জাহাঙ্গীর ভাই : স্মৃতিতে, শ্রদ্ধায়

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২০ | ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ | 193 বার

জাহাঙ্গীর ভাই : স্মৃতিতে, শ্রদ্ধায়

॥ মোরশেদ শফিউল হাসান ॥

অবশেষে তিনি চলেই গেলেন। সবার সব প্রার্থনা, প্রত্যাশা ও প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে। আমাদের সকলের প্রিয়, খুব ভালোবাসার মানুষ জাহাঙ্গীর ভাই, ‘সুবর্ণ’ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহফুজুল হক। আর কখনো কোনো শুক্রবারের সকালে তাঁর ফোন আসবে না। জানতে চাইবেন না, ‘বলেন ভাই/স্যার, কী খবর? কী বই লিখছেন এবার? আমি কি কিছু পাবোটাবো?’ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুদিন আগেও তাঁর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কত বিষয় নিয়েই না আলাপ হলো!
বয়সের দিক থেকে সর্বজ্যেষ্ঠ না হলেও, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের জ্যেষ্ঠ প্রকাশকদের একজন। ভদ্রতা, বিনয়, সৌজন্যবোধ এবং রুচিশীলতার দিক থেকে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় মানের মানুষ আমাদের প্রকাশনা তথা বিদ্যাচর্চার জগতে আর কজন ছিলেন বা আছেন, আমার জানা নেই। ‘অজাতশত্রু’ কথাটাকে ঠিক ভালো না মন্দ কোন তাৎপর্যে গ্রহণ করবো, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে তা নিয়ে মাঝে মাঝে আমার মনে ধন্দ জাগে। তবে জাহাঙ্গীর ভাইকে যারা চিনতেন, জানতেন, তাঁদের সবাই মনে হয় একবাক্যে স্বীকার করবেন, ‘অজাতশত্রু’ কথাটা তাঁর বেলায় আক্ষরিক অর্থেই প্রযোজ্য ছিল।

 

তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক প্রকাশক-লেখকের ছিল না। তাঁর ছোট ভাই আহমেদ মাহমুদুল হকের (মাওলা ব্রাদার্স) সঙ্গেই ছিল আমার বন্ধুত্ব। সেদিক থেকে এবং বয়সের বিচারেও তিনি ছিলেন আমার বড় ভাইয়ের মতো। আমিও আমার দিক থেকে তাঁকে সেভাবেই দেখতাম, শ্রদ্ধা করতাম। তবে আমি তাঁকে যেমন ‘জাহাঙ্গীর ভাই’ বলে সম্বোধন করতাম, তেমনি তিনিও আমাকে সব সময় ‘মোরশেদ ভাই’ বলতেন (পেশায় শিক্ষক বলে কখনো হয়তো মজা করে ‘স্যার’ও)। প্রথমদিকে বিব্রত বোধ করলেও, আপত্তি করলেও, শেষদিকে মেনে নিয়েছিলাম। বুঝেছিলাম তাঁর বিনয়ী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এটাই হয়তো মানানসই।
নিজেকে তিনি সবসময় একজন ব্যর্থ বা অসফল মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করতেন। প্রকাশক বা পুস্তক ব্যবসায়ী হিসেবে অভিজ্ঞতার নিরিখেই বলাবাহুল্য তিনি কথাটা বলতেন (না হলে সাংসারিক জীবনে তিনি যথেষ্ট সুখী ও সন্তুষ্ট মানুষ ছিলেন বলেই আমার ধারণা)। তবে সফল হওয়ার চেনা পথগুলো গ্রহণেও তাঁর ছিল অনীহা। ভাবতেন, বলতেন, একজীবনে নিজেকে আর বদলাতে পারবেন না। আমার সঙ্গে তাঁর আলাপে দেশ বা সমাজের চলমান পরিস্থিতি, প্রকাশনা তথা বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার জগতের নেতিবাচক বাস্তবতা ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তাই প্রাধান্য পেত। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলাপ আমাদের মধ্যে কখনোই তেমন হয়েছে বলে মনে পড়ে না। আমি নিজেও কতকটা হতাশাবাদী মানুষ বলেই হয়তো তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তারপরও আমি এবং আমার জানামতে তাঁর বন্ধু ও ঘনিষ্ঠজনদের অনেকে (যেমন তাঁদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বন্ধু ঊর্মি রহমান) জাহাঙ্গীর ভাই সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তাঁর এই হতাশাবাদী স্বভাব বা বৈশিষ্ট্যের কথাটা উল্লেখ করে তাঁর সামনেই কখনো কখনো রসিকতা করেছি। বলেছি, ‘আপনার/জাহাঙ্গীর ভাইয়ের এই হতাশ ভাবটা আর গেল না।’ তিনি মুখে তাঁর সেই পরিচিত স্মিত হাসিটা ফুটিয়ে আমাদের সে রসিকতা উপভোগ করতেন।

