দেশের বই ঈদ সাময়িকী

এলিজা খাতুন-এর ছোটগল্প ‘অধরা’

শনিবার, ২২ মে ২০২১ | ১:০৯ পূর্বাহ্ণ | 187 বার

এলিজা খাতুন-এর ছোটগল্প ‘অধরা’

অধরা
।। এলিজা খাতুন ।।


 

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। এরইমধ্যে অফিস গেটে পৌঁছে গেছে অধরা। গেটে ঢুকে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের বড় সাইনবোর্ড লাগানো শেডের নিচে দাঁড়িয়ে ভ্যানের ভাড়া মেটায়। মেইন গেট থেকে অফিস ইউনিট পর্যন্ত আসতে সারামুখ বিন্দু বিন্দু জলে সেজে উঠেছে। ইউনিটের প্রথম সারিতেই প্রোগ্রাম অফিসারের রুম। এটার সামনের ওয়ালে অর্ধেকাংশ টানা গ্লাসডোর। অফিসের প্রত্যেককেই এ রুমের সামনে দিয়ে যেতে হয়। আজমল খান প্রোগ্রাম ম্যানেজার। চাইলেই বিশেষ বিশেষ কারো যাওয়া-আসা তার নলেজে রাখতে পারেন। অধরা নিজ টেবিলে পৌঁছামাত্র ফোন বেজে ওঠে। ‘অধরা গতকালের ফাইলটা নিয়ে আসেন।’
সামনের ফাইলটা হাতে তুলে অধরা সোজা আজমল খানের রুমে যায়। অধরার মুখের দিকে তাকিয়ে আজমল খানের দৃষ্টি ক্ষাণিক স্থির। অধরা ভুলে গেছে মুখ মুছতে। আজমল খান ফাইলটা হাতে নিতে নিতে বলেন-
‘অধরা আপনার রেজিস্টারে বেশ কিছু এন্ট্রি গরমিল আছে, অফিস আওয়ার শেষে আমার সাথে বসবেন। ও হ্যাঁ, আপনি ছুটি চেয়েছেন। কিন্তু সিডিউল অনুযায়ী আগামীকাল আপনার গ্রুপ ভিজিট। একটা বিশেষ সমস্যায় আপনাকে যেতে হবে। ছুটির বিষয়টা এখুনি ফাইনাল নয়।’
অধরা ভেবে পায় না কী উত্তর দেবে। অনেকদিন হলো গ্রামে যায়নি। মা ফোন করে ডাকছে বারবার। বিষণ্নতা চেপে ধরেছে অধরাকে। তবে আজমল খানের কথায় কিঞ্চিত ভরসা পায়-
‘দেখি আপনার জায়গায় মিতু আপাকে সেট করতে পারি কি না। সেটা সম্ভব হলেই আপনি ছুটি কাটাতে পারবেন।’
নিজ টেবিলে ফিরে এসে অধরা কিছুসময় নীরব থাকে। তবে বেশি সময় তা স্থায়ী হয় না। সকালের জরুরি কাজে মনোনিবেশ করে। অধরা টেবিলের পাশের জানালাটা আরেকটু ভালো করে খুলে দেয়। ছিটা পানি এসে হাতে লাগে। মুহূর্তটা ওর বিষণ্নতাকে কিঞ্চিৎ সারিয়ে তোলে।

গত তিনদিন অবিরাম বৃষ্টি। আজ ভোরবেলা থেকেই ঝকঝকে আকাশ। হঠাৎ ফোন বাজে। রিসিভ করে অধরা। ওপার থেকে জানানো হয় মিতু আপা অসুস্থ। দেরি হলেও অধরা যেন অফিস যায়। ইমার্জেন্সি। অধরাও জানায় বৃষ্টি থামলে যাবে।
অভ্যেসের চেয়ে আজ একটু আগেই উঠেছে সে। অন্যদিন অফিস যাবার তাড়া থাকে। আজকের তাড়াহুড়ো অন্যরকম। আউটিং-এ যাবার প্রস্তুতি সামান্য বেশি। কেন্দ্রগুলো দূর-দূরান্ত গ্রামে। প্রত্যন্ত এলাকায় যাবার আগে অধরা বাসা থেকে জলের বোতলসহ আরও টুকিটাকি প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে নেয় ব্যাগে। সব কাজ সম্পন্ন করে সময়ের আগেই ঠিকঠাক গুছিয়ে বের হওয়া ওর অভ্যেস। কুকারে আলুসেদ্ধ ভাত বসিয়ে ভর্তার জন্য পেঁয়াজ কুঁচিয়ে রাখে।
নিজের ঘরে যায় অধরা। নিজের ঘর বলতে ছোট কামরা, এটাচ বাথ, অন্য এক পরিবারে সাবলেট থাকা। অধরা স্নান শেষে আয়নায় সামনে এসে দাাঁড়াতেই চোখে পড়ে- মুখে ভেজা চুলের লুটোপুটি। জলের অনুরাগে খুব স্নিগ্ধ লাগছে ওকে। কী মনে করে গাঢ় সবুজ রংয়ের ওড়নার সাথে সাদা জামা পরে। হঠাৎ উজ্জ্বল আকাশের মুখ ভার হয়ে ওঠে। অধরা নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের বড় জানালা দিয়ে আকাশের মেঘলা মেজাজ টের পায়। আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়। এ অবস্থায় গলির মুখে কোনো মটর ভ্যান বা চার্জার গাড়ি থাকে না।

অফিস পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয় অধরার। অর্ধদিবস উপস্থিতি দেখায়। হেমন্তের দুপুর। ও বেলা আকাশ মেঘলা ছিল। বৃষ্টি ঝরিয়ে এখন শান্ত আকাশ। দুপুরের পরপর একটু বেলা পড়ে এলে অফিস থেকে বের হয় আজমল খান। গেটের বাইরে বাইকে বসে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষায়। অধরাও বেরিয়ে পড়ে সময়মতো। মেনগেটের সামনে কোনো ইজিবাইক, স্কুটার, সিএনজি এমনকি মটরভ্যান নেই এখন। অন্যদিন দু’একটা খালি বাহন দেখা যায়। আজমল সাহেব ওর জন্যই যে অপেক্ষা করছে অধরার সেটা অজানা। গেট থেকে বের হতেই আজমল সাহেব বলে ওঠেন, ‘তেমন বৃষ্টি নেই, এই ফাঁকে গ্রুপে পৌঁছানো যাবে।’ অধরা ইতস্তত করলেও তা স্থায়ী হয় না। অনেকটা দূরপথ। তাছাড়া কিছু পাওয়াও যাচ্ছে না। আজমল খান আবার বলেন, ‘ঝটপট ওঠেন।’ জল বেছে বেছে পা ফেলে টপকে বাইকের পেছনে ওঠে অধরা। অসময়ে যেতে হচ্ছে গ্রুপে। হাইওয়ের দু’পাশে নিচু জমিতে জল জমেছে। শা শা করে ছুটছে বাইক। জনশূন্য রাস্তা। দুদিকের জল ছপছপে বিল পেছনে সরে সরে যাচ্ছে বাইকের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে। এ এক অন্যরকম পরিবেশ। অধরা গম্ভীর। আজমল খান ফুরফুরে মেজাজে বলেন,
‘এরকম পরিবেশে আপনার মনে গান আসে না!’
‘খরায় পুড়তে পুড়তেও গান আসতে পারে।’
আজমল সাহেব হা হা করে হেসে ওঠে। অধরা নিরুত্তর।
ত্বকের উপর বৃষ্টির স্বচ্ছ জলকণায় সবুজ আভা চিকচিক করছে; ভেজা মুখে বিন্দু বিন্দু জলের ওপরে ওড়নার সবুজ রংয়ের বিম্ব!

