জীবন ও সমাজবাস্তবতা নিয়ে উপন্যাস ‘শোধ’

সোমবার, ২৯ জুন ২০২০ | ২:২৮ অপরাহ্ণ | 204 বার

জীবন ও সমাজবাস্তবতা নিয়ে উপন্যাস ‘শোধ’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক-এ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ভাষাচিত্র’ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দেশের বই’ যৌথভাবে ভাষাচিত্রের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ ‘ভাষাচিত্র বুক ক্লাব’-এ নিয়মিত বুক রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
আয়োজনের অংশ হিসেবে বাছাইকৃত ও নির্বাচিত বুক রিভিউ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে আমাদের পোর্টালে। আজ প্রকাশিত হলো লুনা নুসরাত-এর উপন্যাস ‘শোধ’-এর রিভিউ।

রিভিউ করেছেন এই সময়ের জনপ্রিয় ভাষাচিত্রী রেশমী রফিক


॥ রেশমী রফিক ॥
প্রিয় লেখকের তালিকায় অনেকেই আছে সমসাময়িক কালের। তাদেরই একজন লুনা নুসরাত। পেন্সিল পাবলিকেশনসের জনপ্রিয় লেখক তিনি। তার লেখার প্রেমে পড়ি এই “শোধ” উপন্যাস থেকেই।
কোনো এক বিচিত্র কারণে রাতুলের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা ছিল। যদিও রাতুলকে একদমই পছন্দ হয়নি। তার লাইফস্টাইল, চলাফেরা, তার আচার-আচরণ, মনমানসিকতা কোনোটাই না। আমার দৃষ্টিতে কোটিপতি বাবা-মায়ের অতি আহ্লাদে বখে যাওয়া ছেলে এই রাতুল। তাকে নায়কের অবস্থানে দাঁড় করানো যায় না কোনােভাবেই। উপন্যাসের শুরুতেই এই ছেলের চন্ডামি! একাধারে অনেকগুলো মেয়ের সাথে তার এফেয়ার… স্যরি ওয়ান বাই ওয়ান। মানে আজকে এর সাথে… তো কালকে ওর সাথে। এক মেয়েতে এই বখাটে রাতুলের মন বসে না। পুরাই ক্যারেকটারলেস! কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, উপন্যাসটা পড়তে পড়তে আমি নিজের অজান্তেই দুর্বল হয়ে গেলাম রাতুলের প্রতি। যখনই যে পর্বে রাতুলের কথা উল্লেখ থাকতো অথবা রাতুলের কোনাে সংলাপ থাকতো, আমি বারবার সেই পর্বটা পড়তাম। কেন যেন রাতুলকে আবিষ্কার করার নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। কে এই ছেলে? তাকে পুরোপুরি পড়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়েছিল। লেখক ধীরে ধীরে আমার সেই নেশা কাটিয়েছেন। আমার ইচ্ছেটা অবশেষে পূরণ হয়েছে। গল্পের একটা পর্যায়ে এসে আমি আবিষ্কার করলাম, রাতুল আসলে খুবই সাধারণ একজন মানুষ, যার মনের মধ্যে শুধুই একজনের বসবাস। শুরুতে যে রাতুলকে দেখেছিলাম, পরবর্তীতে তাকে হারিয়ে ফেললাম। চোখের সামনে নতুন এক রাতুল এসে দাঁড়াল। জানতে পারলাম আগের সবকিছুই ছিল তার মুখোশ। পারিপার্শ্বিকতা তাকে ওমন বানিয়ে ফেলেছিল।

 