ছিলেন কিছুটা অভিমানীও। প্রায়ই অনুযোগ করে বলতেন, বড় বড় প্রকাশকদের সঙ্গেই আমার জানাশোনা, ওঠাবসা, তাঁদেরকেই বই ছাপতে দিই: ‘আমার মতো গরিব প্রকাশককে কি মনে ধরবে?’ আমি তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করতাম আমার বই ছেপে গরিব প্রকাশক আরো লোকসানে পড়ুক সেটা আমি চাই না। তবু তাঁর অনুযোগের মুখে আমি তাঁকে বই দিয়েছি। তিনি আমার পাঁচটির মতো বই প্রকাশ করেছেন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ও নিজে যত্ন নিয়ে তিনি সে সব বই প্রকাশ করেছেন। এমনও হয়েছে, একুশে বই মেলায় দেখা হতে, আমার সেবার নতুন কী-কী বই বেরিয়েছে বা বেরুচ্ছে, কারা বের করছে, জানতে চেয়েছেন। তারপর অনুযোগের সুরে সেই কথাটার পুনরাবৃত্তি করেছেন, ‘আমি ভাই ছোট প্রকাশক…!’ কথার পিঠে চ্যালেঞ্জ দিয়ে আমি বারদুয়েক তাঁকে বলেছি, ‘এখন দিলে বই বের করতে পারবেন?’ তিনি সানন্দে সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বলেছেন, ‘অবশ্যই!’ হয়তো সেদিন রাতেই বা পরদিন আমি তাঁকে একটা পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিয়েছি। সত্যি সত্যি মেলার মাঝেই তিনি বই বের করে দিয়েছেন। তিনি আমার প্রথম যে বইটি প্রকাশ করেন, সেটি ছিল ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস বিষয়ে জনপ্রিয় বিজ্ঞান সিরিজের একটি ছোট্ট বই (‘জীবনের শত্রুমিত্র’)। অজস্র চিত্র ও নকশা শোভিত। সে সময় নেট থেকে ছবি সংগ্রহের কোনো সুযোগ বা সে সম্ভাবনার কথাও আমাদের জানা ছিল না। বিভিন্ন কোষগ্রন্থ থেকে স্ক্যান করে ছবিগুলো নিতে হয়েছিল। প্রথম যেদিন স্টেডিয়াম মার্কেটের দোতলায় ‘সুবর্ণ’-এর বুকস্টোরে বসে তাঁকে আমি হাতে স্কেল, কাঁচি, আঠার টিউব ইত্যাদি নিয়ে আমার সে বইটির ডামি তৈরি করতে দেখেছিলাম, সত্যি মুগ্ধ হয়েছিলাম। লেখক হিসেবে আমি অন্তত আমার অভিজ্ঞতায় শেষাবধি বই প্রকাশে তাঁর এই ব্যক্তিগত প্রযত্নের পরিচয় পেয়েছি। প্রুফ দেখা থেকে প্রচ্ছদ পরিকল্পনা সব ব্যাপারেই তাঁকে নিজে শ্রম দিতে দেখেছি। গরিব প্রকাশক বলেই কি?

 

আমি ব্রাজিলের পরিবেশ আন্দোলনের শহিদ চিকো মেন্দেসের ওপর একটি বই লিখছি জেনে, তিনি আগেই আমার কাছ থেকে কথা আদায় করে ছেড়েছেন, বইটি আমি তাঁকেই দেব। সে-সময় বাংলাদেশে পরিবেশ নিয়ে এখনকার মতো কথাবার্তা শুরু হয়নি। আর চিকো মেন্দেসের নাম বোধ হয় পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদেরও অনেকে জানতেন না (এখনও কি সবাই জানেন?)। কিন্তু দেখলাম জাহাঙ্গীর ভাই চিকো সম্পর্কে আগে থেকেই জানেন। বললেন, যে দায়িত্ববোধ নিয়ে আমি লিখছি, সেই একই দায়িত্ববোধ থেকে তিনি বইটি প্রকাশ করতে চান। এরপর তো আর দ্বিধা প্রকাশের সুযোগ থাকে না। এমনও ঘটেছে, ঝুঁকি আছে ভেবে অন্য প্রকাশক শেষ মুহূর্তে যে লেখাগুলো ছাপতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন, বাদ দিতে চেয়েছেন, সে লেখাগুলো অন্তর্ভুক্ত করেই তিনি শেষমুহূর্তে আমার একটি বই প্রকাশ করেছেন।
তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত আমার সর্বশেষ বইটি ছিল ‘কিশোর সমগ্র’। বইটি শিশুসাহিত্যিক রহীম শাহের অনুরোধে অন্য এক প্রকাশনা সংস্থার জন্য আমি গুছিয়ে দিয়েছিলাম। একদিন কথাপ্রসঙ্গে আমার কাছ থেকে জানতে পেরে জাহাঙ্গীর ভাই বললেন, তিনিই আমার কিশোর সমগ্র বের করবেন। এর আগে কবে নাকি আমাকে বলেছিলেনও (আমি পরে মনে করতে পেরেছি, তিনি বলেছিলেন, তবে আমি হয়তো তখন গুরুত্বের সঙ্গে নিইনি)। আমি তাঁকে বললাম, আরো অন্তত দুজন প্রকাশক আমার কিশোর সমগ্র বের করতে চেয়েছেন কিন্তু আমি রাজি হইনি। কারণ একটাই, আমার কিশোর সমগ্র কে কিনবে, কে পড়বে? শেষে বরাবরের মতোই যোগ করলাম, ‘আপনার মতো ছোট ও গরিব প্রকাশকের এ ঝুঁকি নেয়া উচিত হবে না।’ তারপরও তিনি আমার সম্মতি নিয়ে রহীম শাহের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মনে মনে আমার আশা ছিল, তিনি ব্যর্থ হবেন। কিন্তু রহীম শাহ আমাকে ফোন করে জানালেন, ‘বুঝতেই পারেন, জাহাঙ্গীর ভাই কিছু বললে তাঁকে না করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। তিনি নিজে এসে ব্যাগ ধরে বইগুলো নিয়ে গেছেন।’ ‘অসফল’ বা ‘গরিব’ যাই হন, দলমত নির্বিশেষে প্রকাশক-লেখক সকল মহলে জাহাঙ্গীর ভাই এমন একটি সম্মানের আসন অধিকার করে ছিলেন। আসলে এ কথা বোঝাতেই এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করলাম।
অসুস্থ অবস্থায় নিজে প্রুফ দেখে তিনি সেবার বইমেলার শুরুতেই আমার কিশোর সমগ্র বের করে দেন। চমৎকার প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও অঙ্গসজ্জায় সমৃদ্ধ বইটি হাতে পেয়ে আমি নিজেই শুধু খুশি হইনি, রহীম শাহও পরে বইটি দেখে তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। আমার কোনো বইই জাহাঙ্গীর ভাই তেমন বিক্রি করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। লাভবান হওয়া তো দূরের কথা। আমার দিক থেকে তাই কখনো আমি তাঁর কাছে রয়্যালটি চাওয়ার কথা ভাবিনি। কিন্তু তিনি নিজে থেকে আমাকে কয়েকবার (বই বিক্রি করে নাকি না করে জানি না) রয়্যালটি বাবদ টাকা দিয়েছেন। ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর অসফলতার পেছনে এই ভালো মানুষীরও নিশ্চয় একটা ভূমিকা ছিল!

 

গত সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অনেক প্রকাশকের জন্য অনেক লেখকের বইয়ের আমি ব্লার্ব লিখে দিয়েছি। সংখ্যায় শতাধিক তো হবেই। এর আগে লেখক ও প্রকাশকদের কারো কারো আগ্রহ সত্ত্বেও কখনো ব্লার্বের নিচে নিজের নাম ছাপতে দিতে রাজি হইনি। কিন্তু একবার দেখা গেল, জাহাঙ্গীর ভাই আমাকে না জানিয়েই বদরুদ্দীন উমরের ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বইয়ের নতুন সংস্করণের তিন খণ্ডেরই ব্লার্বের নিচে আমার নাম ছেপে দিয়েছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করাতে তিনি বললেন, ‘আরে ভাই, আমার ভালো লেগেছে লেখাটা, মনে হলো নামটা দেওয়া উচিত। তাছাড়া উমর ভাইকেও দেখিয়েছি, উনি পছন্দ করেছেন। সমস্যা কী? ভুল হলে মাফ করে দিয়েন।’ তো এই ছিলেন জাহাঙ্গীর ভাই! পরে ওই উদাহরণ দেখিয়েই মাহমুদ এবং অন্য কেউ কেউ আরো কয়েকটি বইয়ের ব্লার্বে আমাকে নাম দিতে রাজি করিয়েছেন। সে কথা জেনেও জাহাঙ্গীর ভাই হেসেছেন, ‘ভালোই তো! আমি শুরু করলাম!’
সম্প্রতি করোনাকালে গৃহবন্দি অবস্থায় মাঝেমাঝেই তিনি আমাকে ফোন করে দীর্ঘক্ষণ নানা বিষয়ে কথা বলতেন। হঠাৎ ফোন কেটে গেলে অনেক সময় তাঁকে আর আমার ফিরে ফোন করা হতো না। এ নিয়ে পরেরবার ফোন করার সময় তাঁর অনুযোগের উত্তরে আমি আমার ‘গরিবি’র কথা বলতাম। আমি তাঁকে বারবার ফেসবুকে একটিভ হতে বলতাম, মেসেঞ্জারে কথা বলা যে সাশ্রয়ী সেটা বোঝাতাম। উত্তরে তিনি একটাই কথা বলতেন, তিনি পুরনো যুগের মানুষ, ওসব বোঝেন না। আমি তাঁকে বলেছিলাম, ভাবী, মেয়ে কিংবা নাতি-নাতনিদের কারো সাহায্য নিয়ে একাউন্ট খুলতে। আমি জানতাম না তিনি হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করেন। তিনিই আমাকে একদিন জানালেন।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারি বই কেনা নিয়ে ফেসবুকে আমার পোস্টের কথা জেনে বললেন, তাঁকে হোয়াটস অ্যাপ-এ তা কপি করে পাঠাতে। অবশেষে হাসপাতালে যাওয়ার বোধহয় মাত্র দিন দুই আগে তিনি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন। আমি তাঁকে স্বাগত জানিয়ে বার্তা দিয়েছিলাম। তিনি আমার দু-একটা পোস্ট পড়ে আমাকে ফোনও করেছিলেন। সেদিন কে জানতো, সেটাই হবে ফোনে তাঁর সঙ্গে বলতে গেলে আমার শেষ আলাপ। এরপরও অবশ্য একবার আমি তাঁকে ফোন করেছি। তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন জেনেই করেছিলাম। ভেবেছিলাম ফোনটা ভাবী বা বাসার অন্য কেউ ধরলে তাঁদের কাছ থেকে তাঁর অসুস্থতার বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। কিন্তু হাসপাতাল বেডে ফোনটা তাঁর কাছেই ছিল। ফোনটা ধরে ক্ষীণকণ্ঠে তিনি বললেন, ‘মোরশেদ ভাই, আমি হাসপাতালে।’ আমি তাঁকে কিছু ভরসার কথা শুনিয়ে এবং বিশ্রাম নিতে বলে তাড়াতাড়ি ফোনটা কেটে দিলাম। বললাম, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে কথা বলবো।

তিনি হাসপাতালে যাওয়ার কয়েকদিন আগে আমি নিজে থেকে তাঁকে ফোন করে তাঁর শিক্ষক প্রয়াত অধ্যাপক মির্জা হারুণ-অর রশিদের একটি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির কথা তাঁকে বলেছিলাম। বলেছিলাম, নজরুলের সচেতন জীবনের শেষ দিনগুলো, তাঁর অাধ্যাত্মসাধনা ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হারুণ স্যার বিভিন্ন তথ্য-উপকরণ সংগ্রহ করে একটা বই লেখার কাজ শুরু করেছিলেন। আমার সঙ্গে প্রায়ই বইটির বিষয়বস্তু ও সূত্র-উপকরণ নিয়ে তাঁর কথা হতো। আমি তাঁকে সবসময় বইটা শেষ করার জন্য তাগিদ দিতাম। কাজটা শেষ না করেই তিনি মারা যান। কতটুকু লিখেছিলেন আমার জানা নেই। মৃত্যুর আগে স্যারের অসুস্থ অবস্থায় একদিন জাহাঙ্গীর ভাই, মাহমুদ ও আমি তাঁকে তাঁর ওয়ারীর বাসায় দেখতে যাই। তখন তিনি একেবারে শয্যাশায়ী। তার আগে একদিন আমার স্ত্রীকে নিয়ে স্যারের বাসায় বেড়াতে গেলে (স্যার তখন সুস্থ) তিনি আমাকে বলেছিলেন, তাঁর নোট করার কাজ শেষ হয়ে গেছে। আমি যেন সংগৃহীত বইপত্রগুলো নিয়ে আসি। তিনি চেয়েছিলেন, তিনি লেখাটার খসড়া করে আমাকে দিলে আমি যেন সবটা গুছিয়ে ও প্রয়োজনীয় সম্পাদনার পর কাউকে দিয়ে বইটি প্রকাশের ব্যবস্থা করি। আমি অবশ্য বইগুলো সেদিন আনিনি। বলেছিলাম লেখা শেষ হলে একবারেই সব নিয়ে দেখবো। তারপর তো স্যার চলেই গেলেন, আমার আর দায়িত্বটা পালন করা হয়নি। আমি জানতাম ছাত্র হিসেবে জাহাঙ্গীর ভাইকে হারুণ স্যার খুবই পছন্দ করতেন। জাহাঙ্গীর ভাইও তাঁর এই শিক্ষকের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। সেদিন আমি জাহাঙ্গীর ভাইকে বললাম, করোনা যেভাবে ছড়াচ্ছে, বলা তো যায় না কখন কী হয়, আমি যদি আগে চলে যাই, তিনি যেন হারুণ স্যারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি ও সহায়ক ডকুমেন্টগুলো সংগ্রহ করেন। তারপর কাউকে দিয়ে কাজটা সম্পন্ন করান এবং নিজেই বইটি প্রকাশ করেন। নজরুলের জীবনের তুলনামূলক অজানা একটি অধ্যায় নিয়ে লেখা এ বইটি যে পাঠক সমাদৃত হবে, সে ধারণা বা আশাবাদও আমি ব্যক্ত করলাম। শুনে তিনি ভীষণই আগ্রহ দেখালেন। বললেন, বাসা তো তাঁদের কাছেই, লকডাউন উঠে গেলেই তিনি স্যারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তবে এ-প্রসঙ্গে আমাদের মধ্যে কিছুক্ষণ হালকা রসিকতা বিনিময়ও হলো। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি যেহেতু বয়সে আমার সিনিয়র, কাজেই তিনিই আগে যাবেন। আমার বক্তব্য ছিল, করোনা সিনিয়র-জুনিয়র বোঝে না। তবে ষাটোর্ধদের ব্যাপারে তার নাকি একটা প্রেফারেন্স আছে, সেদিক থেকে আমরা দুজনই এগিয়ে। কিন্তু তাঁর কথাই সত্যি হলো। তিনি আমাকে ফেলে এগিয়ে গেলেন।

 

