ছোটোগল্প

চৈতি জান্নাত-এর ছোটোগল্প ‘একরাতের গল্প’

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২০ | ৬:১০ অপরাহ্ণ | 214 বার

চৈতি জান্নাত-এর ছোটোগল্প ‘একরাতের গল্প’

একরাতের গল্প
চৈতী জান্নাত

চারদিকে অন্ধকার, যেন মৃত্যুপুরী। সীমাহীন যন্ত্রণা, বাতাসে মৃত্যুর ঘ্রাণ, বুঝি নিঃশ্বাস আটকে যাবে। দু’চোখের দৃষ্টিতে অন্ধকার। জাগতিক সব অনুভূতিও হারিয়ে ফেলেছে আবির। হঠাৎ তার শরীর কেঁপে উঠল। ক্ষীণ চেতনায় শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু এ কী! সে কোথায়? দু’হাত কষে বাঁধা শক্ত কোনো কিছুর সাথে। অসাড় পা দুটোয় টনটনে ব্যথা। সেগুলোও বাঁধা শক্ত করে। এতই অবশ যেন পা নেই, কতশত বছর হাঁটেনি, কখনও হাঁটতেই পারত না। অথচ এই তো আজই সকালে দৌড়ে বাস ধরেছে অফিসে যাওয়ার জন্য। আবিরের স্মৃতি পরিষ্কার হয়ে আসছে, আজ বিকেলের আগ পর্যন্ত-সকালে অফিস, দুপুরে লাঞ্চ, বিকেলে বন্ধু সোহানের ফোন। চা খাওয়া আর কিছু সময় আড্ডা দেওয়ার জন্য অফিস থেকে বেরিয়েছিল। তারপর আর বন্ধুর কাছে যাওয়া হয়নি। পথে একদল অচেনা মুখ, সাদা মাইক্রোবাস, হঠাৎৎ জাপ্টে ধরা কিছু হিংস্র হাত। তারপর আর কিছুই মনে নেই- এরা কারা, কেনই বা ওকে এভাবে ধরে আনলো? কী চায় ওরা?

 

 

খুবই সাধারণ মানুষ আবির। বড়ো মাপের কেউ নয় তবে মিডিয়ায় কাজ করার সুবাদে অনেকেই চিনতে পারে। জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করবে? কিন্তু এত টাকা-পয়সাও তার নাই। সাধারণ মানুষ, সাধারণ জীবনযাপন। তাহলে ওদের উদ্দেশ্য কী? একনাগাড়ে ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত আবিরের মাথাটা। এবার সে চিৎৎকার করল, ‘কে আছো? কারা তোমরা? কেন আমাকে ধরে এনেছো? কী চাও আমার কাছে? ছেড়ে দাও, আর পারছি না। বাঁধন খুলে দাও। দোহাই তোমাদের, আর পারছি না। আমি হাঁটতে চাই, দেখতে চাই। এমন অন্যায় কেন করছো ?’ আবিরের খুব কান্না পেল।
হঠাৎৎ দরজা খোলার শব্দ, ‘ওই মিয়া অ্যামনে চিল্লান ক্যান? এত আরামে রাখছি তাও সহ্য হইতাছে না? মার খাওনের সাধ জাগছে? একদম চুপ থাকেন কইলাম। আর একটা শব্দ করবেন তো মাইর খাইবেন। ভদ্র ব্যবহার দিতাছি সহ্য হয় না, না!’
আবিরের স্বর নরম হয়ে এলো। তবু তো কেউ আছে এখানে, ‘দেখো ভাই, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কেন ধরে এনেছো। কার নির্দেশে? অন্তত চোখের বাঁধনটা খুলে দাও! অনেকক্ষণ এভাবে আছি। খুব কষ্ট হচ্ছে। আর কিছু সময় থাকলে মরে যাব। আমাকে আটকে রাখো, শুধু বাঁধন খুলে দাও।’
‘এত বুঝনের কাম নাই! ওই মিয়া, চুপ থাকতে কইছি না।’ কর্কশ কণ্ঠের পুনরাবৃত্তি।
আবিরের গালে সজোরে একটা থাপ্পড় পড়ে, ‘কিছুই করবার পারমু না, ঠিক আছে? চুপ কইরা বইসা থাক।’ কণ্ঠটা ভিন্ন, ‍দ্বিতীয় কোন জনের। আরও বেশি রুক্ষ স্বর।
পাশ থেকে আরেকটা ভিন্ন কণ্ঠ, ‘ওই বেটা মারোস ক্যান? মেডাম না কইছে গায়ে হাত দেওন যাইবো না।’
‘তো? কী করতাম? খালি চিল্লানি দেয়।’
আরেকটা অন্যরকম কণ্ঠ, ‘আরে চিল্লান দিলে দেক না! বৃষ্টি বাদলের রাইত। কেউ হুনবো না। রাইত মেলা হইছে, মেডাম আওনের সময় হইছে।’
‘আমার কিন্তুক মনে হয় না মেডাম আর রাইতে আইবো, দেখতাছোস না ক্যামনে বৃষ্টি হইতাছে। ঘুটঘুইটা আন্ধার, তার উপ্রে রাস্তাঘাট পানিতে বেবাক ডুইবা গ্যাছে গা। ক্যামনে আইবো? ভাবতাছি।’ কণ্ঠটা একটু আলাদা শোনালো।

 

‘অত ভাবোনের কাম কী? টাইম বেশি তো ট্যাকাও বেশি। চিন্তা কিয়ের?’
‘হ মজনু ঠিক কইছস। তয় মেডামে এত রাইতে বৃষ্টি দিয়া কেমনে আইবো তাই ভাবতাছি।’
‘আইবো আইবো, গরজ থাকলে ঠিক ব্যবস্থা কইরা চইলা আইবো।’ তৃতীয় কণ্ঠস্বর বলে।
আবির বুঝতে পারে, এখানে একজন নয়, বেশ কয়েকজন আছে। কথোপকথনের সূত্র ধরে আবিরের ভাবনাটাও জটিল থেকে জটিলের দিকে আগায়।
কিন্তু মেডাম টা কে? কার কথা বলছে ওরা? কে সে? কোন মহিলার সাথে তো কখনও কোনো অন্যায় সে করেনি যার জন্য তাকে অপহরণ করা হবে। নিশ্চয়ই ওরা ভুল করে তাকে তুলে এনেছে। আবির আরও একবার নরম কণ্ঠে বলে, ‘দেখো ভাই তোমাদের কোথাও ভুল হয়েছে। হয়তো ভুল করে আমাকে তুলে এনেছো। আমার কারও সাথে কোনো শত্রুতা নাই। একটু ভালো করে ভেবে দেখ ভাই, নিশ্চয়ই ভুল করে আনছো। আর কোনো মেডামের কথা বলছো, আমি তো এমন কাউকে চিনি না, যার সাথে আমার শত্রুতা।’
কানের খুব কাছে এসে কেউ একজন চেঁচায়, ‘এইবার কইলাম মুখের ভিত্তরে গোজলা দেব, যাতে কোনো কথা বের না হয়!’
আবির আরও নরম হয়ে বলে, ‘ভাই গলাটা শুকিয়ে গেছে, একটু পানি দেবে?’
‘না না, পানি দেওন যাইতো না, পানি খাইয়া আরো বেশি পটর পটর করেন আর কি! আর একটাও কথা কইছেন তো দিমু মাথায় এক বাড়ি। মরার আগেই যম্মের মরা মরতে হইবো।’ তিনজনের কেউ একজন বলে।
আবির এবার চুপ হয়ে গেল। শারীরিক সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে মৃত্যুচিন্তা তাকে আঁকড়ে ধরলো। আজই হয়তো তার শেষ রাত। পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে চলে যেতে হবে। মরতে তো একদিন হবেই, তাই বলে এমনিভাবে? কী কারণে, কী অপরাধে? নিশ্চয়ই এতক্ষণে মিডিয়াতে তার অপহরণের খবর চলে গেছে, ভাবে আবির। মা হয়তো ফোনে অসংখ্যবার ফোন করেছে। অস্থির হয়ে উঠেছে। কে জানে তিনি সুস্থ আছেন কিনা? সিম্পল একটা লাইফ, সেখানে মা-ই সব তার। আবির মনে মনে প্রার্থনা করে- আল্লাহ তুমি আমার মাকে সুস্থ রেখো সব সময়। মা মাগো…।’
ফিসফিস করে কেউ একজন বলে, ‘বাইরে গাড়ির শব্দ। মনে হয় মেডাম আইছে। চল দেখি গিয়া।’
আবির প্রার্থনা শেষ না করে কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করে রুমের পরিবেশ। হঠাৎ করেই ঘরটা আবার মৃত্যুর মতো নীরব, অন্ধকারের সাথে একাত্ম। শুধু মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক করে আবিরের-কে এই মেডাম? কে?
দরজা খোলার শব্দ হলো খুব ধীরে, নিঃশব্দ পায়ে কেউ আসছে। ক্রমশ নিঃশ্বাসের শব্দও এগিয়ে আসছে। মিষ্টি একটা পারফিউমের গন্ধ, স্পষ্ট ঘ্রাণ। ঘরময় আবিরের কাতরানোর শব্দ। হঠাৎ একটা আওয়াজ, সম্ভবত থাপ্পড়ের, মৃদু শব্দের কিছু কথোপকথন, ‘মারেন ক্যান মেডাম? আপনি যেভাবে কইছেন সেভাবেই তো ওনারে রাখছি।’
মেয়েলি গলা শোনা যায়, ‘আমি বলেছিলাম বাঁধন যেন শক্ত না হয়। বলেছিলাম আমি না আসা পর্যন্ত যেন অজ্ঞান থাকে আর কোথাও বেঁধে নয়, বিছানায় অজ্ঞান অবস্থায় শুইয়ে রাখতে। তো কোন কথাটা এখানে রাখা হইছে?’

প্রথমজন বলে, ‘উনার ওপরে ওসুদে কাম করছে কম, তাড়াতাড়ি সজাগ হইছে, তাই চেয়ারের লগে শক্ত কইরা বাঁনছি।’
দ্বিতীয়জন বলে, ‘মেডাম এত খাতিরের কী আছে? যারে কিডনাফ করেছেন তারে আদরে রাখনের লায়?’
আবারও থাপ্পড়ের শব্দ, ‘একদম চুপ, এক টাকাও কম নাও নাই, আমার শর্তে রাজি হয়েই কাজটা করেছো। এখন সব শর্ত ফিনিস? একটাও ঠিক নাই, কি মজার ব্যাপার নাহ? এই যে ছয় সাত ঘণ্টা উনি এভাবে কষ্ট পাচ্ছেন তার কী হবে? ঘরময় কাতরানির শব্দ। কতটা ব্যথায়, কষ্টে এমন হয় বোঝো তোমরা?’
কিডন্যাপারদের একজন বলে, ‘জি মেডাম, আমি বুজিনে তয় মজনু বোজে, আমগো অপোজিট গ্রুপ ওরে একবার ধইরা নিয়া পিটাইছিল।
‘ওই চুপ থাক, দাঁতগুলান ফালাইয়া দিমু কইলাম!’ যে জবাব দেয় সম্ভবত তার নাম মজনু।
‘মেডাম লাইফে এই পেত্তম হুনলাম, কিডনাফ কইরা তারে মেহমানের লাহান খাতির কত্তে ওইবো।’ মজনুকে নিয়ে মজা করে লোকটি বলে।
‘চুপ কর। এখন যাও তাড়াতাড়ি হাত পায়ের বাঁধন খুলে দাও।’ ম্যাডামের নির্দেশ।
আবিরের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে গেল। যেন একটু বাঁচলো। তার কাছ ঘেঁষে একটা নিঃশ্বাস, লম্বা হয়ে ওঠে আর নামে। কেউ খুব কাছ থেকে তাকে দেখছে, হাত বাড়ালেই ধরা যাবে। যেন বুকের কাছে। উঠে দাঁড়াল আবির, কারো কোমল হাত তাকে স্পর্শ করল, সাথে সাথে আবির চমকে উঠল, ‘কে? কে আপনি, কেন আমাকে ধরে এনেছেন?’
চোখের বাঁধন খুলে ফেলতে উদ্যত হলো আবির। কিন্তু তার হাত চোখের কাছে না পৌঁছাতেই অন্যদের হাত আটকিয়ে দিলো, ‘ছাড়ো, ছাড়ো আমাকে, আমার চোখের বাঁধন খুলে দাও। কারা তোমরা?’
দু-হাত ধরে আবিরকে সারা ঘর হাঁটানো হলো। তারপর বসানো হলো আবার সেই চেয়ারে।
কেউ একজন আবিরকে যত্ন করার চেষ্টা করছে। একটা হাত- কোমল, খানিকটা মমতার, খানিকটা অন্যরকম। কখনও কপালে, কখনও গলায়, কখনও চোয়ালে-চুলে স্পষ্টত একটা স্পর্শ অনুভূত হয় আবিরের। পাতলা কিছু দিয়ে পরম মমতায় মুছিয়ে দিচ্ছে সমস্ত শরীর। অদৃশ্য মায়ার ছোঁয়া। মুহূর্তে সে ঘোরে আচ্ছন্ন হয়। কিছুক্ষণ পর আবার চিৎৎকার করে, ‘কে আপনি? আপনাকে দেখবো, কেন আনছেন আমাকে? কীসের শত্রুতা আপনার সাথে? আমার চোখ খোলেন আমি দেখতে চাই।’
একজন আবিরের চোখ খুলে দেয়। চোখ খুলে আবির তাৎক্ষণিক তাকাতে পারে না। একটু আলো চোখের কোনে যেতেই প্রচণ্ড জ্বালা হয়। তবুও অনেক চেষ্টা করে সবকিছু দেখার।
কিন্তু পারে না, অন্ধের মত হাতড়াতে থাকে চারপাশ। হঠাৎ আবছায় দেখতে পায় পানির জগ। সাথে সাথে তুলে চোখে পানির ছিটা দেয়, কিছুটা পানি খায়।
ঘরের চারপাশটা একবার দেখে নেয় আবির। অমসৃণ দেয়াল আর অপরিষ্কার ফ্লোর দেখে আবিরের বুঝতে বাকি রইল না যে এটা কন্স্ট্রাকশনের কাজ চলছে এমন কোনো বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাট।
আবিরের থেকে বেশ দূরত্বে একটা নারী মূর্তি ঠাঁই দাঁড়িয়ে। লাল বর্ণের শাড়ি, তার ওপর পাতলা শাল জাতীয় কিছুতে শরীরের উপরাংশ মাথাসহ ঢাকা। দূর থেকেও পরিহিত পোশাক থেকে চকচকে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। মিষ্টি সুবাসে ঘরের জরাজীর্ণ অপরিচ্ছন্ন ভাব যেন চলে যাচ্ছে।

আবির আবার মুখ খোলে, ‘এই যে, শুনছেন? আপনি সামনে আসুন, আপনার সাথে কথা বলতে চাই। এভাবে চুপ করে আছেন কেন? আপনি কি জানেন কত বড়ো অপরাধ করছেন? এর শাস্তি কত ভয়াবহ? প্রশাসন, মিডিয়া কেউ আপনাকে ছাড়বে না! আপনার ভাবা উচিত ছিল, কার সাথে কী করতে যাচ্ছেন? যা হোক, এখন আমাকে ফিরে যেতে দিন, বাকি সব আমি দেখবো। আপনি কথা বলছেন না কেন?’
আবিরের এবার খুব রাগ হয়। মহিলার কাছে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে উচ্চস্বরে বলে, ‘আমার দিকে তাকান? এই যে, আপনি শুনছেন আমার কথা, শুনতে পাচ্ছেন?’ রাগে অস্থির হয়ে মেয়েটার গায়ে হাত দিয়ে নিজের দিকে ফেরায়। এক ঝটকায় ঘোমটা সরাতেই ভূত দেখার মত চমকে ওঠে, কয়েক হাত দূরে সরে যায়, শরীর কাঁপতে থাকে, কোনো মতে চেয়ারের হাঁতল ধরে বসে পড়ে।
আবিরের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে এক পুরাতন চেনা মুখ। কিছুটা প্রিয় ছিল বৈকি। এক শান্ত স্নিগ্ধ মায়াময় প্রতিমা, গভীর দৃষ্টি। চেহারায় বোকা বোকা ভাব, আবিরের দেখা পৃথিবীর সব চেয়ে লক্ষ্মী মেয়েটা। সেই মেয়েটির দ্বারাই সে আজ অপহৃত! এতটা মানসিক শারীরিক কষ্ট সে কীভাবে দিতে পারলো? তাদের মধ্যে তো কোনো শত্রুতার সম্পর্ক নেই, খুব বেশি মিত্রতারও না! তবে? এমনটা কেন করল?
কিছুক্ষণের জন্য সমস্ত ঘর সুনসান। কারও মুখে কোনো কথা নেই, আবির যেন রাগে-দুঃখে, ক্ষোভে সব ভাষা ভুলে গেছে। তার ইচ্ছে হচ্ছে সামনের মানুষটাকে নিমেষেই শেষ করে দিতে। কিন্তু কোনোভাবেই পারে না। না কিছু বলতে, না কিছু করতে। সামনে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি ওর দিকে এগিয়ে আসে নিঃশব্দে। তাই দেখে আবির ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে।
নীরবতা ভেঙে আবিরের কাছে এসে মেয়েটি বলে, ‘আমাকে চিনেছো তাহলে?
তোমার জীবনে আমাকে আরেকটু পরিচিত করে রাখতেই এই আয়োজন। আবিরের চিবুকে হাত দিয়ে বলে, ‘আমার দিকে একটু তাকাও, দেখো না কেমন সেজেছি। একেবারে বিয়ের সাজ।’
জরির পাড়ে লাল শাড়ি, ষাটের দশকের সেই কারুকাজের ব্লাউজ, কপালে মাঝারি টিপ, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা রঙ, হাতে একগোছা রংবেরংয়ের চুড়ি-সবই তোমার মনের মতো। একবার চেয়ে দেখো! কোনো এক কথার ছলে একবার বলেছিলে, বিয়ের সাজে আমাকে অনেক সুন্দর লাগবে। শুধু সাজ দেখার জন্যই আসতে চেয়েছিলে আমার বিয়েতে। তোমার সে সাধ আমি কেমন করে অপূর্ণ রাখি বলো? এই দেখো চোখ ভিজে আসে! আজ চোখে জল আনবো না প্রিয়। আজকের এ রাত আমার জীবনের সেরা রাত, পরম পাওয়া। কোনোদিন তোমাকে এত কাছ থেকে দেখেছি? দু’হাত ভরে তোমাকে পেয়েছি? এই যে তোমার প্রশস্ত বুক, যেখানে রাজ্য উদ্ধারের উদারতা, সেখানে আমার জন্য এতটুকু উদারতা ছিল না, এইখানে আমারও একটা নীড় চাই আবির, ছোট্ট একটা নীড়।’
আবিরের বুকের ওপরে হাত রাখে সেই নারী। আবির আর ধৈর্য রাখতে পারে না, রাগে ক্ষোভে।
সজোরে দু’হাতের ধাক্কায় দূরে ফেলে দেয়। সাথে সাথে মেয়েটি কিছু একটায় ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ডানবাহুর উপরের অংশে কেটে রক্ত বের হয়।
বাইরে থেকে আওয়াজ আসে, ‘মেডাম কোনো সমস্যা? দরজা খোলেন, কীসের শব্দ হলো?’
কোনোমতে মাথা তোলে মেয়েটি, কাটা স্থান চেপে ধরে, ‘না কোনো সমস্যা নেই।’

যন্ত্রণায় ছটফট করে মেয়েটি, ‘এ তুমি কী করলে আবির? আজকের এই রাতে কোনো রক্ত চাইনি। এ কেমন অনাসৃষ্টি তোমার? উহ্! এমনটা করে কেউ? ওহ! শোধ করছো বুঝি? তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি, তারই বরাবর করলে?’ দু’চোখে অশ্রুর জল, ঠোঁটের কোণে হাসি মেয়েটির, ‘তা বেশ করেছো, আমার মতো হতভাগীর এই তো প্রাপ্য!’
আবিরের ভাবাবেগে কোনো পরিবর্তন হলো না, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়েই থাকে। যন্ত্রণার কাতরানিতে ঘরের নীরবতা উবে যায়। থেমে থেমে মেয়েটি বলেই চলে, ‘আবির এতটা নিষ্ঠুরতার চিহ্ন না রাখলেও পারতে। তোমার অনুগ্রহ পাব না, সে বেশ জানতাম! তাই বলে এমনি করে রক্তাক্ত করবে ভাবিনি! সমস্ত সাজ যে নষ্ট হয়ে গেল! সবই যে তোমার জন্যে ছিল।’
আবির মুখ ফিরিয়েই জবাব দেয়, ‘কী আশা করেছিলে তুমি? তোমার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে আমি অভিভূত হয়ে নেশায় ডুবে যাব? তোমাকে নিয়ে উন্মত্ত রাত কাটাবো? এতদিন ধরে আবিরকে চেনো অথচ সঠিক করে আজও চিন্তে পারোনি! আমি কখনও কোনো অন্যায়ের সাথে আপোস করে চলি না। তুমি যা করেছো তা ক্ষমার অযোগ্য। তোমার দিকে কোনোদিন ভালো চোখে দেখা তো দূরের কথা তাকাবোই না। তোমার সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা আমি করবো।’
‘তা তুমি করতে পারো। কেনই বা করবে না! যা খুশি কর শুধু আজকে রাতের কিছু সময় আমার জন্যে দাও, এই যে আঁচল পেতেছি তোমার পায়ে, দেখো এখনও রক্ত ঝরছে, তাতে আমার কোনো কষ্ট নেই, কোনো যন্ত্রণা নেই, কিন্তু বুকের মাঝে যে আগুন বারোটা বছর ধরে জ্বলছে, তা নেভাও।’
আবিরের খারাপ লাগছে। ক্ষতস্থানে তখনও রক্ত ঝরছে, ওদিকে তাকাতেই চোখের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে অজানা ব্যথা। নিজের অজান্তেই মনের ভেতর দরদী কথার ঢেউ তেড়ে আসে, ‘ইস্! কতটা কেটেছে! এমন পাগলের মতো কাজ কেন করলে বিভা?
কেন করলে, এক জীবনে কি সব পেতে হবে? কেন তোমার জেদ বাড়তে দিলে? বিভাবতী?’ নিজের মনে কথাগুলো বলে চলে আবির।
মেয়েটির নাম বিভা, বিভাবতী রায়চৌধুরী। শহরের হিন্দু সমাজের নামকরা এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর একমাত্র সন্তান। আবির আর বিভা একই ক্লাসে পড়ত, আজ থেকে বার বছর আগে ওদের পরিচয়। আবিরের কাছে বিভা ছিল আর পাঁচটা বন্ধুর মতোই। কিন্তু বিভার কাছে আবির সবটুকু জুড়ে থাকা স্বপ্নের পুরুষ। একটু একটু করে আলো, বায়ু আর পানিতে যেমন অঙ্কুরিত চারাগাছ বেড়ে ওঠে তেমনি বিভার ভেতর বেড়ে ওঠে আবিরের প্রতি ভালোবাসা। আবির ছিল এক হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত ছেলে। সবার সাথে সমানভাবে মেশা, কারও প্রয়োজনে ছুটে যাওয়া, বন্ধু বান্ধবীদের মন খারাপের মুহূর্তে জোঁকস বলা, কোনও কারণ ছাড়াই প্রশংসা করা এসবই ছিল আবিরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বিভার মত হয়তো অনেকেই তার প্রেমে পড়তে পারে, কিন্তু আবির তেমন কাউকে পাত্তা দিত না।
বিভা ছিল অন্য এক জগতের মানুষ, নিজের গড়া স্বপ্নের সমুদ্রে একাই ভাসতো।

আবিরের একটুখানি প্রশংসায়, একটুখানি ভালোলাগার কথায়, প্রয়োজনে সহযোগিতায় ইত্যাদি বিষয়গুলোতে বিভার মনে একটার পর একটা ঢেউ উঠতো, সেই সমুদ্রে ভালোবাসার জাহাজ ভাসাতো। মনের ভেতর বোনা এক একটা বীজ অঙ্কুরিত হতো, ডালপালা মেলতো, বিভার স্বপ্ন এভাবেই বেড়ে উঠে এক মস্ত বৃক্ষে পরিণত হয়। আবিরের যে বিভাকে ভালো লাগতো না, তা নয়। বিভার থেমে থেমে কথা বলা, বোকা বোকা ভাব, শান্ত চোখ, ধীরস্থির চলন, পিঠের ওপর পড়ে থাকা সাপের মত লম্বা বেনী সবই ভালো লাগতো। খোলা চুলের বিভা যেন সাক্ষাত অপ্সরা।
সবই ঠিক ছিল শুধু বাধ সাধে তাদের ধর্ম। অজানা থেকে যায় একে অপরের মনের কথা।
পারিবারিক সম্মানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আবিরকে একটু একটু করে বিভার থেকে দূরে নিয়ে আসে। আবির বুঝেও না বোঝায় থেকে যায়। বিভার ভালোবাসা এক সময় খাবি খেতে থাকে আবিরের অবহেলায়। বিত্তশালী পিতার সব কিছু তুচ্ছ করে আবিরের কাছে জোড়হাতে আশ্রয় ভিক্ষা চেয়েছিল। কিন্তু আবির বিভাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। সেই ফেরা একবার না, বহুবার।
সেই অপমান, সেই জ্বালা সেই যন্ত্রণা একটু একটু করে বিভাকে আজ এইখানে এনেছে।
মনের কথাগুলো আবির মুখে বলতে পারে না। কিছুটা রাগের স্বরেই বলে, ‘বিভা? আমাকে এখানে কেন এনেছো? মেরে ফেলার জন্য? তবে তাই কর, প্রতিশোধ নেওয়াই যদি তোমার উদ্দেশ্য হয় তবে দেরি করছো কেন? তোমার লোকদের বলো, আমাকে মেরে ফেলুক।
বাঁচিয়ে রাখলে তোমার জীবনে সকাল হবে দূর্বিসহ।’
বিভা ক্ষতের ওপর হাত রেখে বলে, ‘তুমি জানো? কাল আমার বিয়ে। এর থেকে দুর্বিসহ আর কী হতে পারে!
আবির অবাক হয়, ‘কী বলছো এসব?’
‘আশির্বাদ হয়ে গেছে। কাল বিয়ে। বাবাকে অনেক অনেকভাবে বুঝিয়েছি, শুনলো না। যার সাথে বিয়ে হচ্ছে যদি ভালো হতো তাহলেও নাহয় কিছুটা শান্তি পেতাম।
বাবাকে বললাম এই বিয়ে দিও না। এমন ছেলেকে কিভাবে মেনে নেবো? যার ভিতরে রাক্ষুসে লোভ। বাবা শুনলো না! বাবার আচরণে বড্ড অসহায় লাগছিল! বাবা কী না করে একমাত্র মেয়ের সুখের জন্য, শুধু তার মন জানল না! এই তো আর কয়েক ঘণ্টা পর শাঁখা সিঁদুরে আজীবনের জন্য বন্দী।’ বিভার কান্নায় ঘরের ভেতরটা ভারি হয়ে ওঠে।
‘বিভা, কাল তোমার বিয়ে, বাড়ি ফিরে যাও। মাঝরাত, কেউ জানবে না তোমার কথা, কাউকে জানতে দেবো না।’ আবিরের পা তার অজান্তেই চলতে শুরু করে। কাছে গিয়ে ভেতরটা যেন দুমড়ে যায়। ‘ইস্! এতটা কেটেছে? দেখি, ওঠো, এদিকে এসো।’

দু’হাতে আগলে বিভাকে চেয়ারে বসায়। আবিরের ভীষণরকম কষ্ট হয়। সে অনুশোচনা করে মনে মনে, ‘এভাবে ধাক্কা না দিলেও পারতাম, এখন কী করবো? রক্ত যে বন্ধ হয় না!
বিভার একটা হাত ধরে আবির বলে, ‘চলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। খুব বাজেভাবে কেটেছে। চিকিৎসার দরকার। তুমি অনেক কষ্ট পাচ্ছো, ওঠো।’
‘না, না আবির, আমার কোন কষ্ট হচ্ছে না। এ তো আমার শ্রেষ্ঠ উপহার। সাতজন্মের তপস্যার ফল। এ ক্ষত আমি কোনোদিন শুকাতে দেবো না। এই ক্ষতের সাথেই আমার মৃত্যু হবে, দেখে নিও।’
‘চুপ কর। এসব বলে, ভেবে কী পাও তুমি? বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা কর। আমি নিরুপায়।
তোমার মতো বিলাসী জীবন আমার কোনোদিন ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না। আমার মা অসুস্থ বিভা। যেকোন সময় এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে পারে। অসুস্থ মাকে কেমন করে কষ্ট দিই! কখনও কোনদিন আমি তোমাকে সেই চোখে দেখিনি। তোমাকে বিয়ে করবো, সংসার করবো এসব ব্যাপারে কখনই ভাবিনি তোমাকে নিয়ে। বহুবার, বহুবার বুঝিয়েছি, তুমি এত অবুঝ কেন বিভা? এই একই জিদে কেন নিজের সুন্দর জীবন শেষ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছো?
বাড়ি ফিরে যাও, বিয়ে কর, দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে। আনন্দে থাকো, তোমার চারপাশের মানুষগুলোকে আনন্দে রাখো। সুখী হও। খুব সুখী হও।’
বিভার আহত হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আবির একটানা বলে চলে, ‘তোমার এই হাতে কত মহৎ কাজ হতে পারে, চোখের চাহনিতে কত মুখে হাসি ফুটবে। তোমার মহৎ হৃদয়ের ছোঁয়ায় কত জীবন বেঁচে যাবে। কোলজুড়ে বাচ্চাদের মুখরিত হাসি। তাদের আদর্শ মা হবে তুমি, স্বামীর সুশীল লক্ষ্মী স্ত্রী হবে। তুমি এক সম্ভাবনাময় জীবন। শুধু এই একটা না পাওয়াকে আঁকড়ে হতাশায় ডুবে থেকো না। আমরা কেউই পরিপূর্ণ না। আমাদের জীবন অপূর্ণতায় ভরা। এক জীবনে সব পাওয়া যায় না বিভাবতী।’
আবিরকে থামিয়ে বিভা বলে, ‘বিভাবতী..! আরো একবার ডাকো না! এমন করে কেউ ডাকতে পারে না। তোমার মতো সুন্দর করে কেউ আমাকে বিভাবতী বলে ডাকে না আবির। আরও আরও হাজার বার ডাকো, তুমি জানো না, কী সুখ এই ডাকে! এমন করে ডেকে ডেকে আজ আমার ইন্দ্রীয় সারাজনমের তরে বধির করে দাও। যেন আর কোনোদিন কোনো শব্দ আমি শুনতে না পাই।
‘বিভাবতী!’

বিভার চোখের জল আবিরকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সব বাধ ভেঙে তার চোখের জল ভিজিয়ে দেয় বিভার হাতদুটো, ‘বিভাবতী, আমাকে ক্ষমা কর, আমি আজীবন তোমায় কাঁদিয়ে গেলাম। তোমার মনোকষ্টের কারণ হলাম। এ কী যন্ত্রণা…! তোমাকে কেমন করে বোঝাবো?
না পেরেছি তোমাকে বুকে বাঁধতে না পেরেছি চিরতরে ছুঁড়ে ফেলতে। বিভা, বিভাবতী আমায় এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও।’ বিভার হাতদুটো ঠোঁটে ছুঁইয়ে আদর করে আমি, ‘আমি আর পারছি না বিভাবতী।’
বিভা হাত সরিয়ে নেয়, চোখের জল আঁচলে মোছে, ‘দেবো তো, দেবো আবির, মুক্তি দেবো।’
জীবনে এই মুখ আর তোমায় দেখাব না বলেই আজ শেষ দেখা দেখতে এলাম। শেষ যন্ত্রণা দিতে। নিজের পুষে রাখা সাধ মেটাতে এলাম। আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না।
ভেবো না যে এ কথার খেলাপ বহুবার করেছি বলে আজও করবো। না আর কোনোদিন কথার খেলাপ হবে না। এই তোমায় ছুঁয়ে কথা দিলাম।’
আবির অপলক চেয়ে থাকে বিভার দিকে যেন স্বর্গের পবিত্র কোনো দেবী। এক নারীর মাঝে বিধাতা এত রূপ কীভাবে দিলো!
‘দেখি সরো তো।’ বিভা উঠে গিয়ে একটা বড়ো ব্যাগে হাত দেয়।
আবির প্রশ্ন করে, ‘কী কর?
‘এই যে এখানটায় আসন পেতেছি। বসে পড়ো তো লক্ষ্মী ছেলের মতো।’
‘কেন?’
‘আহা, বসো তো, দেরি কর না, বসো, রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো।’
আবির যেন আজ এই দেবীর আজ্ঞাবহ। কিছু না বলে বিভার দিকে তাকিয়েই থাকে, লক্ষ্মী ছেলের মত বিভার পাতা আসনে বসে পড়ে। তারপর দেবীর আয়োজন দেখে অবাক হয়ে যায়। আসনের চরপাশে এক এক করে সাজিয়ে রাখে আবিরের পছন্দের খাবারগুলো।
‘এসব কী বিভা?’ আবির বিস্ময়ের সাথে জানতে চায়।
বিভা হাসে মৃদু মৃদু, ‘এই তো আমার খায়েশ। জানো কতশত দিন আগে আমার মনের কোনে লুকানো এই লালিত স্বপ্ন। তোমার পছন্দের খাবারগুলো নিজ হাতে রান্না করে, আসন পেতে খুব যত্নে খাওয়াবো। তোমার সামনে বসে দু’চোখ ভরে দেখবো। তুমি তৃপ্তি নিয়ে খাবে, আমি দেখবো।
যেন আমি তোমার রাজলক্ষ্মী তুমি আমার শ্রীকান্ত, আমি তোমার বন্যা, তুমি আমার অমিত। আরও কত কী যে আমরা!’
ক্ষণিকের জন্য বিভা যেন অন্য কোথাও হারিয়ে যায়। হঠাৎ ফিরে আসে বর্তমানে, ‘সে কি তুমি তো ওমনি বসে রইলে! এই নাও জল। শুরু কর, তোমার অনেক খিদে পেয়েছে, নাও খেয়ে নাও।’
আবির যেন নিশ্চুপ মূর্তি। কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না! এক স্বর্গের দেবী তার মমতার সবটুকু ঢেলে সাজিয়েছে এই দৃশ্যপট। কী করে এই আহবান পায়ে ঠেলে চলে যাবে সে?
হৃদয়ের সবকটা দুয়ারেই যে সেই ভালোবাসার করাঘাত।

আবির বিভার হাত ধরে বলে, ‘আমাকে তুমি খাইয়ে দাও।’
বিভা যেন কানে ভুল শুনলো, ফিরে আবার জানতে চায়, ‘কী বলছো আবির! আমার হাতে খাবে তুমি?’ তার চোখের জল গাল গড়িয়ে গলায় মিলায়।
‘হ্যাঁ তোমার হাতেই খাব। দেবীর হাতের এমন বর আর কি পাব এ জীবনে?’ বিভার হাতের দিকে মুখ বাড়ায়, ‘দাও।’
‘তুমিই আমার দেবতা। তোমার তরেই সাজানো এই আরতিথালা। তোমার পূজোতে আজ কোনো কার্পণ্য নয়। এ যে আমার শত জনমের সাধ। আজ রাতের এই বৃষ্টিঝরা শ্রাবণে তোমার দেওয়া এতদিনের সব যন্ত্রণা ধুয়ে গেছে আবির। যতটুকু সহমর্মিতা আমাকে দেখিয়েছো, তাতে এ জীবন ধন্য। আর কিছুই চাই না। ‘
বিভার হাত কাঁপতে থাকে, হাত যেন আবিরের মুখে পৌঁছায় না। আবির বিভার হাতটা আলতো করে ধরে নিজ মুখে নেয়। আবির খেতে থাকে, কী খাচ্ছে সে নিজেও জানে না। সব স্বাদ যেন মিশে গেছে বিভার ভেজা চোখের গভীরে। একভাবে চেয়ে থাকে তার চোখে। মাঝে মাঝে নিজের চোখের জল মোছে আবার কখনও বিভার, তারপর আবার তাকিয়ে থাকে। খাওয়া শেষ হলে আবির বলে, বিভাবতী?
‘হুম।’
‘হাতটা দাও।’
বিভা হাত এগিয়ে দেয়। আবির ক্ষতটার ওপর হাত বুলায়, ‘ইস্, এতটা আঘাত দিলাম, নিজেকে কখনও মাফ করতে পারবো না।’
আবির নিজের শার্ট খোলে। ভেতরে সাদা গেঞ্জিটা খুলে তা দিয়ে ক্ষতটা ভালোমত বেঁধে দেয়। বিভার মুখের পানে চেয়ে আবির যেন সমস্ত বেদনাটুকু, কাতরানোটুকু অনুভব করে।
যেন আবিরেরই সব। দেহটা আলাদা। তারপর কোনোকিছু না ভেবে, না বলে, না বুঝে বিভাকে বুকে টেনে নেয়। বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। বিভার কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলতে থাকে, ‘আমরা আর আলাদা হবো না বিভা। পৃথিবীর যেখানেই যা খুশি ঘটুক।
আমরা একসাথে বাঁচবো।’
বিভা নিজেকে সজোরে আবিরের হাত থেকে ছাড়িয়ে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে, না, না আবির, তা হয় না। অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
বিভাকে আবার কাছে টেনে নেয় আবির, ‘কেন হয় না, বিভা, বলো? আমি সব সামলে নেবো।’
‘না, আবির, এই কথাটা বলতে বড্ড দেরি করে ফেলেছো। বড্ড দেরি, এখন এই দেরির মাশুল যে তোমাকে দিতেই হবে! আমাদের জীবন এর মাশুল নিয়েই ছাড়বে, যতটা আমার ততটাই তোমার। ছাড়ো আমায়, ফিরতে হবে, রাত শেষ হয়ে এলো, চলো তোমাকে পৌঁছে দিই।’
আবিরের বাহু থেকে বিভা নিজেকে ছাড়াতে পারে না। আবিরও আরও শক্ত করে তাকে বুকে আটকে রাখে। বিভার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতেই বিভা নিজেকে সরিয়ে নেয় সজোরে।
আবির নরম স্বরে বলে, ‘কী হলো বিভা? বিভা আমার কাছে আসো। বুকে আসো, আসো বিভা।’
‘না, তুমি দূরে যাও, তুমি এমন করতে পারো না।’
‘কেন? যা বুঝিনি, তা আজ উপলব্ধি করতে পারছি। আমার তোমাকেই চাই। শুধুই তোমাকে। আমার ভালোবাসাকে জাগিয়ে তুলেছো।’
আবির বিভার হাত ধরতে যায় পূণরায়, বিভা সরিয়ে দেয়, ‘আবির তোমাকে ধরে বেঁধে অনেক কষ্ট দিয়ে এখানে এনেছি। অনেক যন্ত্রণা সয়েছো, সে কেন জানো?’
‘কেন?’
‘তোমার স্পর্শ, তোমার অন্তরঙ্গ সঙ্গ, আদর-সোহাগ এসব পাব বলে নয়। তোমায় দেখবো বলে, শেষবারের মত দেখবো বলে। তোমাকে ভালো করে দেখার কোনো সুযোগ আমায় দাওনি। যে প্রেম যে ভালোবাসা দেহের সনে, সে ভালোবাসার মরণ দেহের সাথেই হয়। চোখের সামনে দৃশ্যমান দেহখান না থাকলে ভালোবাসাও উবে যায়। আমার ভালোবাসাটা তেমন না আবির। যদি তাই হতো তবে বারটা বছর ধরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এক দেবতার আরাধনা করতে পারতাম না। আমি বার বছর সয়েছি, এবার তুমি না হয় আজীবন সও। দেখি পারো কি না, যদি আমার প্রতি ভালোবাসাটা তোমার দৃশ্যমান দেহ হয় তবে তুমি অচিরেই এই শোক ভুলে যাবে। আর যদি আমার আত্মার সাথে, আমার ভালোবাসার সাথে একাত্ম হও, তবে আমায় মনে রাখবে। শোকও সয়ে বেড়াবে, কষ্টটাকে ভালোবেসে যত্ন করে লালন করে চলবে, কাউকে বলতে পারবে না তবুও মনে মনে আমার মুখ সামনে বসিয়ে হাজারও কথার মালা গাঁথবে। যা আমি এতটা বছর করে এসেছি, সয়ে এসেছি।’
আবির যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। কী দিয়ে, কেমন করে বোঝাবে বিভাকে, খুঁজে পায় না। বুকের ভেতর অসহ্য জ্বালা, দাউদাউ করে পুড়িয়ে চলেছে। আবির তবুও বলার চেষ্টা করে, ‘বিভা শোন, এমন কর না, আমি, আমি পারবো না। একদম পারবো না। আমি তোমায় কোথাও যেতে দেবো না। আমায় ছেড়ে যেও না। এসো দুজনেই এক রাস্তায় হাঁটি, একসাথে। এমন প্রতিশোধ নিয়ো না। আমার সামনে তুমি অন্য কারও….সইতে পারবো না। আমার কথা রাখো বিভা।’

‘প্রতিশোধ! না না আবির, কী বলছো এসব? আমার মনে কখনও এমন ভাবনা আসেনি যে তোমার নিষ্ঠুর ব্যবহারের প্রতিশোধ নেবো। যে শোকে প্রতিদিন কেঁদেছি, সেই একই শোক তোমায় ছুঁয়ে যাক আমি তা চাইনে। মনে সাধ ছিল তা পূরণ হয়েছে। এবার আমার কাছে দেওয়া প্রতিজ্ঞা পালনের সময়। বাইরে দাঁড়ানো লোকরা তোমায় বাসায় পৌঁছে দেবে।
আমি এবার আসি।’
আবির মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে, বিভার পায়ের কাছে এসে বলে, ‘আমাকে মাফ কর বিভা। আমার অপমানের জবাব আমি পেয়েছি, তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না বিভা।
আমাকে একা রেখে যেও না। তোমাকেই চাই, বিভা বুঝতে পারছো? একটু বোঝার চেষ্টা কর, তোমাকে ছাড়া আমার চলবে না ‘
ততক্ষণে বিভা ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেছে। যাওয়ার সময় একবারও পিছনে না চেয়ে মনে মনে বলে যায়, ‘ আর কারো হবো না আবির, এই কষ্টের হাত থেকে তোমাকে ঠিক বাঁচিয়ে যাব।’
বাসায় ফেরার পর কিছুটা ঘুমের ভাব এসেছিল আবিরের। সকালে টিভি অন করতেই তার চোখ আটকে যায় স্ক্রলে। হৃদপিণ্ড মিস করে কয়েকটি বিট। বিশিষ্ট স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কন্যা সংক্রান্ত একটি স্ক্রিনের ডান থেকে বামে তীরের বেগে ছুটে চলেছে। ওপরে লাল ব্যানার, ‘এই মাত্র পাওয়া।’

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments