ছোটোগল্প

খোদেজা ঘাট

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০১ পূর্বাহ্ণ | 147 বার

খোদেজা ঘাট

খোদেজা ঘাট
আবুল কালাম আল আজাদ

বাতেন ‘ইহ্….’ করে একটা শব্দ করে। খোদেজা দ্রুত শোয়া থেকে ওঠে বসে। হাত রাখে বাতেনের কাঁধে। আরেক হাতে বাতেনের বাম হাতটা চাপ দিয়ে ধরে প্রায় চিৎকার করে ওঠে, কী হইছে ময়নার বাপ?
-কিছু না।
-তাইলে ইহ্ কইচো কেরে?

 

খোদেজা চৌকি থেকে নামতে নামতে শাড়িটা শরীরে প্যাঁচিয়ে কুপি জ্বালায়। বাতিটা কাছে নিয়ে দেখে রক্ত ঝরছে বাতেনের হাটু থেকে। একটা কাঁচাটাকার চেয়ে সামান্য বেশি জায়গার চামড়া ছিলে গেছে। খোদেজা রাগে ফুসফাস করে।
-বেডাডারে বারেবারে কই অতো শক্তি খাডাইয়ো না। বেডায় হুনলে তো! বাতেন হিকহিক করে হাসে। খোদেজার রাগ আরও বাড়ে। অতো মঞ্চাইলে একটা তোষক বানাইতারো না? মৌল্লার মইধ্যে আডু ছিলতো না ত কী অইব? বেডাগিরিডা একটু কম দেহাইলে অয় না? বুইড়া অইতাছে আর তাইনের জোয়ানি বাড়তাছে…. তামশাডা….
বাতেন কিছু বলে না, হিকহিক করে হাসে। খোদেজা জামবাকের কৌটা এনে মালিশ করতে করতে বলে, কাইল থাইকা আমি মাডিত বিছনা করবাম। তুমি চকির উপ্রে ঘুমাইবা। ঘা হুগানের আগে কাছে আইবা না।
-এই খোদেজা, বারো বছরে একদিনও তরে ছাড়া ঘুমাইছি? মাইরাল্লেও এলহা এলহা থাকতারতাম না…
খোদেজা একটা গোয়ামুড়ি হাসি দেয়। ঘোরকালো খোদেজার চকচকা দাঁতগুলা বাঁকা ঠোঁটের ফাঁকে ঝিলিক মারে। সে জানে সোয়ামী তারে ছাড়া একরাতও ঘুমাতে পারবে না, পারে নাই।
বাতেন মাস্টর বাড়ির গোমস্তা, গৃরস্থ ঘুমালে উড়াল দিয়ে চলে আসে চৈত্র-কার্তিক বারোমাস। বাতেন গোমস্তা গোয়াইল ঘরেই থাকে। পাঁচজোড়া গরু বাঁধার পরে গোয়ালঘরের সামনের দিকে যে চৌকিটা পাতা সেখানেই তার শোয়ার বন্দোবস্ত। অন্যপাশে দুটি বাছুর আর একটি খাসি। ভাত, পানতামাক খেয়েই সে ঘুমিয়ে পড়ে সন্ধ্যাবেলা। মনিব রহিছ মাস্টার রাত দশটার দিকে গোয়ালের সামনে এসে গলাখাকারি দিয়ে বলে, বাতেন গোরুরে খাওন দিছস?
বাতেন এই ডাকটারই অপেক্ষা করে।
-দিতাছি হুতু….
-আজানের সময় উডিছ। হুতারের চাষের ক্ষেতটাত আল লইয়া যাওন লাগব….

