ঈদ সাময়িকী ॥ ছোটোগল্প

এভাবেও প্রাণ জেগে ওঠে

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২০ | ৬:২২ অপরাহ্ণ | 295 বার

এভাবেও প্রাণ জেগে ওঠে

॥ শ্রাবণী প্রামানিক ॥

চোখটা যেন আটকে গেল ওর চিকন এলিয়ে থাকা কালো ফিতায় আর কাকচক্ষু রঙে! জৌলুস সেই একই আছে!
ভেবেছিলাম এবার টুনিগুলো জ্বলবে না দোকানে দোকানে। এত রং কোথায় মানুষের মনে?
আরও দুই দিন বাকি আছে। কিন্তু আজই আমার চিন্তার গোড়ায় ছাইচাপা দিয়ে উঁচু উঁচু দোকানগুলো বাহারি আলোয় জ্বলে উঠেছে।
খুব জোরে হাঁটি আমি। আসলে হাঁটতে হয়। পাঁচটায় অফিস ছুটির কথা বলে চাকরি দিলেও, প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত কখনোই সাড়ে পাঁচটার আগে বের হতে পারিনি। অনেকদিন অনেকভাবে হিসাব করে দেখছি; এদিক- ওদিক করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হিসেব মিলিয়েও দেখেছি কিন্তু…! কিন্তু বিলাসিতা করে রিক্সায় চড়ার আশি টাকা বের করতে পারিনি। যদিও একেকদিন শরীরটা ছেড়ে দেয়, ভার ভার লাগে ব্যথাও করে পেটে বা মাথায়।

 

ছুটির পরে বের হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতেই কোনাে রিক্সাওয়ালার সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। বুঝি, এখনই চোখ সরিয়ে নেওয়া দরকার। পারি না। লোভে পড়ে যাই যে! সেও এগিয়ে আসে। কিন্তু চল্লিশ টাকার কমে যেতে রাজি করাতে পারি না কোনােভাবেই। হয়তো আরও একজন এগিয়ে আসে। কিন্তু আমিও ত্রিশ টাকার বেশি উঠি না। আমার জানা আছে, ত্রিশ টাকা কেন পঁয়ত্রিশেও কেউ যাবে না। আসলে রিক্সা যতই এগিয়ে আসতে থাকে, আমার ভেতরে ততোই অপরাধবোধ জাগতে থাকে। চাহিদার গলায় পা রেখে টিকে যেতে চাওয়া কয়েক জোড়া চোখে আমার চোখে ভেসে ওঠে।
আর দাম-দরের মাঝেই আমি ঠিক করে নেই; সামনের মোড়ের ফুটপাত থেকে এই চল্লিশ টাকায় বই অথবা এক পোয়া কাঁচকি মাছ কিনে নেবো।
হাঁটার সময় আমি রাস্তার দিকে কম তাকাই। দোকানের বাহারি জিনিস আর রাস্তার রং করা মানুষ দেখতে দেখতে কতক্ষণ হাঁটছি ভুলে যাই। শুধু জানি এইভাবে টানা হাঁটলে আমি আধা ঘণ্টায় ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে পারবো৷
আজকের কথা অবশ্য আলাদা। অফিস ছুটির সময় বোনাস হিসেবে একটা খাম পেয়েছি। ঈদ বোনাস। লকডাউনের দুইমাস বেতন কী জিনিস চোখেই দেখিনি। অনলাইন পত্রিকায় কাজ আমার। ঘর-বাহির সমান। অনলাইনের আবার ঘর আর অফিস কী! তাই প্রতিদিন নিয়ম করে ঘরের দরজা বন্ধ করে অফিস করে গেলাম। যেন একটু বেশি-ই করলাম। আমার অতিরিক্ত কাজ দেখে বেতনটা ঠিক দিয়ে দেবে; এই ভরসাটা ছিল। সব ভরসা ঘাটের জলে ধুয়ে গেলেও অফিস-আদালত খুলে দিতেই ছুটে এলাম। বস আমাদের জন্য এত চিন্তা করেন যে, বললেন— এরমধ্যে আর অফিসে সকলের আসার দরকার নাই। তুমি বাড়িতে থেকেই কাজ করাে।
আরে… আরে বলে কী? আবার বেতন না দেওয়ার পায়তারা?
বাড়িতে থেকে ভালো কাজ করা যায় না… নেট খুব স্লো এই সব বলে-কয়ে আমি সপ্তাহে ছয় দিন নিয়ম করে অফিস করা শুরু করে দিলাম। বসের তারিফও পেলাম। পেলাম, বেতনের বদলে বোনাস। আর পেলাম ছাঁটাইয়ের চিঠি।

 

মৌচাক মার্কেট পেছনে পড়ে গেল। লোকজন, দোকান-পসরা কিচ্ছু দেখতে ইচ্ছা করছে না।
আমি আরও জোর লাগাই হাঁটায়। তবুও আটকে গেল চোখ স্বচ্ছ কাঁচের ওপারে। আব্বার জুতাে! আব্বার সকাল শুরু হতো যার গন্ধে। ছোটাে কালো কৌটাটা থেকে একটু করে কালি নিয়ে জুতার মাথায় ঘসতেই থাকেন আব্বা। শরীর জোড়া বলিরেখা নিয়ে ক্লান্ত জুতােজোড়াও একসময় হাসতে বাধ্য হয় আব্বার কেরামতিতে। আব্বা হাসেন। আমরাও হাসি। হাসতে হাসতেই একদিন হোঁচট খেয়ে পড়লাম ওর কুচকুচে কালো গায়ে। টগবগে গরম পানি ভরা পাতিল পড়ে গিয়ে শব্দ হওয়ার আগেই আমার পা পুড়ে যাওয়া চিৎকার শুরু হলো। আব্বার জুতাের কালো রং ধুয়ে বলিরেখাগুলো চিরকালের মতো হা করে থাকলো।
সেই থেকে আমার পোড়া পা সূর্যের আলোয় ধোয়া হয়নি। আর? আর আব্বার পায়ে কালো চামড়ার জুতায় চিকন চিকন ফিতায় ফুল বাঁধা হয়নি।
সেই যে আব্বা জুতাে পরা ছাড়লেন!

আজ আমার পোড়া পা দু’টোর কানে তালা। বলছি সোজা হেঁটে চলো। কোনােদিকে তাকাবার জো নেই!
তবুও কেমন স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে কালো জুতােজোড়ার একেবারে পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
খামের টাকা উজার হয়ে গেল। জুতাের প্যাকেট আমার সাথে বাড়ি চলল।

হুইলচেয়ারের পাদানিতে বহুকাল পড়ে থাকা আব্বার জড়বস্তু পা কালো জুতোর খোলসে আজ প্রাণ ফিরে পেলো।

 

দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments