ঈদ সাময়িকী ॥ ছোটোগল্প

করোনাকালের গল্প : ব্যালাড অব এ সোলজার

সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২০ | ১১:৩৭ অপরাহ্ণ | 489 বার

করোনাকালের গল্প : ব্যালাড অব এ সোলজার

করোনাকালের গল্প : ব্যালাড অব এ সোলজার
॥ জি. এম. ফরিদ ॥

 

 

অফিস শেষে হাসপাতালের সামনেই বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার মাসুদ হাসান। তিনি এই কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালেরই একজন আই সি ইউ (ICU) স্পেশালিস্ট। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন কিছুক্ষণ আগে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ নেওয়া এক পেশেন্ট আর তার মেয়ের অপেক্ষায়!

 

পেশেন্ট নিজে একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক; মেয়েটাও একটি প্রাইভেট মেডিকেল থেকে সদ্য পাশ করেছে। মেয়েটি যাবার আগে তার সাথে কথা বলতে চেয়েছে; অফিস শেষে তাড়াহুড়োয় তিনি বেমালুম তা ভুলে গিয়েছেন। মেয়েটাকে দেখা না দিয়ে যাওয়াটা ভারি অন্যায় হবে। তাই দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
একটু দূরের পার্কিংয়ের দিকে না গিয়ে তিনি এই প্রবেশ পথের দরজার সামনেই অপেক্ষা করছেন। এতক্ষণে তাদেরও বেরিয়ে আসার কথা।
প্রায় এক মাস ভদ্রলোক এখানে ছিলেন। তার বয়স ৬৫। প্রেসার, ডায়াবেটিস আছে; মাসতিনেক আগে হার্টের ‘বাইপাস’ও করিয়েছেন। একজন ‘করোনা রােগী’ হিসেবে তিনি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো তার মেয়েকে নিয়ে। সে বাবার সাথেই থাকতে চায়। এ হাসপাতালে ‘করোনা পজেটিভ’ কেস ছাড়া এমন কি অ্যাটেন্ডেন্ট হিসেবেও কারও থাকার নিয়ম নেই; মেয়েটির করোনা টেস্ট ‘নেগেটিভ’। অতএব…

কিন্তু মেয়ে অনড়। কোনােভাবেই সে বাবাকে এখানে একা রেখে যাবে না। ঝুঁকি নিয়েই সে থাকবে।
তিন বোন তারা। বাসায় অসুস্থ মা আর ছোটাে বোন। বড়’দি স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সে ছাড়া এখানে থাকবে কে?
ছ’মাস আগে সেও ‘সাত পাকে বাঁধা’ পড়েছে। স্বামী ডাক্তার। এখানে থাকার বিষয়ে তাদেরও আপত্তি নেই।
“ডাক্তার হয়ে করোনার ভয়ে যদি নিজের বাবার কাছেই থাকতে না পারে, রোগীর পাশে সে থাকবে কী করে?” তার যুক্তি খুব পরিস্কার।
ভদ্রলোক বিষণ্ন মুখে জানালেন, “নিজেও তিনি মেয়েকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। নতুন সংসার তার…” কিন্তু কোনাে লাভ হয়নি।
অগত্যা বাপ-মেয়ের জন্য একটা দুই বেডের কেবিন বরাদ্দ দেওয়া হলাে।

ষাটোর্ধ বয়স, তার সাথে আছে মাল্টিপল কো-মরবিডিটি। ভদ্রলোকের অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যেতে লাগল। একসময় তাকে আইসিইউ’তে শিফট করা প্রয়োজন হয়ে পড়লো।
মেয়েটা আইসিইউতেও বাবার কাছে থাকার অাবদার জানালো। এবার আর তারা সায় দিতে পারলেন না।
প্রথমে অনুরোধ… তারপর চোখ ছলছল; এরপর সে যুক্তিতে গেল।
“এখানে তো ‘করোনা নেগেটিভ’ ডাক্তাররাই সবাই ডিউটি করছে! মনে করেন আমিও একজন ‘ডিউটি ডাক্তার’। প্লিজ আঙ্কেল… প্লিজ!”
অপেক্ষাকৃত বয়োজ্যেষ্ঠ দেখেই হয়তো মেয়েটি সরাসরি তার দিকেই তাকিয়ে রইলো!
তার বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তার কি কারও কথা মনে পড়ে গেল? হবে হয়তো।
মেয়েটার গলায় এমন একটা আকুতি ছিল কেউ আর না করতে পারলো না।
তাকেও ফুলসেট পিপিই (PPE) পরিয়ে আইসিইউতে বাবার পাশে সার্বক্ষণিক থাকার ব্যবস্থা করা হলাে।

শুরু হলাে যেন যমে-মানুষে টানাটানি। ভদ্রলোকের ভাইটাল প্যারামিটার দ্রুত ফল করতে লাগল। একসময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তাকে ভেন্টিলেটরে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলাে। মেয়েটি রাজি হলাে না।
কেন কে জানে!
সবাই মোটামুটি ভদ্রলোকের পরিণতি বুঝে নিলেন।

 

 

মেয়েটা যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। তাকে সেখান থেকে সরানোও গেল না। গ্লাভস পরা হাতে বাবার হাতটা ধরে সে বিছানার পাশে অনড় দাঁড়িয়ে রইল। আপাদমস্তক ধবধবে সাদা পোশাকে তাকে যেন মনে হলাে এক স্বর্গীয় দেবদূত!
একজন ডাক্তার হিসেবে বাবার পরিণতি সেও কিছুটা অান্দাজ করতে পারে। রাউন্ডে গেলে তাই হয়তো মুখ ফুঁটে তার কাছে আর তেমন কিছু জানতে চায় না। শুধু ভালো কিছু শোনার আশায় অধির আগ্রহে তাকিয়ে থাকে।
তিনি মেয়েটার মুখের দিকে ভালাে করে তাকাতেও পারেন না। মাঝেমাঝেই তিনি চোখের সামনেই যেন দেখতে পান। ঐ বিছানায় শুয়ে আছে ডাঃ মাসুদ হাসান!…
শুধু হাতটা কেউ ধরে নেই!
যন্ত্রের মতাে তিনি মেয়েটিকে শান্তনার বাণী শোনান, “হোপ ফর দ্য বেস্ট। গড ব্লেস…”
তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন ভদ্রলোকের খারাপ কিছু ঘটে গেলে মেয়েটার মুখোমুখি তিনি আর আসবেন না।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেয়ের এমন অবোধ, অবুঝ টানেই বুঝি চলে যেতে যেতেও ভদ্রলোক ফিরে দাঁড়ালেন!

চারদিন পর তিনি চোখ মেলে তাকালেন! মেয়েটা ঘোরের মধ্যেই শুধু বিড়বিড় করতে লাগল, “বাবা ভালো হয়ে যাবে… বাবা ভালো হয়ে যাবে”
কী গভীর বিশ্বাস আর তীব্র আকাঙ্ক্ষা সে উচ্চারণে!
মাস্কে মুখ ঢাকা থাকায় তিনি মেয়েটির মুখের অভিব্যক্তি তেমন বুঝতে পারলেন না। শুধু গগলস এর ভেতর দিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন মানুষের চোখ কী করে কথা বলে!
আস্তে আস্তে ভদ্রলোক সেরে উঠলেন।

কিছুক্ষণ পরই বাবাকে সাথে নিয়ে নীলু নামের মেয়েটিকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। সামনেই তাকে দেখে সে যেন খলবল করে উঠলো।
“আঙ্কেল, সারা হাসপাতালে আপনাকে আমি খুঁজে হয়রান! সবাই বলল আপনি বেরিয়ে গিয়েছেন”
বাবার পাশে মেয়েটা খুশি আর আনন্দে যেন ঝলমল করছে। তার চোখ-মুখ কি এক অন্তর্গত বিভায় যেন সমুজ্জ্বল।
“এখন বলো তো মা কী কথা তোমার? তোমাদের জন্যই সেই তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি।”
ডাক্তার মাসুদ মেয়েটির হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাকে যেন কিছুটা বিষণ্ন আর অন্যমনস্ক মনে হয়।
একটু চুপ থেকে কিছুটা যেন গুছিয়ে নিয়েই সে বলা শুরু করে,
“আঙ্কেল, এই একটা মাস আপনাদের, বিশেষ করে আপনাকে অনেক জ্বালাতন করেছি। যখন-তখন বিরক্ত করেছি, অন্যায় আবদার করেছি, অকারণ জিদ্ ধরেছি! আমার জন্যই আপনাদের নিয়মও ভাঙ্গতে হয়েছে! সরি আঙ্কেল কিছু মনে করবেন না… প্লিজ! আমি আসলে বাবাকে খুব…”

 

শেষের দিকে সে আর কথাটা শেষ করতে পারে না; তার গলাটা কেমন ধরে আসে। তার এমন গোছানো কথায় তিনি একটু অবাকই হন। অবিকল সেই চেনা ভঙ্গি!
তাকে আশ্বস্ত করতেই তিনি বলেন, “এসব কী বলো বোকা মেয়ে। কিছু মনে করবো কেন? বাবার জন্য তুমি যা করেছ! তোমার এমন জিদ্ যেন চিরকাল বজায় থাকে।”
একটু থেমে তিনি যেন স্বগতোক্তি করেন, “আমারও তোমার মতােনই এমন বাপ-পাগল এক মেয়ে আছে! সেও ডাক্তার। স্বামীর সাথে কানাডায় থাকে।
ঐ একটাই সন্তান আমাদের।”
তারপরই হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “আজ যদি আমি করোনায় আক্রান্ত হই। এমন জিদ্ দেখানোর কেউ তো নাই! তোমার বাবা বড়ো ভাগ্যবানরে মা।”
অজান্তেই তিনি বুঝি একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে যান।
মেয়েটার মুখ সহসা ম্লান হয়ে আসে। কী বলবে, কী বলা উচিৎ সে যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তারপরই হড়বড় করে বলে বসে, “আঙ্কেল, ভগবান সহায়। এমন কিছু যেন কখনও না হয়। আর যদি হয়, আমাকে খবর দিবেন। আমি আসবো।”
মেয়েটির এমন সরল উচ্চারণে তিনি হেসে ফেলেন। হাসেন মেয়ের বাবাও।
তাদেরকে এভাবে হাসতে দেখে সে দ্রুত বলে উঠে, “করোনা আমার কিচ্ছু করতে পারবে না। দেখলেন না, একমাস বাবার সাথে থেকেও আমি ‘করোনা নেগেটিভ’! করোনা মনে হয় আমাকে ভয় পায়, আঙ্কেল!”
বলে সে নিজেও হাসতে থাকে। তার হাসিতে শিশুর সারল্য আর এক ধরনের গর্ব।
কথা সত্যি!
দীর্ঘ একমাস করোনা রোগীর সংস্পর্শে থাকার পর গতকালও তার টেস্ট এসেছে ‘নেগেটিভ’!
তিনি মেয়েটির এমন সহজ-সরলতায় মুগ্ধ হন। মেয়ের বাবাও হাসি মুখে মেয়ের দিকেই চেয়ে আছেন। সে মুখ এক গর্বিত পিতার মুখ।
এই পড়ন্ত বিকেলে, করোনার এই বিপন্নকালে বাবা-মেয়ের এমন গর্বিত, হাসিমাখা মুখ দেখে তার মনটা সত্যিই ভালাে হয়ে যায়।

তাকে কিছু আর বলার সুযোগ না দিয়ে মায়াবতী মেয়েটি বাবাকে সাথে নিয়ে চলে যায়। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সহসাই তার মনে আসে,
“বাবার জন্য এক মেয়ের ভালোবাসার কাছে করোনা হেরে গেছে! স্যালুট দ্য রিয়েল হিরো।”

অজান্তেই ডাক্তার মাসুদ হাসানের ডান হাতটা স্যালুটের ভঙ্গিতে উঠে এসে কপালের ডান পাশে স্থির হয়ে যায়!
আশ-পাশের মানুষজন যে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ডা. মাসুদ হাসানের তা যেন চোখেই পড়ে না।
এই অদ্ভুত, অপূর্ব সুন্দর দৃশ্যটি মেয়েটির দেখা হলাে না। কারণ সে আর পিছন ফিরে তাকায়নি।
বীর কখনও পেছন ফেরে না!

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments