দেশের বই ঈদ সাময়িকী

কুশল ভৌমিক-এর গুচ্ছ কবিতা 

শুক্রবার, ২১ মে ২০২১ | ২:৫৮ পূর্বাহ্ণ | 137 বার

কুশল ভৌমিক-এর গুচ্ছ কবিতা 

কুশল ভৌমিক এর গুচ্ছ কবিতা 


 

এসএসসি পাশ কবিতা ও শেকলের আখ্যান

আমার যে কবিতাটি এ বছর এসএসসি পাশ করলো
তাকে নিয়ে শহরে তুমুল হইচই
অনার্স-মাস্টার্স করা কবিতাগুলো
এক বিবৃতিতে জানিয়ে দিলো-
এমন অল্পশিক্ষিত কবিতার ঠাঁই হবে না রাজপথে।
পিএইচডি ডিগ্রিধারী কতিপয় কবিতা
গজফিতা দিয়ে মাপতে লাগল প্রতিটি শব্দের দৈর্ঘ্য প্রস্থ আর উচ্চতা
সুশীল শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হলো উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি
এবং যখন উন্মোচিত হলো-
এই কবিতাটির জন্মদাতা একজন নিরক্ষর কৃষক
মাতা যমুনাবতী গৃহিনী
ওরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল
কৌলিন্য হারানো শিল্প অবমাননার দায়ে গঠিত হলো বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে
ঘোষিত হলো একতরফা রায়-
মৃত্যুদণ্ড অথবা পিএইচডি ডিগ্রিধারী সুশীল কবিতাদের চরণে কৃতদাস হিসাবে আত্মসমর্পণ।

শহরের ডাকসাইটে কবিতাগুলো দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে
তেড়ে আসলো আর শেকল পরাতে চাইলো আমার
অল্প শিক্ষিত কবিতাটির হাতে ও পায়।

তখন কী আশ্চর্য ওঙ্কার তুলে আমার কবিতাটি
ছড়িয়ে পড়লো শহরের অলিতে-গলিতে
তুমুল বাজতে লাগল গণমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে।

যে কবিতা লেখা হয় রক্তের অক্ষরে
উচ্চারিত হয় হৃৎপিণ্ডের গভীর প্রদেশে
যে কবিতার শরীরে লেগে থাকে প্রিয়তম পিতার ঘাম জননীর চুম্বনের দাগ
তাকে হত্যা করা অসম্ভব, এ কথা জেনেও ওরা
আমার কবিতার দিকে তাক করে মারণাস্ত্র
আর অনাবশ্যক ঈর্ষার বুদবুদ্।

অথচ ওরা জানে না
মানুষের চিন্তাকে হত্যা করা যায় না
চিন্তাকে বাঁধবার মতো পৃথিবীতে কোনো শেকল নেই।

 

জন্মদাগ

ছেলেবেলায় একদিন
ডান উরুর মাঝখানে একটা কালচে দাগ আবিস্কার করলাম
মা জানালেন এ আমার জন্মদাগ।
সেই থেকে বহুদিন আমি একাকী বহন করেছি
জন্মদাগের রহস্য
হঠাৎ জন্মদাগটি আমার কাছে ভীষণ অসহ্য
আর বিরক্তিকর মনে হতে লাগল
প্রতিদিন স্নানের সময় সাবান দিয়ে সজোরে ঘষে
আমি জন্মদাগটি উঠিয়ে ফেলতে চাইতাম
মা খুব হাসতেন আর বলতেন-
‘লাভ নেই খোকা, জন্মদাগ কোনোদিন ওঠে না।’

মা নেই,বাবা নেই -অনেকগুলো বছর
বাবার আঙুলের স্পর্শ
মায়ের দেয়া চুমুর দাগ
সদুল্যাপুর গ্রাম, ধলেশ্বরী নদী, শৈশবের রঙ ছড়ানো ভিটেমাটি আর ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর
শরীরজুড়ে লেগে থাকা অন্ধকারের মতো
‘তুমি’ নামক একটি দুঃখ
আজও লেপটে আছে আমার শরীরে।

হে দুঃখ জাগানিয়া
তুমিও কি জন্মদাগ?

 

শূন্যতা 

প্রতিটি থাকার মাঝে কিছু না থাকা ফুটে থাকে
অসীমকে বুকে ধরেও
আকাশের আরেক নাম তাই শূন্যতা
জীবন যতটা শিল্পকলা তারও অধিক গণিত
এ কথা জেনেও শূন্যবাক্সে উঁকি দিয়ে মুগ্ধতা খুঁজি
এই মুগ্ধতার আরেক নাম বেঁচে থাকা।

কেন প্রতিদিন নিজেকে খনন করি
বুকের ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে
তুতানখামেনের সমাধি
সে তুমি জানবে না কোনোদিন।

জানি সব মেঘে বৃষ্টি হয় না
কোনো কোনো মেঘ বৃষ্টির আফসোস বাজিয়ে
চলে যায় দূরে- দূরের হাওয়ায়।

এই দূরত্বটুকুর নাম শূন্যতা
শূন্যতার আরেক নাম জীবন।

 

আমাকে নেবে তুমি

আমাকে চিনতে পারেনি কেউ
না মাটি, না সমুদ্র, না ঈশ্বর।
বিগত বিনয়, নির্জীব আকাঙ্ক্ষা, উদাসীন প্রলোভন
আমাকে চিনতে পারেনি
আমি আঁজলা ভরে জোছনার ছাই কুড়োনো মানুষ। বিবিধ বাঁকে এসে
খুঁজে মরেছি সরল পথের বিন্যাস
কোনো পথ আমাকে চিনতে পারেনি।
মূঢ়ের তর্ক আর তর্জনীর ভয়ে
হাঁটু মুড়ে পান করেছি সমকাল
দ্যাখো কেমন তামাটে আমার ওষ্ঠ
জিহ্বায় আগুনের আন্দোলন।
এ সংসার আমাকে চিনতে পারেনি
আমাকে ধারণ করেনি কেউ
না নদী,না নিসর্গ, না মাতৃভূমি।

আমাকে নেবে তুমি?

 

বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে 

বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে দ্বীপের গাম্ভীর্য নিয়ে
গুহায় ঘুমিয়ে পড়া অলস সময়
তবু স্থির কোনো চিত্রকল্প এঁকে
কড়া নাড়ে বহুদিন না খোলা কাঠের কপাটে
ঝিঁঝিঁর ডাক, উত্তাপহীন জোনাকির আলো
আছড়ে পড়ে শ্যাওলা জমা প্রাচীন সিঁড়িতে।

মেহগনি পাতার ফাঁকে কেঁপে ওঠে চাঁদ
বৃষ্টিফোঁটার মতো জোছনার ছাই
টুপটাপ ঝরে পড়ে
পৌরাণিক পুকুরের জলে-
খলবল হেসে ওঠে খলিসা পুঁটি
দানকিনার ঝাঁক
বিষণ্ণ কানিবক পাহারা দেয় মায়ের শ্মশান
বাঁশঝারে কেঁদে ওঠে কানাকুহা
টিনের চালে আছড়ে পড়ে হুতুমপেঁচার দল।

টিনচালা দুটো ঘর হাত ধরে সারারাত হাঁটে
গল্প করে, অযাচিত আড়ালে ঠোঁটে আঁকে
মৌনচুম্বন।

বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো
বাড়িটি মেশে না কারো সাথে
ভেসে থাকে দিন রাত
ইতিহাসের ঘোলাটে ডোবায়

আমাদের বাড়িটায় মানুষের পদচিহ্ন নেই
উঠোনজুড়ে ঈশ্বর হাঁটে।

 

বেদনার হায়ারোগ্লিফিক্স

এই যে আমি তোমার অবাধ্য ঠোঁটে
লেপটে দিলাম একটা কষ্টার্জিত দুপুর
আস্ত একটা কবিতার বই
বেদনার হায়ারোগ্লিফিক্স

এসবই আমার ক্ষুধার্ত প্রেমের নামতা।

যদি খুলতে পারো সমীকরণ
জীবনের ভগ্নাংশের ভাঁজ
দেখবে-

আকাশে ঝুলে আছে আইনস্টাইন
পাতার ভেতর খসে পড়ছে রবীন্দ্রনাথ
আর পৃষ্ঠাজুড়ে লালনের একতারা
আর আমি-
ব্রহ্মাণ্ডের মতো তোমার খোলা পিঠে
দুলে ওঠা বেণির শিল্পকলা দেখে দেখে
প্রশ্নবোধক চিহ্নের ভেতর ঢুকিয়ে দিই বিস্ময়

জীবন বস্তুত বিরাম চিহ্নের মাস্তানি!

 

জীবনানন্দ 

যতবার মানুষ হতে চেয়েছি
কীভাবে কীভাবে যেন ততবার
হয়ে গেছি দুর্বোধ্য পাণ্ডুলিপি
শরীর বিদীর্ণ করা কালো অক্ষর
তাই আশ্রয় পায়নি
প্রেমিকার ফর্সা আঙুলে।

সবিতা, সুরঞ্জনা, সুচেতনা
সচেতনভাবেই
উপেক্ষার চাদর বিছিয়ে
মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়।
মলাটবন্দি হবার আকাঙ্ক্ষাগুলো
দুঃখে অপমানে লজ্জায়
বন্দি হয়েছে মরচে পড়া লোহার বাক্সে
উঁকি দেবার ঝুঁকিটুকু নেয়নি।
শ্রীহীন জীবনে লাবণ্য থেকেছে অধরা
কাছে থেকেও দূরের আক্ষেপে
আমি কতবার মরে গেছি।

নিঃসঙ্গ চিলের মতো
কেঁদে কেঁদে উড়ে গেছি এ ঘাট থেকে ও ঘাটে
ফেরি করেছি  বিপন্ন বিস্ময়
মন্দাক্রান্ত বিষণ্ণতা অথবা দুঃখ
এসবই আমার নাম হতে পারতো
অথচ আমার নাম জীবনানন্দ!

কয়েকটা কবিতার বিনিময়ে
তোমরা কেউ নেবে এমন একটা জীবন?

Facebook Comments Box