দেশের বই ঈদ সাময়িকী

গিয়াস আহমেদ-এর ছোটগল্প ‘বিশ্বাসী করতল’

বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১ | ৯:৩৬ অপরাহ্ণ | 461 বার

গিয়াস আহমেদ-এর ছোটগল্প ‘বিশ্বাসী করতল’

।। গিয়াস আহমেদ ।।


 

হ্যালো?
হাই।
কেমন আছো? কী খবর?
ভালো।
ভালো? বলছ ভালো, কিন্তু তোমার গলা খুব ভারী শোনাচ্ছে! ঠিকঠাক আছো তো!
ঠিক আছি।
তুমি আজ বড় কাটকাট কথা বলছ! কী হয়েছে বলবে?
কী আর বলব! কথা বলতে ভালো লাগে না।
কেন! কেন!
অত টেনশড হওয়ার কিছু নেই। আসলে কদিন ধরে গায়ে ব্যথা… কেমন জ্বর জ্বর ভাব… মাথা ভার…!
বলো কী! গলাব্যথা আছে? কাশি…!
সামান্য।
বলো কী! স্মেল পাও? খাবার-দাবারে টেস্ট পাচ্ছো?
হি হি হি…! ভয় পেও না। করোনা না।
তুমি শিওর হলে কী করে— করোনা না? কোভিড টেস্ট করিয়েছো?
কুল কুল…।
বিষয়টা ইগনোর করার মতো না।
তুমি কিন্তু খুব চেঁচিয়ে কথা বলছ! উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই, কুল…। আমি ঠিক আছি।
তুমি কীভাবে জানো, তুমি ঠিক আছ? ইউ শুড হ্যাভ আ কোভিড টেস্ট! মাস্ট।
মাস্ট?
হুম, আমি সিরিয়াস।
আমিও সিরিয়াসলি একটি কথা জিজ্ঞেস করি? ধরো, আমি টেস্ট করালাম, ধরো আমি পজিটিভ হলাম। তখন…!
তখন?
তখন তুমি আসবে আমার কাছে? হেই… এই… শুনছো? আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম! তুমি শুনতে পাচ্ছো? এই… এই… শুনতে পাচ্ছো না? আমি তোমাকে একটি প্রশ্ন করেছিলাম…!
শুনেছি।
তাহলে কথা বলছ না কেন? তুমি চুপ কেন?
ভাবছি।
কী ভাবছ?

ভাবছি…। ফেনীর সোনাগাজীর একজন মানুষের কথা। তোমার মনে আছে? করোনাভাইরাসের সিম্পটম নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন। জ্বর, কাশি আর শ্বাসকষ্টও ছিল তার। মানুষটি বড় ভরসা নিয়ে ফিরেছিলেন পরিবারের কাছে, স্ত্রী-সন্তানের কাছে— তারা দেখবে তাকে, সেবা-শুশ্রূষা করবে…। তখনো প্রুভড না যে তিনি পজেটিভ। তবু তাকে বাইরের একটি ঘরে তালা মেরে আটককে রাখল তার স্ত্রী, তার সন্তানরা। মৃত্যুর আগে, বন্ধ ঘরে ‘পানি পানি’ করে চিৎকার করছিলেন মানুষটি, এক ফোঁটা পানিও দেয়নি তারা, যাদের জন্য সারা জীবন কষ্ট করেছেন, এই বাড়ি তিনি বানিয়েছেন, এই সংসার বেঁধেছেন…!
আহা!
আর নারায়ণগঞ্জের সেই ব্যবসায়ী? তিনিও মৃত্যুর সময় একটু পানি খেতে চেয়েছিলেন। কেউ দেয়নি! অথচ বিল্ডিংটা করেছিলেন বন্ধুদের নিয়ে। একেক ফ্ল্যাটে একেক বন্ধু। মানুষটার সাধ ছিল, আজন্মের বন্ধুদের সাথে পাশাপাশি থাকবেন, সুখে-দুঃখে কাটাবেন একটা জীবন। অথচ যখন কোভিড আক্রান্ত হলেন, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট… তখন সেই বন্ধুদের কেউ এগিয়ে আসেনি। কেউ তাকে হাসপাতালে নেয়নি! তার স্ত্রী চিৎকার করে কাঁদছিলেন— ‘কেউ আসেন, ভগবানের দোহাই, কেউ আসেন, মানুষটা মারা যাচ্ছে… দয়া করেন…।’ কেউ আসেনি। মানুষটি সিঁড়িতেই মরে পড়ে রইলেন…!
চারপাশে বন্ধু, তবু কী নির্দয় এই মৃতু! করোনা ছোঁয়াচে, করোনা ভয়াবহ…। কত ভয়ঙ্কর? এইসব মানুষের চেয়েও! মানুষ এমন বদলে যায়! করোনা আমাদের জানিয়ে গেল— চারপাশে চেনা মুখ অচেনা মানুষ সব!
ধরো, আজ বা কাল, তুমি বা আমি যদি মরে যাই, সরকারের খাতায় আমরা কেবল একটি ডিজিট মাত্র হয়ে যাব! মৃত্যুর মিছিলে কেউ মনেও রাখবে না— আমরা কে ছিলাম, কী ছিলাম… কী ছিল আমাদের গভীর গহীন সাধ-আহ্লাদ…!
হ্যালো? হ্যালো! শুনতে পাচ্ছো? হ্যালো…!
শুনছি।

এ কেমন কাল আমাদের জীবনে এল, বলো! সব তছনছ হয়ে যাচ্ছে… মানুষে মানুষে সম্পর্ক, মানবিকতা, পিতৃস্নেহ, বোনের মায়া… সব কিছু ভেঙে পড়ছে! স্পর্শ, প্রেম কিচ্ছুটি নেই আর, সব নিষিদ্ধ!
হাতের মুঠোয় হাতের পরশ রবে না। প্রিয় মানুষটি পাশে দাঁড়ালে মানুষ যেখানে সবচেয়ে সুখী হতো, ধনী হতো, সেই মানুষের নিঃশ্বাসকেও আজ বিষ মনে হয়…! চারপাশে মাস্কের মুখোশ, মানুষ এখন মানুষের মুখ দেখতে পারে না, মানুষ মানুষকে চিনতে পারে না!
আমরা কী ভাবতে পেরেছিলাম, এমন সময়ও দেখতে হবে জীবনে! ভয়াবহ! মনে হয় যেন দুঃস্বপ্ন।
এক্সাভেটর মেশিন দিয়ে কবর খোঁড়া হচ্ছে, গোরখোদকরা পেরে উঠছে না। শ্মশানে চিতার আগুন নিভছে না…!
কারা তাদের সৎকার করছে?
মানুষ।
মানুষ!
মানুষ। ভ্যাকসিন বলো, মাস্কের আড়াল বলো, আদতে মানুষই প্রকৃত নিরাময়। মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন…।
আচ্ছা, যদি তোমার আর আমার আবার দেখা হয়! ধরো হঠাৎ রাস্তায়, মুখোমুখি! দুজনের মুখ মাস্কের আড়ালে ঢাকা। তুমি চিনতে পারবে আমাকে?
চিনব।
কেমন করে? ডাবল মাস্ক পরা থাকবে না? KN95 কিংবা ধরো PPE আড়ালও থাকতে পারে।
জীবনানন্দে পড়োনি— পৃথিবীর সব গল্প ফুরোবে যখন, মানুষ হয়তো থাকবে না, মানুষের স্বপ্ন তখনো রয়ে যাবে। তোমার চোখের ভিতরে যে স্বপ্ন বোনা রয়েছে, সেই স্বপ্নের ভিতর তো আমারও ছবি আছে। তোমার চোখের আয়নায় চিনে নেব আমার মুখ…।
তুমি এমন করে বলো, বেঁচে থাকার সাধ জেগে রয় মনে।
বেঁচে থাকব। মানুষের জন্ম ভালোবাসা থেকে। তার বেড়ে ওঠা, তার বেঁচে থাকা ভালোবাসা নিয়ে। ভালোবাসার বিনাশ নেই, মানুষ তাই অবিনাশী।


 

Facebook Comments Box