দেশের বই ঈদ সাময়িকী

জামসেদুর রহমান সজীব-এর ছোটগল্প পালিত সন্তান

সোমবার, ১৬ মে ২০২২ | ২:৫৩ অপরাহ্ণ | 70 বার

জামসেদুর রহমান সজীব-এর ছোটগল্প পালিত সন্তান

ভাষাচিত্র বুক ক্লাব আয়োজিত ‘শনিবারের গল্প’ শীর্ষক আয়োজন থেকে বাছাইকৃত গল্প নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে “দেশের বই ঈদ সাময়িকী”। আজ প্রকাশিত হলো জামসেদুর রহমান সজীব-এর ছোটগল্প পালিত সন্তান


 

টানা এক সপ্তাহ পটল ভাজি খেতে খেতে আমার জীবনটাই ভাজি ভাজি হয়ে গেছে। আজকে যখন খেতে বসে দেখলাম মা আবারও পটল ভাজি করেছেন, তখন আর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। চিৎকার জুড়ে দিলাম।

‘এইটা কোনো কথা, মা! এভাবে রোজ পটল ভাজি খেলে একদিন আমি নিজেই পটল তুলব।’

‘পটল তুললে ফেলে দিস না। বাসায় নিয়ে আসিস, ভাজি করে দেবো।’

‘তুমি কি আমার সাথে মজা করছো?’

 

‘মজা তো করছিস তুই। সারাদিন শুয়ে-বসে থাকিস। কোনো কাজকাম করিস না। তোর বাপ আর বড়ভাই হাড়-খাটুনি পরিশ্রম করে কয় টাকাই বেতন পায়? যা পাবি, তাই খাবি। এভাবে নখরা করবি না।’ মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন মা।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! এখন তো খোটা দিয়ে কত কথা বলবা। বড়ভাই ঠিকই বলে, আমাকে তোমরা কুড়িয়ে এনেছো। নিজের পেটের সন্তান হলে এত অনাদর করতে না। বড় সন্তান লক্ষ্মী আর ছোট সন্তান বান্দরবানের বান্দর! বেশ। সকল আদর যত্ন বড়জনকেই করো।’

মায়ের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। বড়ভাই জিতু একাই টেবিলে বসেছিল। তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। চুপচাপ পটল ভাজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে।

আমি নিজের রুমে ফিরে দরজা লাগিয়ে দিলাম। রাগ আর অভিমানে থরথর করে কাঁপছি। খানিক পর বাবার কণ্ঠ শুনতে পেলাম। খুব সম্ভবত মায়ের সঙ্গে আলাপ করছেন। সাতসকালে এমন হইচইয়ের কারণ শুনছেন মনে হয়।

উপরে উপরে যতই জেদ দেখাই না কেন, আমার ভেতরটা আসলে বিড়ালের মতো নরম। বেশিক্ষণ রাগ বা অভিমান করে থাকতে পারি না। খানিক আগে মায়ের সঙ্গে চিৎকার করেছি ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ডুকরে কান্না পাচ্ছে। তবে তার আগে মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আমি বিছানা ছাড়লাম। রুমের দরজা খুলতে যাব এমন সময় ওপাশ থেকে নিচুস্বরে আওয়াজ শুনতে পেলাম।

 

‘এমন অকর্মা ছেলে আমার ভাই হতে পারে না। সত্যি করে বলো তো মা, একে কোত্থেকে কুড়িয়ে এনেছো? যদি সত্যি বলো, তাহলে তোমাকে আমি দশ টাকার ঝালমুড়ি খাওয়াবো।’

নিচুস্বরে বললে কী হবে, আমি স্পষ্ট সব শুনতে পেরেছি। বুঝতে বাকি রইল না, এটা আমার বড়ভাই। মেজাজটা প্রচণ্ড খারাপ হলো। দরজা খুলতেই যাব তখন কানে এলো বাবার কণ্ঠ।

‘জুলেখা, সত্যিটা আজ বলেই দাও। আর কতদিন ধামাচাপা দেবে!’

‘সত্যিটা বলব?’ মায়ের চাপা কণ্ঠস্বর।

‘বলো বলো। আমিও তোমাকে দশ টাকার ঝালমুড়ি খাওয়াবো!’

 

‘আর ঝালমুড়ি! এই ছেলের জন্য জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেল। কুড়িয়ে পেলেও কোনো আফসোস থাকত না। অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে গিয়ে ছেলেটাকে পালতে হচ্ছে। সেদিন যদি ওই মহিলাকে ফিরিয়ে দিতাম, তাহলে আজ এইদিন দেখা লাগতো না।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাগুলো বললেন মা। এদিকে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে। মাথার উপর থেকে ছাদ সরে যাওয়ার উপক্রম। মনে হচ্ছে কানের ভেতর কেউ গরম সীসা ঢেলে দিয়েছে। এর মানে কী? তারা এসব কী বলছে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

 

‘ও মাই গড! ব্রেকিং নিউজ! তার মানে এই অকর্মা আমার আপন ভাই নয়?’ বড়ভাই প্রায় চেঁচিয়ে প্রশ্ন করলো।

‘আস্তে বল। দেওয়ালেরও কান আছে। ছেলেটা সব শুনে ফেললে তাণ্ডব শুরু হয়ে যাবে।’ জবাব দিলেন বাবা।

‘ঠিক আছে। আচ্ছা মা, সজীবের আসল মা তাহলে কে? তাকে চেনো?’

‘চিনবো না কেন! পাড়ার শেষ মাথায় একটা মুদি দোকান আছে না, সে দোকানে যে মহিলা বসে, সজীবের আসল মা তিনিই।’

‘সত্যি!’

 

‘আরে হ্যাঁ। ছেলেটা ছোট থাকতে তার বাবা হারিয়ে যায়। তার মা একদিন এসে বলে, আমার বাচ্চাটাকে আপনারা পালেন। একদম ফ্রি দিয়ে দিচ্ছি! আমার স্বামী হারিয়ে গেছে। আগামীকাল তাকে খুঁজতে বের হবো। কবে ফিরি ঠিক নাই। প্লিজ আপনারা, এই ছেলেটাকে পেলেপুষে মানুষ করেন। মহিলার আর্তনাদ শুনে আমি না করতে পারিনি। পালিত সন্তান হিসেবে ছেলেটার দায়িত্ব  নিলাম। এই ঘটনার পাঁচ বছর পর মহিলা ফিরে এলেন। স্বামীকে খুঁজে পাননি। নিজ ছেলের দায়িত্বও বুঝে নেননি।’

‘আহারে! অথচ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ছেলেটা মানুষ হলো না।’ আফসোসের সুরে বলল বড়ভাই।

‘এখন আর দুঃখ করে কী হবে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এবার তোমরা ঘুমাতে যাও। আমারও ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। সকাল সকাল উঠতে হবে। অনেক কাজ বাকি।’

 

অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার এখানেই সমাপ্তি ঘটলো। আমি দেওয়ালে পিঠ ঠেসে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশ চক্রাকারে ঘুরছে। এতবড় সত্য এতদিন চাপা পড়েছিল ভাবতেই বুকের ভেতরটা হুঁ হুঁ করে ওঠে। টুকরো হয়ে যাওয়া হৃদয়টাকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। এক ধরনের চাপা কষ্টে কলজেটা জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বিছানার এপাশ-ওপাশ করে কোনোমতে রাত পার করলাম।

 

ভোরবেলায় সবার আগে বিছানা ছেড়ে সংকল্প করলাম, এই পরিবারের জন্য যা যা করা লাগে করব। তারা আমার জন্য অনেক করেছে। অথচ আমি তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি। এই ভেবে কাজে নেমে পড়লাম। শুরুতে পুরো বাড়িঘর একেবারে পরিষ্কার-পরিপাটি করলাম। বাথরুম এমন ঝকঝকে তকতকে করলাম যে দেখে তাজমহল মনে হবে। এরপর রান্নাবান্নার কাজ সেরে সবার কাপড়চোপড় ধুয়ে দিলাম।

মা যখন ঘুম থেকে উঠলেন, এসব দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ। বড়ভাইটাও বাথরুমে ঢুকে পর মুহূর্তে বেরিয়ে এসে বলে, ‘আরে! আমাদের বাসায় এটা কাদের বাথরুম!’ কিছুক্ষণ পর বাবাও এসে যোগ হলেন।

‘বাড়িতে এসব হচ্ছেটা কী? রাতে চোর ঢুকেছিল নাকি? আমার কাপড়চোপড় কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।’

‘আঙ্কেল… না মানে, বাবা! আপনার সকল কাপড়চোপড় ধুয়ে দিয়েছি।’ কাঁপা গলায় বললাম আমি।

‘ধুয়ে দিয়েছিস মানে! মাথা ঠিক আছে তোর?’

‘আমার মাথা এতদিন ঠিক ছিল না। আজ সব পরিষ্কার। কেবল নোংরা ছিল কাপড়চোপড়, ভাবলাম সেগুলোও পরিষ্কার করে ফেলি।’

‘তাই বলে আমার আয়রন করা জামাকাপড়ও ধুতে হবে!’

‘ইয়ে মানে… খেয়াল করিনি। আবেগের বশে সব ধুয়ে দিসি।’

 

‘এখন তো তোকে ধুতে ইচ্ছে করছে! আমি অফিসে যাবো কী পরে? ড্রয়ারে কয়েকটা আন্ডারওয়্যার আর স্যান্ডোগেঞ্জি দেখলাম, ওগুলো পরে অফিসে যাবো?’

বাবার রাগ কমে না। ভয়ে আমি জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবশেষে তাকে শান্ত করলেন মা। এরপর বড়ভাইকে বাজার সদাই আনতে বললেন। এটা শুনে লাফিয়ে উঠলাম আমি। বড়ভাইকে বিশ্রাম নিতে বলে তড়িঘড়ি করে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

এই পরিবার আমার জন্য অনেক করেছে। আর না। এখন থেকে বাসার সব কাজ আমিই করব। বাজার সদাইও বাদ যাবে না।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে এলাকা ছেড়ে পাড়ার শেষ মাথায় চলে এসেছি। নাকি ইচ্ছে করেই এসেছি, বলা মুশকিল। মা গতকাল যে মুদি দোকানের কথা বলেছিল, এই মুহূর্তে ঠিক সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। অবশ হয়ে আসছে হাত-পা। তবুও সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলাম।

 

‘বাজান, কিছু লাগবো?’

দোকানে বসা মহিলাটি প্রশ্ন করলেন। ঠিক মহিলাও না। ইনি আমার জন্মদাত্রী মা। আহা! তিনি কী মিষ্টি সুরে বাজান ডাকলেন। আনন্দে আমার চোখ ভিজে আসলো। অনেক খুশি লাগছে। নিজের ছেলেকে বাজান ডেকে তিনিও হয়তো খুশি হয়েছেন।

এমন সময় পাশে আরেকজন কাস্টমার এসে দাঁড়াল। তিনি তাকেও বাজান সম্বোধন করলেন। মানে কী! পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা কি তাহলে আমার ভাই? কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। কিন্তু আমার ভাবনায় জল ঢেলে ছেলেটা বলল, ‘আধা কেজি আলু দিয়েন খালা।’

আমি চটজলদি বাজার সারলাম। নিজের আবেগ ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। কেনাকাটা শেষে টাকা বুঝিয়ে দিলে দোকানি মহিলা খুচরা টাকা ফেরত দিলেন। সঙ্গে একটা চকলেট।

‘দুই ট্যাকা খুচরা নাই বাজান। তার বদলে এই চকলেট নেও।’

 

হাত বাড়িয়ে চকলেট নেওয়ার সময় মনে মনে বললাম, ‘মা রে, মা গো! শুধু চকলেট কেন, আপনি যদি ইঁদুর মারা বিষও দিতেন, আমি চেটেপুতে খেতাম!’

খুচরা টাকা ও চকলেট বুঝে নিয়ে সেখানে আর দাঁড়ালাম না। চোখের অশ্রু আড়াল করে বাড়ির পথে হাঁটা ধরলাম।
সারাদিন উদাস মনে এটা-সেটা যে কাজ পেলাম, করলাম। মা যখন রাতের রান্না করতে গেল, আমিও জোরপূর্বক তার সঙ্গে থেকে কাজে সহযোগিতা করলাম। চোরের মতো লুকিয়ে মাকে পর্যবেক্ষণ করলাম সারাটা সময়। কিছুক্ষণ পরপর আড়চোখে তাকিয়ে তার মায়াবী চেহারাটা দেখছি। আমার চোখ ভিজে গেল। খেয়াল করলাম, তার চোখেও জল।

‘মা, তুমি কি কাঁদছো?’

‘তোর তাই মনে হয়! বললাম দুটো পেঁয়াজ কাটতে, তুই পুরো এক কেজি কেটেছিস। পেঁয়াজের ঝাঁজে চোখদুটো জ্বলেপুড়ে শেষ।’

মায়ের কথায় নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। আসলেই পুরো এক কেজি পেঁয়াজ কেটেছি। আমার ভুলের কারণে মায়ের চোখ জ্বলছে, চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। এ আমি কী করলাম! যে মানুষটি এতকাল আমাকে বিনা স্বার্থে লালন-পালন করেছে, পরিবারের ভালোবাসা দিয়েছে, তাকেই কী না কষ্ট দিলাম।

 

নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। মায়ের পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ শব্দে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। আমার কান্না শুনে বড়ভাই আর বাবা এসে উপস্থিত হলেন। তাদের সামনে বিলাপ জুড়ে দিলাম।

‘আমাকে ক্ষমা করে দেন। না বুঝে আপনাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি। তবুও আপনারা সব সহ্য করেছেন। অনেক খুঁজে দেখছি, দুনিয়ায় আমার মতো পাপী আর কেউ নাই। সম্ভব হলে মাফ করে দিয়েন। এখন থেকে আপনারা যা বলবেন, আমি তাই করব। প্রয়োজনে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রোজ তিনবেলা পটল ভাজি খাব। টু শব্দ পর্যন্ত করব না…!’

আমার বিলাপ শেষ হয় না। অথচ এর মাঝেই বড়ভাই হো হো শব্দে হাসতে থাকে। আমি মায়ের পা জড়িয়ে ধরে ভাইয়ের দিকে তাকাই। কিছুক্ষণ পর মা আর বাবাও হাসতে থাকে। একে একে আমি সবার দিকেই চোখ ফেরাই। তাদের হাসিমুখের দিকে বোকার মতো চেয়ে থাকি।

 

‘অনেক বেশি হয়ে গেছে! তবে জিতুর কথামতো গতকাল নাটক করে ভালোই ফল পেলাম। কোনোদিন কল্পনাও করিনি ছেলেটা আমার পা ধরে কান্নাকাটি করবে। হায় রে বোকা ছেলে!’ একগাল হেসে বললেন মা।

‘তুমি কি শিওর এটা আমারই ছেলে? না মানে, আমার তো বুদ্ধিজ্ঞান কম না। অথচ এটা এত বোকা হলো কী করে!’ হাসি থামিয়ে বললেন বাবা।

‘ছোটভাই, একটা পরামর্শ দেই। দরজায় আড়ি পেতে কারো কথা শুনতে নেই। তখন মিথ্যা কথাও সত্যি মনে হবে। আর এভাবে বোকা হতে হবে সবার কাছে।’

 

বড়ভাইয়ের কথাগুলো পরামর্শ কম টিটকারী বেশি মনে হলো। কী বলব ভাষা খুঁজে পেলাম না। সবার মুখে হাসি দেখে একদিকে যেমন রাগ হচ্ছে, আবার কোনো এক অদ্ভুত কারণে শান্তিও লাগছে। অন্তত এটা জানতে পেরে খুশি লাগছে, আমি পালিত সন্তান নই। বুকের উপর থেকে পাথর নেমে গেছে। এটুকুই যথেষ্ট!

Facebook Comments Box