জন্মভূমির গান

রবিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:৪৩ অপরাহ্ণ | 329 বার

জন্মভূমির গান

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১- এ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে  কবি সুশান্ত কুমার রায়-এর নতুন কবিতার বই ‘জন্মভূমির গান’। প্রকাশিতব্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে প্রকাশ করা হলো কয়েকটি কবিতা।


 

 

সার্থক জনম

সার্থক জনম মাগো আমার
জন্মেছি এই দেশে,
হয়েছি বড়- তোমার কোলে মাগো
ধূলো-কাঁদামাটি মেখে।

হাজারো মায়ার বাঁধনে
বেঁধে রেখেছো- তুমি যে মাগো,
শত জনম ধরে-
তোমার আঁচলে বাঁধা থাকি যেন- গো।

পাল তুলে হাল ধরে
গায় মাঝি গান,
কী! অপরূপ শোভা তোমার
ভরে যায় প্রাণ।

মাঠে-ঘাটে বাজে রাখালের বাঁশি
কৃষকের মুখে দেখি মধুর হাসি,
সাগরের ঢেউ আর নদীর কলতান
ফুলের হাসিতে চলে কোকিলের গান।

শরতের নীলাকাশে ছুটে চলে
সাদা মেঘের ভেলা,
বক আর পানকৌড়ির দল
নীড়ে ফিরে যে- সন্ধ্যাবেলা।

মাগো, ধন্য আমি- ধন্য মাগো
চেয়ে দেখি যতদূর,
এক জনমে মিটবে না আশা
এ যে সীমাহীন সমুদ্দূর।

কী যে বলি ? মাগো
কী করে ভুলি যে তোমায় !
মরণের পরে, তোমার চরণ তলে
দিও মাগো- ঠাঁই আমায়।

জন্মভূমি

রূপবতী সোনার দেশ আমার
কবিতা-গানে ভরপুর,
নীল আকাশ পাহাড়ী ঝর্ণা
সবুজ শ্যামল নীলিমা-প্রকৃতি অপরূপ।

পদ্ম-শাপলা শামুক-ঝিনুক
নদ-নদী হাওর বিল,
কৃষ্ণচূড়া সোনালু হিজল তমাল
শঙ্খ-শালিক আর গাংচিল।

জাম জামরুল কদবেল
আতা কাঁঠাল নারকেল,
নানা রংয়ের ফল-ফলাদির বাহারে
স্বাদে ভরে যায় মন আহা ! রে।

তাল নারিকেল সুপারি গাছে
বাবুই পাখি বাসা বাঁধে,
ঘাসের ডগায় ফড়িং নাচে
ফুটিক জলে চাতক কাঁদে।

রাখাল বন্ধু বাজায় বাঁশি
গুনগুনিয়ে ভ্রমর উড়ায়,
বটবৃক্ষের শীতল ছায়ায়
শ্রমিক মজুর প্রাণ জুড়ায়।

এইতো সোনার দেশ আমার
রূপবৈচিত্র্যে ভরপুর,
মাতৃভূমি প্রিয় দেশ আমার
জন্মভূমি প্রিয় বাংলাদেশ।

ষড়ঋতু

ষড়ঋতুর দেশ আমাদের দেশ,
রূপের যে তার নাইকো শেষ।

গ্রীষ্ম আসে-
তাপদগ্ধ প্রকৃতি নিয়ে,
বর্ষা আসে-
বারি বর্ষণে।

শরৎ আসে-
কাঁশ ফুলের নরম ছোঁয়ায়,
হেমন্ত আসে-
কৃষকের হাসি আর গানে।

শীত আসে-
হৃদয়ে কাঁপুনি দিয়ে,
বসন্ত আসে-
কোকিলের সুমধুর ডাকে।

ছয়টি ঋতু বিচিত্ররূপে আসে
আমাদেরই মাঝে এইখানে।

নবান্ন

ঈদ আসে পূজা আসে
আরও আসে মহুরম,
গাঁও গেরামে আরো চলছে
নবান্ন আয়োজন।

লক্ষ্মী পূজার ঢাক বাজে
দূর্গাপূজার পরে,
প্রকৃতি সাজে বিশ্ব মাঝে
সবুজ ধানের মাঠ ভরে ।

কার্তিক মাসে কার্তিক পূজা
মঙ্গা নাই আজ দেশে,
অঘ্রাণেতে হেমতি পাকিল
কৃষকের ধান কাটার বেশে।

নতুন ধানের মৌ মৌ গন্ধে
মন ভরে আসে,
ধানের ক্ষেতে শীষের দোলায়
বাবুই ফিঙ্গে নাচে।
হেমন্ত আসে হাসি গানে
গোলা ভরে যায় সোনালী ধানে।

প্রকৃতি সাজে বিশ্ব মাঝে
মনে পড়ে যায় সেই গান,
গোয়াল ভরা গরু গোলা ভরা ধান
পুকুর ভরা মাছ বরজ ভরা পান।

আমাদের গ্রাম

আমাদের গ্রামখানা মনে হয়
ছোট্ট একটা দ্বীপ,
এই গ্রামেতে বাস করে
হাজারো প্রদীপ।

জেলে তাঁতী কামার কুমোর
আমরা সবাই ভাই ভাই
হিন্দু-মুসলিম বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান
কোন ভেদাভেদ নাই।