-আইচ্ছা হুতো।
বাতেন গরুরে ঘাসখেড় দেয় কুপি জ্বালায়া। চাড়িতে পানি দেয়। লাল দামড়াটি ওঠে দাঁড়ায় সবার আগে। শরীরের টানায় ওটার আধহাত লিঙ্গ বের হয়ে আসে। দামড়াটা তার এক চাড়ি সামনে বাঁধা কালো গাভীটার নাক শুঁকে ‘কুক্ কুক্’ শব্দ করে। বাতেন দেখে, ঠিক করে নিজের লুঙ্গি। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে কুপি নিভিয়ে। মনিব হাগামুতা শেষে পুকুরে হাতমুখ ধোঁয়। ভিতরের ঘরে যাওয়ার আগে বাতেনকে সাবধান করে যায়, বাড়িত যাইচ না কিন্তুক। দেশে গোরুচুরি বাড়তাছে….
‘চুতমারানির পুত’ বাতেন মনে মনে একটা গালি দেয মনিবরে। ‘তুই ডেলি মারাইতারস, আমি পারি না?’
চুতমারানির পুত গালিটা বাতেন শিখেছে করিম হুজুরের কাছ থেকে। এতিমখানার ওস্তাদ করিম হুজুর ছাত্রদের বড়ো ঘরটার একপাশে ঘুমাতেন। একটা পর্দা টানানো থাকত। পর্দার এইপাশে বাতেনসহ বত্রিশজন এতিম ছাত্র ঘুমাত দুইসারিতে। করিম হুজুর তার সেবার জন্য একেক রাতে একেক ছাত্রকে ডেকে নিতেন। হাত-পা টিপাতেন। মাঝেমধ্যে বাতেনের ডাক আসতো। আট বছরের বাতেনের চোখে থাকত রাজ্যের ঘুম। তাও জোর করে চোখ মেলে থাকতে হতো। হাত চালাতে হতো করিম হুজুরের আঙুলের ইশারা বুঝেবুঝে।
সেদিন রাতে বাতেনের পালা ছিল সপ্তমবারের মতো। বাতেন সর্বোচ্চ শ্রদ্ধায় হুজুরের পা টিপছিল। হুজুর লুঙ্গিটা বুকের উপর তুলে বললেন, টিপ….। বাতেনের শরীর কাঁপছিল থরথর করে। করিম হুজুর নিজের বাম হাত বাতেনের লুঙ্গির নীচে ঢুকিয়ে ছোট পুরুষাঙ্গটি নিয়ে খেলতে খেলতে আবারও হুকুম দিলেন, টিপ দে চুতমারানির পুত….।
সে রাতে বাতেন আরেকবার চুতমারানির পুত গালিটা শুনেছিল, যখন সে ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠছিল প্রায়; তখন করিম হুজুর তার গলাচিপে ধরে চাপাস্বরে হুংকার ছেড়ে বলেছিলেন, চুপ….চুতমারানির পুত….তার ছয়মাস পরে এতিমখানার বত্রিশ শিশু এক অমাবস্যার রাতে একসাথে পালিয়েছিল।
বাতেন এখনও রোজ রাতে পালায়।
রহিছ মাস্টারের বড়ো মেয়ে রাইসা, ভার্সিটির লম্বা ছুটি পেলেই বাড়ি আসে। কয়েকদিন আগে এসেছে আবার। সবাই ঘুমিয়ে গেলে গোয়ালঘরের দরজা খুলে বাতেনরে ঘাটায়। পূর্ণযৌবনা রাইসা ম্যালা ম্যাজিক দেখায়। কয়েকদফা সেই ঘোরে মজেছিল বাতেন। কিন্তু এখন সে পালায়। খোদেজার ম্যাজিকহীন মায়া তারে চুম্বকের মতো টানে।
বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আসমানে চাঁদ দেখা যায়। জংলায় সাপ না ভূত আছে সেদিকে বাতেনের খেয়াল নাই। তার দুই পা এখন ময়ূরপঙ্খির ডানা। জংলার গন্ধটা খোদেজার শরীরের গন্ধের মতো। বাতেন ডাকার আগেই গায়েবী আওয়াজে খোদেজার ঘুম ভাঙে।
-ইয়াল্লা ইয়াল্লা….আইজও আইয়া পড়ছ! তুমার চাকরিডা এইবার যাইবো।

-যাউগ্গা। আমার বৌ থাকলেই অইবো।
খোদেজা জানে এই বেটা বৌপাগলা। সে হাঁটুতে জামবাক লাগাতে লাগাতে হিসাব মিলায়। তার মতো কুচকুইচা কালা একটা মাইয়ামানুষের লাগি পুরুষটা অতো দেওয়ানা কেন? হে তো ম্যালা সুন্দর পুরুষ! খোদেজা বাতেনের মাথায় বিলি কাটে, জিগায়- আইচ্ছা ময়নার বাপ কও তো তুমি আমারে অতো ভালা কেল্লাইগ্গা বাসো?
বাতেন জবাব দেয় না। হিকহিক করে হাসে। মনে মনে বলে, খোদেজারে….শয়তানি ফাইজলামি তো জীবনে বহুত করছি। আমি মানুষ চিনি, দরদ বুঝি। তুই আমার দুধকালি গাঙ, জংলার ঘাট। এই ঘাটের মইধ্যে ডুব দিয়া নিজেরেই খুইজ্জা পাই। ক্ষেতে যহন লাঙল চালাই তহন তর বুহের গন্ধ পাই। তুই আমার আসমান, জমিন।
খোদেজার কণ্ঠে অভিমান গলে। কই, কিছু কইতাছো না যে, অতো ভালা কেল্লাইগ্গা বাসো?
-কারণডা হুনলে তুই হাইস্যা দিবি….
-কও, হুনতাম চাই….
-তুই আমার ঘাট। হিকহিক….
বাতেন মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, খোদেজা বাতেনের দিকে। একটা মোরগ কুক্কুরোকুউউ ডাক দেয়। শোনা যায় দুটি পাখির কিচিরমিচির। ফজরের আগেই বাতেন আরেকবার ঘাটে নামতে চায়…

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments