ঝরঝরে ভাষায় লেখা একুয়া রেজিয়ার উপন্যাস মনোসরণি

বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১ | ২:৪৮ অপরাহ্ণ | 73 বার

ঝরঝরে ভাষায় লেখা একুয়া রেজিয়ার উপন্যাস মনোসরণি

বইয়ের নামঃ মনোসরণি
লেখকের নামঃ একুয়া রেজিয়া (মাহরীন ফেরদৌস)
প্রচ্ছদঃ ফ্ল্যাপে দেয়া নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, ভেতরে ধ্রুব এষ (!)
প্রকাশনীঃ অন্য প্রকাশ
প্রথম প্রকাশঃ ২০১৬
মূল্যঃ ২০০

আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যেখানে নিজেকে নিয়ে নিজেদের ব্যস্ততা অনেক বেশি। নিজের জন্য সময় বের করতে করতে আমরা এমন হয়ে গিয়েছি যে নিজের বলয়ের মাঝ থেকে আর বের হতে পারছি না। এ জন্য একটা পরিবারের মধ্যে থেকেও আমরা একাকী। আমাদের ডাইনিং টেবিলটা এখন শো-পিসের মত ঘরের শোভাবর্ধণ করে, ঘরের শোভা আরও বাড়ায় বৈঠকখানার ইন্টেরিয়র। কখনো এখানে বসে পারবারিক আলাপন সারা হয় কমই, হয়ত অতিথি এলে একটু এক হয়ে বসা যায়। আর সেই রকম অতিথিরাই বা এখন কোথায়? বরং কেউ এখন বেড়াতে এলে তাকে উটকো ঝামেলা মনে হয়। আমাদের শৈশবে দেখা দিনগুলো কি এমন ছিল? আমি এমন একটা দিনের কথা মনে করতে পারিনা যখন বাসায় কোনো মেহমান থাকত না! মাসকাবারিদের সাথে সাথে দুই-এক দিনের অতিথির কমতি ছিল না। দুপুর অথবা রাতের খাবার কখনও আলাদা খাওয়া দাওয়া করেছি বলে মনে পড়ে না। বিকেলের চা খাবার সময়টাও ছিল পারিবারিক আবহে ভরপুর, নিজেরা তো থাকতামই পাশাপাশি প্রতিবেশিরা যোগ দিত সে-সব আড্ডায়। এই সব দিনগুলো অনেক দিন আগেই ফিকে হয়ে গেছে। হয়তো মফস্বলে এখনো এমন দেখা যায়। ডাইনিং টেবিলে লোকদেখানো খাবার-দাবার রাখা হয়; পড়ার টেবিল, বিছানা, টিভির সামনে সোফাটা এখন আমাদের সচারাচর খাবারের যায়গা হয়ে গিয়েছে। আসলে আমাদের এক সাথে থাকার সুতোগুলো একটু একটু করে আমরাই খুব আনমনে ছিড়ে যাচ্ছি। নিজের ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হচ্ছি। সব দোষ যে ব্যাক্তির একার তা নয়; রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থা ও সামাজিক পারিপার্শ্বিকতারও দায় আছে কিন্তু ব্যক্তিক দায় অনেক বেশি। কিন্তু ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাওয়া কেন? কারণ আর কিছুই না, “মনোসরণি” উপন্যাসের যে জটিল সমীকরণ তার অনুঘটকগুলো এই শীবের গীতের মধ্যেই আছে।

“মনোসরণি” এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে শাহানা, জামান, অজন্তা ও শিহাব এই চারটি চরিত্রকে ঘিরে। কাহিনীর বড় অংশ জুড়ে শাহানা আর জামানের গল্প রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ক্যারিয়ার-সফল এই জুটির প্রারম্ভিক বর্ণনা থেকেই দেখানো হয়েছে দ্বন্দ্ব। শাহানা ও জামানের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে একটা দেয়াল তৈরী হয়ে যায় তাদের সম্পর্কের মাঝামাঝি সময়ের দিকে এসে। অনেকটা হুট করেই, জামানের ভুলে। কিন্তু সেই ভুলটাই বড় হয়ে ওঠে দুজনের মাঝে। জামান মনে করে সে বিষয়টি শাহানাকে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে এবং নিজের ভুলের জন্য সে ক্ষমা চেয়েছে। অন্যদিকে শাহানা জামানকে হয়তো ক্ষমা করে দেয় কিন্তু মনের ভেতর জীয়ল মাছের মত ক্ষোভটাকে জিইয়ে রাখে। দুজনের অহং বোধটা অনেক বেশি হবার কারণে তাদের দুরত্বটা অনেক বেশি হতে থাকে। এমন পরিস্থিতির মাঝে শাহানা জামানকে ছেড়ে চলে যায়। এই সম্পর্কের সুতো যখন ছিড়ে যাবার উপক্রম, তখন জামানের বাবা ত্রাতা হয়ে আসেন। ছেলেকে কিছু জীবনবোধ এর কথা বলেন, যা জামানকে নাড়া দেয়। অন্যদিকে অজন্তা, জামানের খালাতো বোন, মফস্বল থেকে আসা মেয়ে, ঢাকায় হোস্টেলে থাকে। পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশনি করে। অজন্তার ছোটবেলাটা আনন্দ থেকে নিরানন্দ হয়ে ওঠে ছয় বৎসর বয়সে প্রাণোচ্ছল ছোট চাচুকে হারিয়ে, একটা মৃত্যু পরিবারটিকে দীর্ঘদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। এই শহরের ব্যস্ততায় অজন্তা তার পেছনের দিকের ঘটনা গুলো চেয়ে দেখে। কৈশোরের প্রথম প্রেম আদনানের কথা এবং ব্রেক-আপের প্রসঙ্গ উঠে আসে। অজন্তার গল্পে আসে সহপাঠি শিহাবের কথা। শিহাবের সাথে অজন্তার গল্পটা ঠিক প্রেমের নয়, অনেকটা বন্ধুতার। শিহাবের প্লে-বয় টাইপের জীবনের পেছনে একটা গল্প লুকানো থাকে যা কষ্টের, তা অজন্তার সাথেই শেয়ার করে। শিহাবের কষ্ট দূর হয় একসময়। কিন্তু অজন্তার কষ্ট কি শেষ হয়? নাকি ভূমিকায় লেখা “জীবন এক বিষন্ন ভ্রমণ” হয়ে থাকে?

উপন্যাসের ভাষা ঝরঝরে, কোনো প্রকার হোচট খাওয়া ছাড়াই এক বসায় পড়া শেষ করা যায়। লেখক অহেতুক জটিলতা তৈরি করেননি ভাষাগত প্রয়োগ করতে গিয়ে। মানব সম্পর্কের জটিল সমীকরণ অত্যন্ত সহজ ভাষায় প্রকাশ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ এর প্রভাব আছে লেখায়, একটু সচেতনভাবে পাঠ করলেই চোখে পড়বে। কিন্তু এটা দোষের পর্যায়ে পড়ে না। রবীন্দ্র-উত্তর সময়ে রবীন্দ্র বলয় থেকে যেমন বের হওয়া কঠিন ছিল তেমন হুমায়ূন পরবর্তী সময়ে যে এত দ্রুত লেখকরা বের হয়ে আসবে সেটা ভাবা ভুল। বরঞ্চ পাঠক-প্রিয় লেখা তৈরী করতে গেলে হুমায়ূন প্রভাবটা আসা স্বাভাবিক। চরিত্র আকতে যেয়ে অনেকটা একপেশে হয়ে গিয়েছে কোথাও কোথাও। চরিত্রগুলো বড্ড বেশি আত্মকেন্দ্রিক, অন্যর দিকটা ভাবার সময় কম। এদিক দিয়ে শিহাব সম্পূর্ণ আলাদা, পারিপার্শ্বিকতার দিকেও তার নজর রয়েছে। কিন্তু শিহাবের উপস্থিতি অনেক কম। অজন্তাকে আত্মকেন্দ্রিক না মনে হলেও দিনশেষে তার নিজের বলয়ের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করে। অজন্তাকে দিয়ে লেখকের শুরু, শেষও হয় তাকে দিয়েই। কিন্তু পুরো উপন্যাস পড়ে অজন্তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র ভাবতে পারি না। বরঞ্চ শাহানা-জামান কেন্দ্রীয় চরিত্র হবার পুরো অধিকার রাখে। শাহানা-জামান এবং অজন্তা-শিহাব হিশেবে যদি কাহিনী সংজ্ঞায়িত করি তাহলে এক খালাতো বোনের সম্পর্ক ছাড়া তাদের মধ্যে কোনো যোগসুত্র নেই, অথচ উপন্যাসে গল্পের যোগসুত্র প্রয়োজন। নাহলে চরিত্র ও জুটি নিয়ে আলাদা আলাদা গল্প লেখাই শ্রেয়। উপন্যাস ও বই নিয়ে লেখক ও প্রকাশকের আরও মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কাহিনীর কোনো পরিচ্ছদ শুরুর বর্ণনা একটি চরিত্রে শুরু করলেও শেষ হয়েছে অন্য চরিত্র দিয়ে, অর্থাৎ পরিচ্ছদের মাঝখান থেকে অন্য চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করেছে। আবার একটি লাইনের মধ্য দিয়েই শাহানার ডেস্ক থেকে শিহাবের কেবিনে ঢুকে যাবার বর্ণনাও আছে। আর প্রচ্ছদে দুইজনের নাম যাওয়ার বিষয়টির দায় প্রকাশক এড়াতে পারে না। সচেতন পাঠক মাত্রই এগুলো পীড়াদায়ক।

জীবনানন্দের কবিতায় লেখক জীবন খুজে পান। “মনোসরণি” নামকরণের ক্ষেত্রে জীবনানন্দ দাশের কবিতা ভুমিকা রাখতে পারে। কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্য রয়েছে নামকরণের সাথে। মানুষের মনের গলির মধ্যে যেয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন লেখক, সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে নামকরণ স্বার্থক।

লেখক সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য দেয়া নেই বইয়ে ফ্ল্যাপে। যেটুকু আছে, তাতে দেখা যায় লেখক স্বাধীনচেতা, আনমনা। ভালোবাসেন স্বপ্ন দেখতে, মানুষকে নিয়ে ভাবতে। জীবনানন্দের কবিতায় জীবন খুজে পান। লেখকের বিদেশি প্রিয় লেখকের মাঝে আছে পাওলো কোয়েলহো, ও হেনরি এবং ম্যাক্সিম গোর্কি। ২০১৩ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস।


[ বই-পুস্তক-প্রকাশনা এবং বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের যে কোনো সংবাদ প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট ছবিসহ আমাদের ই-মেইল করতে পারেন : desherboi@gmail.com ]

Facebook Comments Box