ছে না। বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত লেখকের ভালো বইটিও।…

এবার আসি বইমেলায় অংশ নেয়া প্রসঙ্গে…

অ্যাডর্নের মাত্র ৭টি বই। আবেদন করলাম অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নিতে। আয় ব্যয়ে কিছুটা দুঃসাহস হলেও। স্টল বরাদ্দ পেলাম না। একজন পরামর্শ দিলেন সরাসরি ডিজির কাছে যান, বই নিয়ে।
গেলাম, অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সাক্ষাৎ মিললো, বই দেখে বললেন, এই বইতো মেলায় আসা উচিত।
স্টল পাননি?
‘না’ বলাতে, পরের দিন ১১টায় পিএসের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। পরের দিন পিএস জানালো আপনারা হিসাব বিভাগে গিয়ে টাকা জমা দেন। সেই শুরু।

মেলায় অংশ নিলাম, প্রথম আলো, জনকণ্ঠ বই নিয়ে এমন উৎসাহ দিলো…
আমরা চলতে থাকলাম। তখন ডিজি ছিলেন প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তারপর একে একে বই করছি, ডবল স্টল নিতে সাহস হয় না…

২০০৪ -এ ডবল স্টল করে দিলেন, তখন বইয়ের সংখ্যা ১০০ পার হয়নি… তবে পাঠক গ্রহণ করতে শুরুর ইঙ্গিত পেলাম।

নানা বিষয়ে পাণ্ডুলিপির পরিকল্পনা ও সন্ধানের চেষ্টার টুকরো গল্প বলে শেষ করবো আজ…

এক সান্ধ্য আড্ডায় বিশেষ ঘনিষ্ঠতা এক অসাধারণ জীবনজয়ী শৈশবে ভুল চিকিৎসার শিকার দৃষ্টি প্রসারিত দৃষ্টিহীনের সঙ্গে। জীবনে সব কিছুতে প্রথম শ্রেণি। ব্যবসা ও সমাজসেবা, মানবাধিকারের কাজেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োগ পাননি অন্ধ বলে। ব্যারিস্টারি পড়ার সব ব্যবস্থা হলো, ভিসা পাননি অন্ধ বলে। সত্তর ছু্ঁই ছুঁই। এখন সারা পৃথিবী তাঁর জন্য উন্মুক্ত। বিলাতে দাওয়াতে ও নিজের কাজে গেছেন ৭০ বারের মতো।…
আড্ডায় তিনি তাঁর জীবনজয়ের গল্প বলে যাচ্ছেন একে একে…
কথা উঠলো, স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনী লেখার, তিনি বললেন ডিকটেশন দিয়ে লিখেছেন। আড্ডার মধ্যমণিকে দিয়ে রেখেছেন। তিনি পড়ে জানালে তার পর প্রকাশের উদ্যোগ নবেন। আড্ডায় নিয়মিত আসা একজন দেশের শীর্ষে থাকা আমার অগ্রজ প্রকাশক বললেন, আমাকে দিলে আমি প্রুফটা এগিয়ে রাখতে পারি।
জীবনজয়ী বললেন, তা তো তোমার কাছেই যাবে ভেবেছি…
এই তো চাই। আমার চিন্তা অন্যদিকে, এই জয়ের গল্প অনেক বড়। এটার বিশেষটা নিয়ে ইংরেজি করে, আরো আরো মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। বিশ্ব জানবে…
আমি তাঁকে জানতাম আমার অন্য কাজের কারণে। জানতাম, তার একটি ছোট ভাই ছিলো বোবা তবে শিক্ষিত। তার পরের সপ্তাহে আমি তার সময় নিলাম বসার। জানতে চাইলাম আপনি আর আপনার ভাই কীভাবে এতো বছর কাটালেন। আপনারা পরস্পর সহযোগী ছিলেন জানি।
তিনি বললেন হাতের স্পর্শের ভাষায়…
আমি বললাম, এটা কি আছে স্মৃতিকথায়। তিনি বললেন, এরিয়ে গেছি। ওটা ওখানে লিখিনি…
আমি বললাম ওটা আলাদা বিস্তারিত লিখে আমাকে দিতে পারেন?
উনি একবাক্যে, অবশ্যই।
আমি অনুরোধ করলাম, মূল বইতেও ওটার টাস রাখলে ভালো হয়। মুল বই বাংলায় একটি।
২টি আলাদা পাণ্ডুলিপির বই হবে চারটি। গ্রন্থনির্মাণ ও গ্রন্থ সৃষ্টির গল্প…

অন্য একটি ঘটনা, এমনই…
একজন মা ও বাবা এলো একুশে গ্রন্থমেলায়।
সঙ্গে হাঁটে কি হাঁটে না তিনটি শিশু।
তাঁরা জানালেন তিনটিই কন্যা এবং যমজ।
আমি কিছুক্ষণ চুপ।
শিশু তিনটিকে তিনটি ছোট বই আর মাকে একটি বড়দের বই দিয়ে সরাসরি বললাম, ভ্রূণ আসা থেকে ১০/১২…১৮ পর্যন্ত বয়সের একদম খুঁটিনাটি লিখে আমাকে দিতে হবে…
করবেন তো কাজটি?
আগে বড় করি…
বলে মিটি মিটি হাসছেন মা।
প্রতিবছর তাদের নিয়ে তিনি বইমেলায় আসেন, সঙ্গে কোনো কোনো সময় শিশুদের দাদিমাও থাকেন।

পুনর্লিখন
০৩.১২.২০১৮

Facebook Comments