উপন্যাসের একটা চরিত্র পাঠকের মনে গাঢ় প্রভাব ফেলেছে, এই ক্রেডিট পুরোটাই লেখকের। তিনি রাতুলকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, শুরুতে আপনি একটা নেগেটিভ ধারণা মনের মধ্যে পুষতে শুরু করবেন রাতুল সম্পর্কে। একইসাথে রাতুলের প্রতি চুম্বকের মতো অদৃশ্য একটা আকর্ষণ আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াবে এবং সময়ের সাথে সাথে আপনার আগের ধ্যানধারণা বেমালুম পালটে গিয়ে নতুন এক রাতুল দাঁড়িয়ে যাবে আপনার সামনে।
এমন একটা চরিত্র ফুটিয়ে তোলা কিন্তু খুব সহজ ব্যাপার নয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই এই কাজটা করতে হয়। আর লেখক সেটাই করেছেন নিখুঁতভাবে।
রাতুলের মনের সেই মানসীর দেখা মিলল যখন, তখন সে নতুন করে তার জীবন সাজাতে চাইল। কিন্তু তার আগেই তাকে শোধ করতে হলো তার বাবার পুরনো এক পাপের বোঝা। কী সেই বোঝা? কেনই-বা বাবার পাপের গুরুদন্ড তার উপর গিয়ে পড়ল?
…সবকিছুই যদি এই রিভিউতে বলে দিই তাহলে আর বইটা পড়ার মজা থাকবে না, প্রিয় পাঠক। তাই সেটুকু আপনাদের জন্য তুলে রাখলাম। আমি শুধু উপন্যাসের কমপ্লিমেন্ট দিতে পারি এভাবে যে, সেই সময়ে পেন্সিলের সুপারহিট উপন্যাস ছিল এটা। সম্ভবতঃ পেন্সিলের প্রথম বড়াে ধারাবাহিক! টান টান উত্তেজনা আর পরের পর্বে কী হবে এই অপেক্ষাতেই পেন্সিলের পাঠকেরা জমে গিয়েছিল একদম। তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। যারা সত্যিকারের পাঠক, তাদের জন্য এই বইটা কালেকশনে রাখার মতো একটা বই!

 

উপন্যাসটা শুধুমাত্র রাতুলকে ঘিরে নয়। এখানে আছে উচ্চবিত্ত জীবনের চোখ ধাঁধানো বিলাসিতা এবং তার আড়ালে ঘন জমাট অন্ধকার! সেইসব মানুষের বিচিত্র সব ইচ্ছে আর কাজকর্ম! কখনো বা ঘৃণা হয় খুব। কখনো গা গুলিয়ে উঠে। একই সাথে অপর পিঠে রয়েছে সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবন এবং নিম্নবিত্ত বা নিষিদ্ধ জীবন! লেখক একই সমান্তরালে সমাজের এই তিন ধরনের জীবনকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে একে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত! উচ্চশিক্ষিত কর্পোরেট সোসাইটির মেয়ে রিহানার সাথে আপনমনেই তুলনা চলে আসে কমলা নামের একজন পতিতার। দুইজনই একই পেশায়! কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার মান যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। রাতুলের বাবা মীর সাহেব আর মা রাহেলার জীবনগাঁথাও কিন্তু কম বিচিত্র নয়! মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাইরে থেকে আপনি কিচ্ছু টের পাবেন না। দেখলে মনে হবে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কী সুন্দর নিপাট সুখী ফ্যামিলি তাদের! অথচ ভেতরের চিত্রটা একদমই অন্যরকম। লাবণ্যের গল্পটুকু না হয় আপনাদের জন্যই তুলে রাখলাম। নিজেই জেনে নিন কী ঘটেছিল তার জীবনে। কেন তাকে খুন করা হয়েছিল? শাফিনকেও চিনুন। আর সাদেককে তো বটেই। এরা সবাই আমাদের চারপাশের চরিত্র! সবথেকে বেশি মন কেড়েছে শোধের শেষটুকু! উপন্যাসটা যতই শেষের দিকে এগুবে, ততই মন জুড়ে একটা অস্থিরতা ছেয়ে যাবে নীরবে। আর এই অস্থিরতার কারণেই উপন্যাসটা সফল আর পরিপুর্ণ!
প্রচ্ছদ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। কারণ সেটা ধ্রুব এষের করা। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে উনি কতটা জনপ্রিয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তার আঁকা প্রচ্ছদ নিয়ে কিছু বলার দুঃসাহস আমার নেই। তবে, সাধারণ দৃষ্টিতে প্রচ্ছদটা নজর কাড়ার মতোই। হাজারও বইয়ের ভিড়ে এই প্রচ্ছদটা আপনার মনোযোগ কেড়ে নিবে নিঃসন্দেহে।
[৮ই মে, ২০২০]


বইয়ের নাম : শোধ
লেখক : লুনা নুসরাত
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশনী : পেন্সিল পাবলিকেশনস

 


প্রিয় লেখক-পাঠক-প্রকাশক

আপনার ভালোলাগা যে কোনো বইয়ের রিভিউ পাঠাতে পারেন আমাদের। বইয়ের একটি ভালো ছবিসহ আপনার লেখা ইমেইল করুন এই ঠিকানায় : desherboi@gmail.com

Facebook Comments