এবার ফেব্রুয়ারি বইমেলায় সুবর্ণ-এর স্টলে বসে আমাদের একদিনও সেভাবে আড্ডা দেওয়া হয়নি। আমি যেদিন গেছি মেলায়, সেদিন তিনি হয়তো যাননি। অথবা আমি যখন তাঁকে খুঁজেছি, তখন তিনি আসেননি বা চলে গেছেন (অসুস্থতার কারণে তিনি ইদানীং আর আগের মতো নিয়মিত মেলায় যেতেন না। গেলেও বেশি সময় অবস্থান করতেন না)। তারপরও কথা হয়েছিল, যেদিন ঊর্মি আপারা আসবেন তিনি খবর দেবেন। ঊর্মি আপারা মেলায় এসেছিলেন, জাহাঙ্গীর ভাই আমাকে ফোন করে খবরও দিয়েছিলেন। কিন্তু মেলার ভেতরেই অন্য কোথাও জমে যাওয়াতে আমার পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়। আমি যখন গেলাম ততক্ষণে তাঁরা চলে গেছেন। প্রতিবারই মেলা চলাকালে তাঁর স্টলে বসে চা আর বাড়ি থেকে আনা নাস্তা বা বিস্কুট খেতে খেতে বলতাম, ‘জাহাঙ্গীর ভাই তো স্টল নেন বই বিক্রি করতে নয়, আমাদের চা-নাস্তা খাওয়াতে।’ শুনে জাহাঙ্গীর ভাই হাসতেন, হাসতেন রেনু ভাবীও। কয়েক বছর ধরেই জাহাঙ্গীর ভাই বলে আসছিলেন, ‘এবারই শেষ, আর মেলায় আসবো না।’ করোনার আতঙ্ক কেটে গেলে আগামীতে আবারও নিশ্চয় বইমেলা হবে। আমরা যারা এই মহামারির সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তীরে উঠতে পারবো তাঁরা অনেকেই হয়তো আবার মেলাতে যাব। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের স্মৃতিকে ধারণ করে ‘সুবর্ণ’-ও আশা করি টিকে থাকবে। মেলাতেও তাদের স্টল থাকবে। তবে স্টলে বসে থাকা সেই প্রিয় মানুষটির মুখ আর কখনোই দেখতে পাবো না, ভেতরে গিয়ে বসার জন্য সেই পরিচিত কণ্ঠের আহ্বান আর কখনোই শুনতে পাবো না। তিনি এখন স্মৃতি, তিনি এখন কেবলই ছবি।
প্রায় সময় তিনি তাঁর প্রকাশনা থেকে বেরুনো দু-একটি বই আমাকে উপহার দিয়ে বলতেন, আমি যেন সে বই পড়ে বা দেখেশুনে কেমন হয়েছে সেটা তাঁকে জানাই। এবারও তেমনি মেলার প্রায় গোড়াতেই একটি বই ‘অপরাজেয় মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর’ তিনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। এটি ছিল জাহাঙ্গীর ভাইয়েরই বন্ধু ও কাছের মানুষদের একজন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর সম্পর্কে লেখা নানাজনের রচনা সংবলিত একটি স্মারকগ্রন্থ। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ছিলেন আমাদের আরেকজন বড়ভাই তুল্য মানুষ। আমরা ছিলাম একই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগ এবং একই আবাসিক হলেরও ছাত্র। এছাড়াও তাঁর সঙ্গে আরো নানা বিষয়ে আমার/আমাদের অজস্র স্মৃতি রয়েছে। ফলে তিনি চলে যাবার পর থেকেই তাঁকে নিয়ে লেখার একটা প্রবল তাগিদ আমি অনুভব করছিলাম। ‘সুবর্ণ’ মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের ওপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে, অথচ তাতে আমার লেখা নেই, বিষয়টিকে আমি সহজভাবে নিতে পারিনি। এ নিয়ে কিছুটা ক্ষোভও মনে হয় বইটা হাতে নিয়ে প্রকাশ করেছিলাম। অবশ্য পরে শুনে বুঝলাম, বইয়ের রচনাগুলো পারিবারিক উদ্যোগেই সংগৃহীত হয়েছিল, জাহাঙ্গীর ভাই (সুবর্ণ) কেবল বইটির মুদ্রণ বা প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপরও তিনি যেহেতু পরম যত্নে কাজটি করেছিলেন, বইটির ব্যাপারে স্বভাবতই আমার মতামত জানতে আগ্রহী ছিলেন। মেলা শেষ হওয়ার পরও কয়েকবারই তিনি এ ব্যাপারে আমাকে ফোনে তাগিদ দিয়েছেন। বইটি অনেকদিন ধরেই টেবিলে আমার চোখের সামনে পড়ে আছে, হয়তো একদিন তার পাতা ওলটানো এবং কিছু লেখা পড়াও হবে। কিন্তু জাহাঙ্গীর ভাইকে কখনোই তা জানানোর সুযোগ হবে না। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর সেদিন রাতেই তাঁর স্মৃতিচারণ করে আমি ফেসবুকে একটা লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম। শেষ করতে পারিনি। আজ তাঁরই বন্ধু আরেক জাহাঙ্গীর ভাইকে নিয়ে লিখতে হলো।

Facebook Comments