আর অল্পকিছুক্ষণের মধ্যে কাদাপুর পৌঁছে যাবে ওরা। রাস্তার ভাঙা অংশে বাইক থেকে দুজনেই নামে। হাঁটতে হাঁটতে আজমল সাহেব অধরাকে বলতে থাকে,
‘এ গ্রামের সদস্য পরিমল মুন্ডা তার স্ত্রীর মাধ্যমে গ্রামের বেশ কিছু মহিলার কাছ থেকে ক্ষুদ্রঋণের টাকা তুলে নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ টাকা। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি এতদিন। গোপনসুত্রে অফিসে খবর গেছে পরিমল মুন্ডা সীমান্ত পার হয়ে ওপারে পালিয়ে যাবার পরিকল্পনা করছে। ইতোপূর্বে আরও দু’তিনজন এ ঘটনা ঘটিয়েছে। পাশের গ্রামের কয়েকজন মোটা অংকের ঋণ নিয়ে অলরেডি ভারতে পলাতক।’
আজমল সাহেব অধরাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে সেসব সদস্য বেশিরভাগ আপনার ভর্তি করা। আর ঋণের আবেদন ফরমে আপনার সুপারিশ রয়েছে।’
এ কথার প্রেক্ষিতে অধরা চমকে ওঠে। এটাই তাহলে ইমার্জেন্সি? কিন্তু তার সময়ে দেওয়া ঋণ তো পরিশোধ করে সেসব সমদস্যরা পুনরায় ঋণ নিয়েছে! বর্তমান ঋণ খেলাপীর দায়ভার তো নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের উপরে বর্তায়! আজমল খানকে কথাগুলো বলে অধরা পথের ধারে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। সামনে সরু খাল। দু ধারে অবিচ্ছিন্নভাবে বাড়ন্ত ঘাস যেন সবুজ গালিচার মতো বিছিয়ে আছে। বিষণ্নতার ভারে অধরার বসে পড়তে ইচ্ছে করে। দেরি হয় না তাতে। আজমল খানও বাইক রেখে অধরার সম্মুখে বসেন। অধরা খালের জলে কী যেন দ্যাখে! শান্ত জলে আজমল খানের প্রতিবিম্বটা কেমন বিকৃত আর অদ্ভুত লাগে। অধরা আচমকা মুখ তুলে দ্যাখে সম্মুখে বসা আজমল খান ওরই মুখে কেমন করে তাকিয়ে আছে। অধরার সমস্ত মুখ জুড়ে সবুজ আভার দ্যুতি; ওড়নার সবুজ রংয়ের প্রতিফলন হয়তো। কিন্তু কারণটা আজমল খান হাতড়ে পায় না। খুব স্বাভাবিক অধরাকে আবার বাইকে উঠতে বলে আজমল।

অগ্রহায়ণ মাসের ঝকঝকে বিকেল। ঘরে ঘরে ধান মাড়াই চলে। বৃষ্টিতে ধান ভিজে যাওয়া থেকে বাঁচাতে যেসব চাতাল পলিথিনে ঢাকা ছিল তা উন্মুক্ত করা হচ্ছে একে একে। কাদাপুর গ্রামের বেশিরভাগ সদস্য মাঠে ধান কাটতে যায়। মজুরি নিয়ে ফিরতে সন্ধ্যা গড়ায়। কিছু সদস্যর বাড়ি বিলের অনেক ভেতরে। ক্ষেতের আইল ধরে যেতে হয় সেসব সদস্যদের বাড়ি। দৃষ্টি ও মন দু’ই পাকা ধানের ছড়ার সাথে কথোপকথনে, শীষের দোলে মিলে মিশে হাঁটতে বেশ লাগে। দু’পাশে কখনও সারি সারি কাটা ধানের গোছা, কিছু জমি আধপাকা ধানের শীষে পোয়াতির মতো দাঁড়িয়ে।
একসময় এখানে কালেকশন শেষ করে অফিস ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেত অধরার। ফিল্ড ওয়ার্কার থেকে প্রমোশন হয়ে এখন সে অফিসে ডাটা এন্ট্রি সেকশন ইনচার্জ এবং সপ্তাহে একদিন গ্রুপ ভিজিটের দায়িত্ব তার। এ গ্রুপে কিস্তি আদায়ের দায়িত্ব এখন অন্যজনের। পরিমল মুন্ডার পালিয়ে যাবার তথ্যকে কেন্দ্র করে অধরাকে আসতে হলো আজ। মাটির উঁচু-নিচু এ পথটুকু ধীরে চালায় আজমল। অধরাকে বলে ভালো করে ধরে বসেন। অধরা বাইকের পেছনের রড আঁকড়ে ধরে জানায়, ঠিক আছে সে। অথচ আজমল খান আরও ভালো করে ধরে বসার কথা বারবার কেন বলছে অধরা ভেবে পায় না।
দূর থেকে ভেসে আসা ক্ষীণ শব্দে শুনতে পাচ্ছে মাইকের ঘোষণা। ‘টিকিট’ এবং ‘পাঁচশত টাকা’ কথা দুটো ছাড়া আর কিছু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। এরপর মাইক বহনকারী ভ্যানটি ধীরে ধীরে কাছে এলে স্পষ্ট হয়। সুলভ মূল্যে টিকিট দেওয়া হচ্ছে। আগামীকাল থেকে সাতদিন এখানে যাত্রা চলবে। মাত্র পাঁচশত টাকায় টিকিট নিয়ে চলে আসেন কাদাপুর বিলের যাত্রাপ্যান্ডেলে- এটুকু শোনার পর ঘোষণাটি পরিস্কার হয়।
এ গ্রুপে কিস্তির টাকা আদায়ে অনেক ঝামেলা হয় বরাবর। অনেকের বাড়ি দু’দিন করে বিকেলে যেতে হতো অধরাকে। বেশ দূরে গ্রুপ হওয়ায় অফিস থেকে সবার আগেই বেরিয়ে পড়তো অধরা। অফিস থেকে তিন কিলোমিটার শহরের মধ্যে দিয়ে পা চালিত ভ্যানে মোড়ে এসে, সেখানে বাহন পালটে কাদাপুরগামী বাহনে চড়তে হয়। আরও সাত কিলোমিটার পথ। ডানে-বামে কাটা ধানের ভুঁই ছাড়িয়ে শাঁ শাঁ করে ছুটে চলতো ইঞ্জিনচালিত ভ্যান। বিশ মিনিট সময় লাগে ফাঁকা বিল পার হতে। তারপর লোকালয়। যখন অধরা ছিল দায়িত্বে কঠিন অবস্থা হয়েছিল একবার। সেদিন গ্রুপে এসে বসতেই একসাথে অনেককজন সদস্য বলেছিল,
‘আইজকে বিশাল বিপদ হয়্যি গেচে আফা, কিস্তি দিতে পারবে না কেউ।’
একে একে প্রায় সবাই এসে সমস্বরে বলেছিল,
‘সর্বনাশ হয়ে গেছে গো আফা। জোয়ান জোয়ান মদ্দানোকগুনোরে শেষ কইরে দেছে উরা।’
অধরা হতভম্বের মতো তাকিয়ে শুনছিল ওদের কথা। ওদের একজন সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বিস্তারিত বলেছিল,
‘ওরে আফা শোনো, আমাগের এ গেরামের ব্যাটানোকগুনো ব্যপসাপাতির মালামাল আনতি গেল ওপারে। কালগের রাত্তিরবেলা গাঙের ওপার থেইকে এ পারে ফিরে আসতিছিল তারা। তখন তাগের গায়ে বিএসএফ গুলি করে। দু’একজন ওদিকির গাঙপাড়ে নেতায়ে পড়ে। তাগের একানও খোঁজ নেই। বাকিরা গুলি খেয়েও গাঙ্গে ঝাঁপ দেয়। সাঁতরাতে সাঁতরাতে এ পারে এসে উটেচে। ক’জনার লাশ পাওয়া গেছে গাঙ্গের ধারে। তাগের বাড়িতে এখন শোক।

ওদের কথায় অধরার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে। কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে অফিসে বিষয়টি জানায়। অফিস সেটা আমলে না নিয়ে বরং গ্রুপে অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছিল। এমন কত কত দিন অধরার অভুক্ত অবস্থায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে এই অজ গ্রামে। কী কষ্টই না হতো এ গ্রামে কালেকশনে। অতীতের দিনগুলো এতক্ষণ ভাবছিল অধরা।
আজমল বাইক থামায়। ওরা নামে। সোজা রাস্তাটি কাদাপুরের শেষে পৌঁছেছে। মোড় থেকে সরু রাস্তা ধরে কিছুদূর হেঁটে বাঁ’দিকে হরিপদ কাকার ছোট্ট দোকান। তাকে পরিমল মুন্ডার কথা জিজ্ঞাসা করতেই বলে,
‘সোজা হাঁটতে থাকো। একদম শেষ মাতায় দেকপা যাত্রা প্যান্ডেল বানায়েছে। পাশে খেজুর গাছআলা ঠালির ঘর। আমার আজগের কিস্তি মাগো ফিরতি পতে নিয়ে যাইয়্যানে। বেচাকেনা বড্ড মন্দা।’
অধরা তাকায় আজমল সাহেবের দিকে। আজমল সাহেব বললেন, ‘আজকে এই চাচার কিস্তি না নিয়েই চলে গেছে মিন্টু সাহেব। এভাবে ছাড় দিলে তো সদস্যদের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে।’
ওরা আর দাঁড়ায় না, দোকানের সামনে বাইক রেখে চাচাকে টাকা রেডি করতে বলে এগোয়।

ডানে-বামে সারি সারি ঘরবাড়ি। ঘরের সামনে পেছন যতদূর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়, দেখা যায় ধানের কাজ চলছে বাড়ি বাড়ি। কারও বাড়ির ছোট্ট উঠোনে ধান জড় হচ্ছে। কারও উঠোনে ধান মাড়াই। কেউ কাঁধে, কেউ বাহকে করে পাকা ধান এনে উঠোনে ফেলছে। এরা কেউ গেরস্থ কৃষক নয়, পরের ভূঁইয়ের বর্গাচাষী।
মাটির রাস্তা লাগোয়া বেশিরভাগ বাড়ির ধান মাড়াইয়ের পরে খড়কুটো মেলে রেখেছে পথে। অজমল খান, অধরা খড়কুটো মাড়িয়ে পৌঁছায় প্রান্তের শেষ বাড়িতে। উঠোনের ওপর দিয়ে হেঁসেলের দিকে যায় ওরা। হেঁসেল থেকে ধান ভাপানো ধোঁয়া উড়ে আসে। পরিমল মুন্ডা রোমেলা বলে ডাকে। বসতে দেবার কথা বলে। রোমেলা পরিমল মুন্ডার স্ত্রী, এই গ্রুপের নিয়মিত মহিলা সদস্য এবং সভানেত্রী।
অধরার মনে পড়ে একদিন পরিমল মুন্ডার কাছ থেকে রগচটা ব্যবহার পেয়েছিল। গাছ থেকে পড়ে কোমর ভেঙে পড়েছিল বারান্দায়। স্ত্রী রোমেলা উঠোনের পেঁপে গাছের দু’তিনটি আধপাকা পেঁপে আর কয়েকটা হাঁসের ডিম ওপাড়ায় শিকদার বাড়িতে বেঁচে কিস্তির টাকা জোগাড় করেছিল। করিম শিকদার এ এলাকায় বিত্তবান লোক। গ্রামবাসির উৎপাদিত সেরা সবকিছু লুফে নেয় নগদ টাকায়। আর একদিন রোমেলা তার ঘরে তোলা একটা কাঁসার বাটি অধরার সামনে সস্তায় বেঁচে দিয়েছিল করিম শিকদারের বউ’র কাছে। অর্থ-সম্বলহীন এ সদস্য কিস্তি খেলাপি করেনি বলেই অধরা পুনরায় সুপারিশ করেছিল রোমেলাকে বড় ঋণ দিতে। রোমেলা এখন শুধু নিজের নামে নয়, আরও বহু সদস্যর নামে ঋণ তোলে।
উনুনের ভেতরের গোবরখড়ির আগুন আরেকটু খুঁচিয়ে উসকে দিয়ে উঠে আসে রোমেলা। বারান্দায় মাদুর পেতে দিয়ে বসতে বলে।
‘আপা কী খবর?’
‘এসব কী কথা কানে আসে?’
আজমল খানের জিজ্ঞাসা।
রোমেলা ওর স্বামী পরিমলের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে উত্তর দেয়,
‘দ্যাকেন ছার, আপনাগের কেডা কী কয়েছে জানিনে। আমি নিজে থেকে বলতিছি। আমার স্বামী টাকা নিয়ে পলায়ে যাচ্চে না। তার মেরুদন্ডতে মারাত্মক সমস্যা। চিকিৎসার জন্যে ইন্ডিয়া যাওয়া লাগবে। করিম শিকদার যোগাযোগ কইরে দেচ্ছে বলে সুবিধি। তার সাথে শহরের বড় অপিসারেগের ভালো জানাশোনা। নানাজনে নানাকতা রটায় দেছে। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমাগের মনে কোনোরকম ধানাইপানাই চালাকি নেই। ঋণ নিছি ঋণ শোধ কইরে দোবো। পইস্কার কতা।’
এই কথা বলে রোমেলা হেঁসেলে ঢোকে। পাতিল ভর্তি গরম ভাপানো ধান বাইরে নিয়ে আসে। উঠোনের কোণে জলভরা নান্দায় ঢালে। এরইমধ্যে আরও কয়েকজন সদস্য জড়ো হয়েছে রোমেলার উঠোনে। রায়লা, তরাবুন্নেছা, আম্বিয়া, রমেছা, মুশতারি, তহুরা, জামিলা। ওদের মধ্যে আলাপ চলে,
‘আজ কিস্তির টাকা দেয়নি কে? আগের সপ্তাহে তো তহুরা খেলাপি কইরেলো।’ রমেছা বলে এ কথা।
তহুরা তৎক্ষণাৎ রমেছার দিকে মুখ বাড়িয়ে জবাব দেয়,
‘আইজগের দু’সপ্তার কিস্তি একসাথে শোধ করলাম। এক সপ্তা ধরে বিলে যাইয়ে লোকের ধান কাটা ভুঁইতে খুঁটে খুঁটে ধান জোগাড় করিছিলাম। তাই ব্যাচলাম কালগের হাটে। তার থেকে কিস্তির টাকা বাঁচায়ে এক সের গুড় কিনেছে তোমার দুলাভাই।’
‘আমাগের কর্তাও কালগের হাটে ধান বিক্কির করে সুমিতির টাকা দেছে। আর দুটো টিকিট কেটেছে যাত্রা দেখতে যাবার। পত্তম দিন নাকি চমক আছ।’ বলল তরাবুন্নেছা।
‘যাত্রা দেখতি যাবি?’ জামিলার প্রশ্ন।
‘হ্যায়, ইকিন থেকে গিয়ে আমিও সুক্কাল সুক্কাল রান্দা শেষ করবো। বিকেলে সেজে-গুঁজে থাকতে কয়েছে তোর মিঞা ভাই।’
‘আমারও একই কতা। পত্তমদিন ঢুকতি পাল্লি ভাল্লাগ তো। তেবে আমাগের ধান হাটে তুলতি তুলতি আরেক সুপ্তা। আমরা শেষের দিকে যাব যাত্রায়।’ বলল আম্বিয়া
‘শিকদার চাচার চেষ্টায় যাত্রাপালা আমাগের গেরামে আসলো। সাতদিন ধইরে চলবে যাত্রা। অত তাড়াহুড়ো কীসের!’

আজমল সাহেব মাদুর থেকে উঠে পরিমল মুন্ডার চৌকিতে বসে। গলার স্বর নামিয়ে কী যেন আলাপ-পরামর্শ করছে। অধরা এদের যাত্রা দেখা বিষয়ক আলাপ শোনে আর ভাবে এদের হাজার হাজার এমনকি লক্ষ লক্ষ টাকা ঋণ নেবার ফলাফল কী!
আর ভাবছে, ঘরে ঘরে ধান ওঠা যেমন এদের আনন্দের ব্যাপার, সচ্ছলতার বিষয়; তেমনি দুদিনেই তা লুফে নেবার জন্য এমনতর যাত্রাপ্যান্ডেল যথেষ্ট। সারাবছরের খোরাকে ঘাটতি এলেই এদের নতুন ঋণে আবদ্ধ হওয়ার পথ সৃষ্টি হয়ে যায়।

ধানের কথা মনে হতেই বাড়ির কথা মায়ের কথা মনে পড়ে অধরার। সন্ধ্যা পেরিয়েছে। আজমল খান উঠোনে নেমে ফেরার কথা বলে অধরাকে। অধরা জানতে চায়, ‘কী সমাধান হলো?’
আজমল খান উত্তর দেয়, ‘অফিসে গিয়ে শুনবেন।’
অধরাও ভাবে অন্ধকার বাড়ছে, দেরি না করাই ভালো।

পিচ রাস্তায় উঠে বাইকের গতি বাড়ায় আজমল। চারপাশের অন্ধকার যতটা না ঘনিয়েছে, অধরার ভাবনার গভীরে তারও বেশি নিমজ্জিত। কী ধরনের সমাধান হলো, আদৌ কোনো সমাধান হলো কি না! আজমল হঠাৎ বাইকের গতি ধীরে করে। পাশ ফিরে অধরাকে প্রশ্ন করে, ‘আমার যে কোনো সিদ্ধান্তে আপনি পাশে থাকবেন তো?’
অধরা কথার মানে বোঝে না। তবে সহজভাবে ধরেই নেয় ঋণবিষয়ক অফিসিয়াল ঝামেলা। আজমল অধরার নীরবতা ছাড়া আর কোনো জবাব পায় না এ মুহূর্তে। ঠান্ডা বাতাস আর ঘনিভূত অন্ধকার ভেদ করে বাইক ছুটে চলে।

পরদিন অধরা অফিসে বসেই দুপুরের দিকে মিন্টুর ফোনে জানতে পারে কাদাপুর গ্রামে রোমেলা তার স্বামীসহ নিরুদ্দেশ। উঠোনে সেদিন যারা ছিল : রায়লা, তরাবুন্নেছা, আম্বিয়া, রমেছা, মুশতারি, তহুরা, জামিলা ওদের সাতজনের নামে তোলা ঋণের সম্পূর্ণ টাকা শুরু থেকে মূলত রোমেলাই নিয়ে থাকে। তবে রোমেলার নিখোঁজের সংবাদে ঐ সদস্যরা গা-ঢাকা দিয়েছে, রেজিস্টারে নাম অনুযায়ী ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায় তো তাদেরই।

একে একে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসছে। শোনা গেল রোমেলার ভিটেমাটির প্রকৃত মালিক করিম শিকদার। রমেলা এদের আশ্রিত। এদের জমিজিরাত দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত। বলা যায় শিকদার বাড়ির পারমানেন্ট কামলা। এমনকি গ্রামের অন্য সব মহিলা সদস্যরাও তোঁয়াজ করে চলে শিকদারকে। ওদের সুবিধা-অসুবিধায় বিপদে-আপদে শিকদার এটা ওটা উপকার করে থাকে। ধর্মপ্রাণ সমাজসেবক হিসেবে এলাকায় বিশেষ খ্যাতি আছে তার।

অধরার ডাক পড়ে আজমল খানের রুমে। তাৎক্ষণিক মিটিং। সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমে যাচাই-বাছাই না করে ঐ মহিলাদের সদস্য করে নিয়ে ঋণ প্রদানের ফলে অরগানাইজেশনের অপূরণীয় ক্ষতিতে অধরার সাময়িক সাসপেন্ড। যথাযথ কারণ দর্শানো কথা উল্লেখ করে চিঠিও দেওয়া হয় অধরাকে। পুরো বিষয়টি অধরার কাছে ধোঁয়াশা লাগে। নিজের টেবিলে এসে অধরা ভাবে, ঋণ খেলাপির সম্পূর্ণ দায় অধরাকে কেন দেয়া হলো! এ তো অন্যায়!

হঠাৎ মেসেজ টোন শোনে অধরা। ওপেন করতেই দ্যাখে, ‘টেনশন করবেন না। আমি আছি। প্রতিষ্ঠান মানবিক বিচারে মহিলাদের প্রতি খুব বেশি কঠিন হবে না। তাছাড়া আপনার চাকরি বহাল রাখার ব্যাপারটি আমি দেখবো। যদি চান আপনার সব দায়িত্ব আমার।’ আজমল খানের মেসেজ! এটা কি সমবেদনা! নাকি করুণা এবং অপমান! টেনশনের পরিবর্তে বিস্মিত অধরা। চাকরি না থাকা যতটা দুঃশ্চিন্তার কারণ, ওর কাছে মেসেজটা তার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এ মুহূর্তে।
বিকেলে অফিস টাইম শেষ প্রায়। বেশিরভাগ কর্মী টেবিল ছেড়েছে। ইতোমধ্যে অধরাও গুছিয়ে নেয়। বের হওয়ার আগে প্রোগ্রাম ম্যানেজারের রুমে সবাই সৌজন্য বিদায় জানায়। বরাবরের মতো অধরাও ঢোকে। সবার সামনে হাতের ভাঁজ করা কাগজটা এগিয়ে ধরে আজমল খানের সম্মুখে। পাশ থেকে মিন্টুর আস্তে স্বরের কথাটা অধরার কানে পৌঁছায়, ‘কারণ দর্শানোর পত্রটা এত দ্রুত হয়ে গেল! যাক, সাসপেন্ড দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না তাহলে।’
অধরা বোঝে সমস্যাটা দ্রুত সমাধান হবার সম্ভাবনায় সহকর্মীরা স্বস্তি পাচ্ছে। কিন্তু আজমল খান কাগজের ভাঁজ খুলেই হতচকিত! অব্যহতিপত্র! সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। আজমল খান অধরাকে বলে, ‘আপনাকে তো সময় দেওয়া হয়েছে। আরেকটু ভাবলে হতো না!’
অন্যদিকে তাকিয়ে আজমলকে উদ্দেশ্য করে অধরা দৃঢ়কণ্ঠে বলে, ‘আপনার পাঠানো মেসেজ আমাকে সাহায্য করেছে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে। আমার দায়িত্ব আমি তাকেই দেবার কথা ভাববো, যে নিজের দায়িত্ব নিজেকে দিতে পারে।’

Facebook Comments Box