মোরা সকলে আমরা
প্রত্যেকে পরের তরে
হার জিত নাহি লাজ
করবো সবাই ভালো কাজ।

এই হোক মোদের বন্দনা
সোনায় সোনায়
ভরে উঠুক-
আমাদের এই গ্রামখানা।

এদেশেই

এদেশেই-
শত নদী চলে একে বেঁকে
সবুজ ঘাস তরুলতা উঠে জেগে,
ফুল-পাখি গান গায় তরু ছায়
রাখাল মেতে ওঠে আপন খেলায়।

এদেশেই-
মেঘ গুড়গুড় ডাকে আকাশ
ঝমঝমেয়া বৃষ্টি পড়ে,
নদ-নদী, খাল-বিল
নতুন জলে যায় ভরে।

এদেশেই-
পাল তুলে হাল ধরে
গায় মাঝি গান,
কী! অপরূপ শোভা
ভরে যায় প্রাণ।

এদেশেই-
পাট কাটে পাট জাগায়
বৃষ্টিতে ভিজে চাষা,
গচি গাড়ে বলান বাড়ে
মনে অনেক আশা।

কবিতা লিখে চলি অবিরাম

কবিতা লিখে চলি অবিরাম
সে তো গান, সে তো প্রাণ।
আমার দেশ, সোনার দেশ
রূপের যে তার নাইকো শেষ।

আছে নজরুল, আছে জীবনানন্দ
আছে লালন, রবীন্দ্রনাথ কত আনন্দ।
কত আনন্দ কত আনন্দ কত আনন্দ
হা হা হা কি যে আনন্দ।

গাঙচিল আর শঙ্খ শালিকের দেশে
হয়তোবা আবার আসতেও পারি কোন বেশে
ভালোবেসে কিংবা প্রাণের টানে আশার সঞ্চারণে
ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা
নদী গিরি উপত্যকা
মাঠ ঘাট আর দক্ষিণা বাতায়নে।
কবিতা লিখে চলি অবিরাম
সে তো গান, সে তো প্রাণ।

গান কিংবা প্রাণ হোক
সে তো আমারই প্রিয় জন্মভূমি
ভালোবেসে যদি কিছু করেই থাকি
তাতেই বা দোষ কি ?
বাংলায় গান গাই বাংলায় দেখি স্বপ্ন
বাংলা মায়ের কোন তুলনা নাই।

অধিকার

আমি জন্মেছি এই বাংলায়, বাংলা আমার মায়ের ভাষা
রফিক, বরকত, শফিক, সালাম আমার ভাই
কেন বার বার নয়নের জলে ভেজে আমার দুঃখিনী মায়ের মন
আমি তো রক্তে ভিজিয়েই পেয়েছি আমার প্রিয় সেই বর্ণমালা।

হে বিধাতা, কী দোষ করেছি আমি-
আমার কি অধিকার নেই এদেশ- আমার মাটিতে ?
আমি তো জানি নিজ ভূমে বেঁচে থাকার অধিকার
আমার জন্মগত অধিকার।

আমি জন্মেছি এই বাংলায়, আমার পূর্বপুরুষের চিহ্ন
আজও শতাব্দীর পর শতাব্দী কালের স্বাক্ষ্য বহন করে চলেছে
আমি তো এসেছি সিন্ধু সভ্যতা থেকে-

মহাকালের স্বাক্ষী মহাস্থানগড়ের বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর থেকে
পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার, তিতুমীর, হাজী শরীয়ত উল্লাহ
সোনা মসজিদ আমার পরিচয়।

আমি বাংলায় গান গাই, বাংলা আমার ভাষা
সাঁওতাল, মারমা, মগ, মুরং, টিপরা আর
সবুজ-শ্যামল নীলিমা ও বৈচিত্র্যে ভরা আমার জন্মভূমি।
মাতৃভূমি প্রিয় সোনার দেশ আমার
জন্মভূমি প্রিয় বাংলাদেশই আমার অধিকার।

আমার দেশের ছবি আঁকি

আমার দেশের ছবি আঁকি
রঙ তুলিতে ফুল পাখি,
নদী-নালা, খাল-বিল
ময়না টিয়া গাঙচিল।

পাল তুলে নৌকা চলে
বর্ষাকালে নদীর জলে,
অথৈ জলে থৈ থৈ
মাঝিমাল্লার হৈ চৈ।

শাপলা শালুক পদ্ম আঁকি
নদীর ধারে কাশবন,
নীল আকাশে মেঘের ভেলা
ভরে যায় সবার মন।

চোখে ভাসে অনেক ছবি
কোনটি ছেড়ে কোনটি আঁকি?
রঙ তুলিতে সোনার দেশ
নানা রঙে আহা! বেশ।

জাম- জামরুল-কদবেল
আতা-কাঁঠাল-নারকেল,
নানান ফলের বাহারে
রঙ তুলিতে আহা! রে।

গুনগুনিয়ে ভ্রমর আসে
ফড়িং নাচে ঘাসের কাছে,
গ্রামবাংলার দৃশ্যগুলি
তুলির টানে রাঙিয়ে তুলি।

আরও আঁকি ছোট্ট পাখি
হরেক রকম অনেক মাছ,
রুই- কাতলা, চিতল-বোয়াল
খলসে-পুটি-কালবাউস।

সোনার দেশের শত ছবি
আঁকছি আমি আঁকছি বেশ,
রঙ ফুরিয়ে যায় তবু
হয়না যে আঁকা শেষ।


দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments Box