কুদরত

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১ | ৫:৪৪ অপরাহ্ণ | 533 বার

কুদরত

রাতটা খুব বেশি হয়নি। রাতটা কমই। রাত্র মাত্র এগারটা হয়ত। তাও আবার ঘন রাত নয়। ফিকে হাল্কা চালের রাত। আঙিনায় দাঁড়ালে দেখা যাবে চালার উপরেই চাঁদটা ঝুলে আছে। খুলে আসছে জোছনা। এর মধ্যেই বেশ একটা হুলুস্থুল কান্ড ঘটে গেছে। ভৌতিক এ কান্ডটা প্রতিবছর ঠিক এই মাসেই এই তারিখেই ঘটে। অথচ ঘটে যাবার আগে এ ব্যাপারে কারো কিছুই মনে থাকে না। যখন ঘটে তখন মনে পড়ে যায় – ‘এই রে গতবছরও এই দিনেই এই কান্ডটা ঘটেছে। যদি আগেই মনে থাকত তবে হয়ত একটা পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া যেত।’ কিন্তু মনে করে থাকতে থাকতেই কখন যে সকলেই ভুলে যায় তা কেউ বুঝতে পারে না। শুধু ঘটে যাবার পর বলে – ‘আরে গতকালও তো আমার মনে ছিল।’ কেউ বলে – ‘আরে আজকে সকালেও তো মনে ছিল। ভাবীকে বলব মনে করেও বলা হয়ে ওঠেনি।’

‘হ্যাঁ’, ফেরাজুলও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে – ‘আমারও মনে ছিল না। নইলে আজকে সন্ধ্যায় আর বাসা থেকে বেরই হতাম না।’ সে রাত এগারোটার দিকেই ফিরেছে। এসে দেখে তার ছোটভাই আর তার বউ এর ঘর বন্ধ। তারা শুয়ে পড়েছে। ফেরাজুলের মাও শুয়ে পড়েছে দরজা কপাট বন্ধ করে। ছেলেটাকে ঘুম দিচ্ছিল সাহাতা। ছেলে ঘুমিয়েও পড়েছে। এই ঘুমানোর কিছুক্ষণ পরই ফেরাজুল বাসা ফিরেছে। সে দেখে তার বউ বসে আছে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে। ফেরাজুল আসার পর সে উঠে দাঁড়ায় আর বলে – ‘তুমি মুখ হাত ধুয়ে এসো ততক্ষণে আমি চট করে একটা ডিম ভেজে নিই তোমার জন্য – ভাত খাবে।’ ফেরাজুল মুখ হাত ধুতে চলে যায়। সাহাতা রুমের ভেতরেই – যে রুমে তারা ঘুমায় সে রুমেই একটা গ্যাস চুল্লি আছে – গ্যাস চুল্লিটা জ্বালে। কড়াইটাতে তেল গরম হচ্ছে। সাহাতা তার ঘুমন্ত বাচ্চাটার দিকে তাকাল। মায়াময় ছায়াময় মধুময়রূপ নিয়ে সে শুয়ে আছে। নিষ্পাপ শুদ্ধতা তার মুখের উপর খেলা করছে। এরপর সে কড়াইয়ের দিকে তাকায়, তেল বেশ গরম হয়েছে, যে কোনো কিছু ভালো মতো ভাজা ভাজা হবে। সে একটা ডিম ভাঙে, ডিম ভেঙে বাটিতে রেখে তাতে মরিচ কুচি, পেয়াজ কুচি, লবণ কুচি মিশেল করে। আঙুল দিয়ে নেড়ে ডিমের লেই তৈরি করে। কড়াইয়ের গরম তেলে সে ডিমের লেই ছাড়ে। চিড়বিড় করে ওঠে তেল আর ডিম। ঠিক এই সময় সে শুনতে পায় – ‘এই দে, এই দে’ অত্যান্ত শীতল এক শিশু কণ্ঠ। কোনদিক হতে শব্দটা আসছে সে বুঝতে পারে না। সে তার বাচ্চাটার দিকে তাকায়। বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছে। সে ভয় পেয়ে যায়। তারপরেও ডিমটাকে উল্টে দেবার জন্য খুন্তিটা হাতে নিতেই আবার শুনতে পেল – ‘এই দে, খিদে পেয়েছে, দে।’ সাহাতা ভয় পায়, তার গায়ে কাঁটা দিয়ে আসে। তার গলার স্বর ভড়কে যায়। সে তার পায়ের কাছে একেবারে লাগালাগি ফ্যাকাসে সাদা চার বছরের একটা বাচ্চাকে দেখতে পায়, সে চোখ বন্ধ করে আছে। সে তার শাড়ি ধরে টানছে আর বলছে – ‘এই দে, এই দে।’ সাহাতা বিরাট চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে দড়াম শব্দে পড়ে যায়।

ফেরাজুল মুখ ধুয়ে ফিরে আসার মধ্যেই এসব ঘটে গেছে। ফেরাজুল ঘরে ঢুকেই ডিমের পোড়া গন্ধ শুঁকতে পায়, তার বউকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে আর তার বাচ্চাটাকে সদ্য ঘুম ভাঙা অবস্থায় কান্নারত দেখতে পায়। সাহাতার চিৎকারে অন্য ঘুমবাসীদেরও ঘুম ভেঙে গেছিল। সবাই তাকে ধরাধরি করে বিছানায় তুলে নিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করে।

প্রতিবারই এমন হবার পর বেশ কয়েকদিন তাকে হতবিহ্বল অবস্থায় থাকতে হয়। ভালো করে খায় না, কান্নায় থেকে থেকে ডুকরে ওঠে, চোখ দিয়ে জল ঝরে। একসময় সে বাপের বাড়ি যেতে চায়। বাপের বাড়ি গেলেও যে একেবারে ঠিক হয়ে যায় এমন নয়। সেখানে গিয়েও সে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে থাকে কয়েকদিন। এই কয়েকদিন সকাল বিকাল দুপুর সন্ধ্যা পাশের পুকুর পাড়ে পড়ে থাকে। থেকে থেকে কাঁদে। কখনো কখনো রাতেও ঘুমের ঘোরে গিয়ে পুকুর পাড়ে বসে থাকে, ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে। চারপাশ শিহরিত হয়ে যায় তার অপার্থিব কান্নায়। তার বাবা মা তাকে ধরে নিয়ে এসে খেতে দেয়, ঘুমুতে দেয় আর প্রার্থনা করে। ধীরে ধীরে ঠিক হয়। আবার স্বামীর বাড়ি যায়। আবার হাসে খেলে। বাচ্চাটাকে আদর করে, স্বামীর সাথে সাধারণভাবে শোয়, বিশেষভাবে শোয়। সবই হয়। বিয়ের পর থেকে প্রতিবছর এমনটাই হয়ে আসছে।

এটা তার দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম বিয়েটা হয়েছিল লীলপাড়ার খেজারতের সাথে। কিন্তু তার কপালে সাপের থুথু এসে পড়ে। ধান কাটতে গিয়ে খেজারত সাপের কামড়ে মারা যায়। তখন তার কোলে দুবছরের ছেলে কুদরত। বাবা তার নাম শখ করে রেখেছিল কুদরত। খেজারতের বেটা কুদরত। আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে লুফে নিত খেজারত কুদরতকে। কুদরত খলখলিয়ে হেসে উঠত। খেজারত নামতার মতো করে বলতে থাকত – ‘খেজারতের বেটা কুদরত, খেজারতের বেটা কুদরত।’ কিন্তু এভাবে সাপের থুথু তার কপালে এসে পড়াতে সবকিছু বদলে গেল। সাহাতাকে দুবছরের কুদরতকে কোলে নিয়ে চলে আসতে হলো বাবার বাড়িতে।

সাহাতার বাপ-ভায়েরাও খুব বেশি স্বচ্ছল নয়। তার মা তাকে বোঝাতে লাগল – ‘তোকে আবার বিয়ে করতে হবে রে সাহাতা, বেগুনগ্রাম থেকে একটা সম্বন্ধ এসেছে। লোকটারও বউ মারা গেছে কোনো ছেলে পুলে নাই।’ রাজি হওয়া ছাড়া তার কোনো উপায় ছিল না। কুদরতের কথা ভাবনার ভেতর আসলেও বুকে পাথর দিয়ে সে রাজি হয়ে যায় আর আতর মেখে, স্নো-পাউডার মেখে বিয়ে হয়ে যায় ফেরাজুলের সাথে। স্বামীর সাথে চলে যাবার সময় কুদরতকে ধরে সাহাতার কান্না আর থামে না।

কুদরতকে খুব একটা মেনে নিতে পারে না ফেরাজুল। কুদরতকে থেকে যেতে হয় নানা বাড়িতেই। সে এখানে একা একা থাকে, পাড়ার ছেলে মেয়েদের সাথে খেলে। মা’র কথা মনে পড়লে কান্নাকাটি করে। কান্নাকাটি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবে পার হয়ে যায় বছরখানেক।

একদিন ফেরাজুল আসে শ্বশুর বাড়ি। সাথে সাহাতা। সাহাতাকে দেখেই কুদরত ঝাঁপিয়ে এসে কোলে উঠে। সাহাতা কুদরতকে চুমোয় চুমোয় ভরে দেয়। সাহাতা শ্বশুর বাড়ি থেকে আনা মন্ডা মিঠাই খেতে দেয়। দুপুরের পর কুদরত বায়না ধরে – ‘মা, দুপুরে তোর সাথে শুবো রে মা।’ সাহাতা তাকে বলে – ‘ঠিক আছে বাবা তাই হবে। শুইস।’ কুদরত সাহাতার গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে চুপচাপ যেন বহুদিনের মাকে ছুঁয়ে শুয়ে না থাকতে পারার সাধ মিটিয়ে নেবে।

ফেরাজুল কিছুক্ষণ পর এসে দেখে, সাহাতা আর তার পূর্বের ছেলে কুদরত শুয়ে আছে। সাহাতাকে কানে কানে কিছু বলে ফেরাজুল। সাহাতা ফেরাজুলকে বলে – ‘আজকেই তো বাড়ি চলে যাবো, রাতে গিয়ে না হয় হবে ওসব।’ ফেরাজুল বলে – ‘না, আমার এখনই ইচ্ছে করছে, তাছাড়া রাতে তো ঢাকার বাস ধরতে হবে এসবের সময় পাওয়া যাবে না। ছয় মাস আসতে পারব না বাড়ি।’ সাহাতাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফেরাজুল কুদরতকে বলে – ‘একটু বাইরে যা তো কুদরত।’ কুদরত কিছু না বলে মায়ের দিকে শুধু একবার তাকিয়ে বাইরে চলে যায়। কুদরতের চাহনি দেখে সাহাতার বুক ফেটে যায়। কুদরত যাওয়া মাত্র ফেরাজুল দরজা বন্ধ করে দেয়। সাহাতাকে জড়িয়ে ধরে। বিষণœ সাহাতা ধীরে ধীরে ফেরাজুলের জড়াজড়িতে জড়িয়ে পড়ে প্রসন্ন হয়ে ওঠে। সঙ্গম শ্রান্ত হয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। কুদরতের কথা তাদের মনে নাই।

সাহাতার ঘুম ভাঙার পরই মনে পড়ে কুদরতের কথা। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে বাড়ির ভেতর কুদরত নেই। সকলকেই জিজ্ঞাসা করে, কুদরত কোথায়? সবাইই বলে কি জানি বাইরে খেলছে হয়ত, পাড়ার সব ছেলেরা তো খেলছে। সাহাতা বাইরে বের হয়ে যেখানে বাচ্চারা খেলছে তাদের সবার মুখের দিকে তাকায়। এদের কেউই কুদরত নয়। সবাই অন্য কেউ। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করার সময়, একজন বলল – ‘কুদরত তো ছিল। পুকুর পাড়ের ঐ জায়গাটাতে ছিল, আমরা তাকে খেলতে ডাকলেও সে আসেনি। শেষে সে বসে বসে ঢুলতে থাকে। আমরা আর তার দিকে খেয়াল দিইনি। গোল্লাছুট খেলতে শুরু করেছিলাম।’ সাহাতা দ্রুত পুকুর ধারে এলে হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা একটা মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েটা কুদরতের এক বছরের ছোট হবে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলে – ‘আর কোনো মেয়ে নাই বলে আমি খেলছিলাম না। দূরে দাঁড়িয়ে একবার খেলার দিকে একবার কুদরতের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। কুদরত ঢুলছিল কিনা জানি না, শুধু দেখছিলাম মাথা নিচু করে বসে আছে। হঠাৎ দেখি সে পুকুরের জলে গড়িয়ে পড়ল। আমি তাকে তোলার জন্য নেমেছি কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছি না।’ সে আবার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।

জাল টেনে কুদরতের লাশ যখন তোলা হলো তখন পৃথিবীর তাবৎজলের গায়ে বিক্ষুব্ধ ঢেউ জেগেছে সাহাতার চিৎকারে। পুকুরের জলের চেয়ে বেশি শোক আর কান্নার জল জমা হতে থাকে কুদরতের পাড়ায়।

 

অলংকরণ : সমর মজুমদার


দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments Box

দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় শওকত হোসেন লিটু