একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী এবং আত্মপ্রেম-আত্মস্তুতিতে মগ্ন কতিপয় অগ্রজ প্রকাশক

বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২০ | ১:১৭ পূর্বাহ্ণ | 386 বার

একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী এবং আত্মপ্রেম-আত্মস্তুতিতে মগ্ন কতিপয় অগ্রজ প্রকাশক

একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী এবং আত্মপ্রেম-আত্মস্তুতিতে মগ্ন কতিপয় অগ্রজ প্রকাশক

॥ খন্দকার সোহেল ॥

সম্প্রতি অগ্রজ প্রকাশক, সন্দেশ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনীর প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক লুৎফর রহমান চৌধুরীকে নিয়ে ফেসবুকে নিজের ওয়ালে তাকে নিয়ে প্রশংসাসূচক একটি স্ট্যাটাস লিখেছিলাম। এই স্ট্যাটাস ঘিরে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা জগতে মোড়ল মনে করা কতিপয় আত্মপ্রেমে মগ্ন, আত্মস্তুতিতে বিভোর অগ্রজ প্রকাশক বেশ নাখোশ হয়েছেন! সরাসরি আমাকে কিংবা কাছে-পীঠের বন্ধু-সহযাত্রী আরও কজন প্রকাশককে সেই স্ট্যাটাস নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়েছেন স্বয়ং যাকে নিয়ে সেই স্ট্যাটাস অর্থাৎ লুৎফর রহমান চৌধুরী নিজেও।

 

আজকের এই স্ট্যাটাস সেই আত্মপ্রেমে মগ্ন, আত্মমহিমা প্রচারকারী ও আত্মস্তুতিতে বিভোর তথাকথিত অগ্রজ প্রকাশকদের প্রতি অনেকটা খোলাচিঠিস্বরূপ-
আমরা যারা বয়সে তরুণ, আমাদের সময় এখন শেখার। শিখতেই চাই আমরা। কী শিখতে চাই? কাজ, ভালো কাজ, বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতটাকে আলোকিত করে তোলার কাজ। পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করে, একটি পেশাদার বুক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার কাজ। আমাদের সমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার কাজ। একজন প্রকাশকের প্রকৃত কাজ কী? কিংবা প্রকাশকদের পেশাদার বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর কাজ? কী শেখাচ্ছেন আমাদের সম্মানিত অগ্রজ?
একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বই বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। অনেকটা একক প্রচেষ্টায়। খুব বেশি মনে পড়ছে, প্রশিক্ষণ পরিচালক হিসেবে তার প্রথম সভাটি অনেকটা জোরাজুরি করে ডাকা হয়েছিল আমার অনুরোধে। কারণ আমি তখন সমিতির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক। সভায় কিংবা সভার বাইরে আপনাদের অনেকের মুখগুলো ভুলতে পারি না যারা হাসাহাসি করেছিলেন এই কর্মযজ্ঞ নিয়ে। ভোল পাল্টেছেন অনেকে। মুখোশপরা আপনাদের মুখগুলো আমাদের আজ বড্ড চেনা। আমার মতো অনেক অনেক অনুজের চোখেই আপনাদের মুখোশপরা মুখগুলো গাঢ় প্রসাধনীর আড়ালেও ফ্যাকাশে মনে হয় তাই আজকাল।
একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী পেরেছেন। খুব ভালোভাবেই পেরেছেন প্রশিক্ষণের কাজটি শেষ করতে।

ভিসা জটিলতা ও অগ্রজের পরামর্শ

সম্প্রতি ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার জন্য জার্মানীর ভিসা অ্যাপ্লাই করলাম। গতবছরও করেছিলাম। ভিসা মেলেনি। আমাদের অগ্রজ প্রকাশকদের অনেককেই [যারা একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণকারী] বিদেশি ভিসাসংক্রান্ত কোনো ব্যাপারে যখনই কোনো প্রশ্ন কিংবা জিজ্ঞাসা করেছিলাম হাইকোর্ট দেখিয়ে দিয়েছেন অনেকে। সোজা ট্রাভেল এজেন্সি। এবারই প্রথম পরামর্শ চাইলাম লুৎফর ভাইয়ের কাছে। ডেকে পরামর্শ দিলেন। ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখালেন। সাহস দিলেন। বললেন, ভিসা অ্যাপ্লাইটা নিজেই করো। একজন অগ্রজ হিসেবে একজন অনুজকে এই সাহস দেয়ার কাজটি কতবড়ো অনুপ্রেরণার হতে পারে যারা বাবা হয়েছেন, যারা সন্তানদের ছোটো ছোটো আবদার মেটান প্রতিমুহূর্তে তারাই কেবল কিছুটা টের পাবেন! লিডারশিপ, নেতৃত্বগুণ সুন্দর চেহারা কিংবা মঞ্চের মাইক্রােফোনে বাগাড়ম্বর করার মধ্যে নিহিত থাকে না। ফলোয়ার তৈরি করতে হয়। প্রজন্মকে কর্মদক্ষতা দিয়েই আপ্লুত করে তুলতে হয়।

আসাম বইমেলায় আমাদের অংশগ্রহণ ও আনন্দভ্রমণ

বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের দেশের বাইরে বইমেলা করার অভিজ্ঞতা বলতে ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা ও বাংলাদেশ বইমেলা কলকাতা। এর বাইরে খুব অল্পসংখ্যক প্রকাশক বইমেলা করতে আমেরিকা, লন্ডন, কানাডা ভ্রমণ করেছেন। তবে ভারতের বইমেলায় অংশগ্রহণের তালিকাটা দীর্ঘ। এই অভিজ্ঞতার বাইরে গতবছরই আসামে অনুষ্ঠিত একটি বইমেলায় বাংলাদেশের ১২টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করলাম। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সন্দেশ, নবযুগ প্রকাশনী, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ভাষাচিত্র, চারুলিপি প্রকাশন, র্যামন, অ্যাডর্ন, দিব্যপ্রকাশ, মূর্ধন্য, জয়তী প্রকাশন, মুক্তচিন্তা প্রকাশনী।
ভারতের সবুজবেষ্টিত মেঘালয়ের পাহাড়ঘেরা রাস্তা পেরিয়ে আমরা যখন আসামের পথে, আমাদের মাইক্রোবাসের তরুণ প্রকাশকদের চোখমুখে যে আনন্দধারা আমি দেখেছি তার তুলনা কেবলই আবিষ্কারের নেশায় ছুটে চলা নাবিকের সঙ্গেই মানানসই। পুরো মেলার আয়োজন, বিক্রির পরিমান এবং আতিথেয়তা সব মিলে একটি অবিশ্বাস্য আয়োজনের সঙ্গী হয়েছিলাম আমরা। আর এই আনন্দযজ্ঞের একমাত্র কৃতিত্বের দাবিদার একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী। আমার মতো এই টিমের বেশিরভাগ প্রকাশকের জীবনের প্রথম আসাম দর্শন এই বইমেলার হাত ধরেই।

আগরতলা বইমেলায় অংশগ্রহণ

আসামের পর লুৎফর ভাইয়ের হাত ধরে আমাদের নতুন আবিষ্কার ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় আয়োজিত বইমেলায় অংশগ্রহণ। সন্দেশ, নবযুগ প্রকাশনী, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ভাষাচিত্র, র্যামন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ আমরা বাংলাদেশের বেশ ক’টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমার মতো অন্য অনেকের আগরতলা যাত্রাও এই বইমেলাসূত্রে প্রথমবারের মতো রচিত হয়েছিল।

 

সর্বশেষ দিল্লি বইমেলায় অংশগ্রহণ

আসাম-আগরতলার পর লুৎফর ভাই যখন আমাদের দিল্লি বইমেলায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানালেন, আমরা সবাই শংকায়। কারণ দিল্লিতে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের সংখ্যা আমাদের জানা নেই। কিন্তু তিনি আমাদের অভয় দিলেন। রথ দেখা কলা বেচার কথাও বললেন হেসে। আর ভ্রমণপিপাসু আমাদের মন আনন্দে নেচে উঠল। অভয় বাণী দিলেন, বইও বিক্রি হবে। আয়োজকরাও কিছু কিনে নেবেন। সাহসী একদল তরুণ স্বপ্ন দেখলাম। রচিত হলো ইতিহাস। দিল্লিতে বাংলাদেশের একদল প্রকাশক অংশ নিলাম। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- সন্দেশ, নবযুগ প্রকাশনী, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ভাষাচিত্র, চারুলিপি প্রকাশন, মূর্ধন্য, জাগৃতি প্রকাশনী, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, জয়তী প্রকাশনী ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। বাংলাদেশের ১০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিল দিল্লি বইমেলায়। দিল্লির স্থানীয় প্রকাশক, পাঠকশ্রেণি ও ওখানকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমাদের প্যাভেলিয়নে এলেন। আমাদের অবাক করে দিয়ে বই প্রচুর বাংলা বই বিক্রি হলো দিল্লিতে। বইমেলা নিয়ে আমাদের চোখে যখন আনন্দঅশ্রু টলমল করছিল লুৎফর ভাই বললেন, তোমাদের সবাইকে নিয়ে আগ্রা যাব। আমাদের তরুণমন তখন আনন্দে উদ্বেলিত তাজমহল দেখার নেশায়। না নিজের অর্থখরচ করে নয় সম্পূর্ণ লুৎফর ভাইয়ের প্রচেষ্টায় একটি গাড়ি আমরা ঘোরার জন্য পেয়ে গেলাম। দেখা হলো তাজমহল। দেখা হলো আগ্রার রেড ফোর্টও। ঐতিহাসিক দিল্লিতে এই বইমেলাসূত্রেই আমরা আরও দেখার সুযোগ পেলাম হুমায়ুনস টম্ব, দিল্লি রেড ফোর্ট, কুতুব মিনার, মহাত্মা গান্ধীর সমাধি, ইন্ডিয়া গেট, দিল্লি জামে মসজিদ, নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগাঁ, অক্ষরধাম মন্দিরসহ অনেক অনেক ঐতিহাসিক জায়গা ও স্থাপনা।

এবং জার্মান এম্বেসির একটি সেমিনার

বইমেলার শেষ হবার পরদিন দিল্লিস্থ জার্মান এম্বেসির আয়োজনে একটি সেমিনারে আমন্ত্রিত হলাম আমরা। না, লুৎফর ভাই একাই আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সবাইকে সেই সেমিনারে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিলেন তিনি। টগবগ করা কতগুলো তরুণ প্রাণে তিনি আরও কিছু স্বপ্নের বিজ বপন করে দিলেন সেদিন। প্রকাশকমাত্র এবং তরুণপ্রাণ আমাদের প্রজন্ম শিখতে আগ্রহী। শেখার বয়সই আমাদের। লুৎফর ভাইয়ের কল্যাণে আমাদের স্বপ্নযজ্ঞে নতুন নতুন পালক যোগ হলো বেশ কয়েকটি; এবং তা অল্প কদিনের ব্যাবধানেই।

বয়সে তরুণ হলেও সৃজনশীল প্রকাশনার যাত্রাপথ একযুগ প্রায়। অগ্রজ অনেক প্রকাশককে পেয়েছি। সামনে থেকে পথ দেখাতে এসেছেন অনেকেই। আত্মপ্রেম, আত্মতৃপ্তি, আত্মভোগ, আত্মস্তুতি, আত্মমগ্নতা সর্বোপরি নিজস্ব পেটপুজো কিংবা প্রতিষ্ঠানপুজোর বাইরে এত অল্প সময়ে আমার মতো একদল তরুণ প্রকাশকের প্রাণে বই নিয়ে, প্রকাশনা নিয়ে, বইমেলা নিয়ে একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী যে প্রাণের সঞ্চার করে দিলেন আমাদের মন, মগজ আর মননে, তা আমাদের দেশে বিরল।
সস্তা রাজনীতি, কূটচাল, নির্লজ্জ স্বৈরতন্ত্র, অন্যের ক্ষতিসাধনের যে নিরন্তর চর্চা আমাদের চারপাশে তার বাইরে এসে সুন্দরের চর্চা, মেধা আর যোগ্যতার চর্চা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকাশনায় নতুনত্বের যোগ করা- এসব নিয়েই আলাপ-আড্ডায় মেতে ওঠেন একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী। আমাদের চোখটাকে ক্রমাগত বড়ো করতে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তরুণপ্রাণে আলোর ছটা জাগাতে নিরন্তর তার সহযোগিতার হাত প্রসারিত।
অন্য অনেক তথাকথিত অগ্রজ যখন চারপাশের সবকিছু গ্রাস করে পকেটস্ত করার পায়তারা করেন, স্বঘোষিত জনপ্রিয় নেতৃত্বের দোহাই দিয়ে অন্যের পেটে লাথি দেয়ার দুষ্টচক্র তৈরি করেন একজন লুৎফর রহমান চৌধুরী তখন নতুন প্রজন্মকে, তরুণ প্রকাশকদের ব্যবসায়ের নতুন নতুন পথ তৈরিতে সহযোগিতা করেন।
আর এসব কারণেই আবারও বলি, বারবার বলি, হাজারবার বলি, প্রিয় লুৎফর ভাই, প্রিয় অগ্রজ প্রকাশক আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন। আপনার হাত ধরে আমরা যেতে চাই আরও অনেকটা পথ। দুষ্টচক্র আর অশুদ্ধের ছায়া আপনাকে ছুঁয়ে যাবে না- তরুণ প্রকাশক হিসেবে এটাই আমাদের চাওয়া।
সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।


খন্দকার সোহেল
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক, ভাষাচিত্র
অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি

গতবছর ৫ অক্টোবর [৫ অক্টোবর ২০১৯] লেখাটি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছিলাম। একজন অনুজ হিসেবে একজন তরুণ হিসেবে বেঁচে থাকতেই একজন অগ্রজকে মাথা উঁচু করেই সম্মান জানিয়েছিলাম। কিন্তু সে সম্মান অনেকেরই সহ্য হয়নি। বেঁচে থাকতে এই দেশে প্রাপ্য সম্মানটুকু মেলে না। প্রিয় অগ্রজ হিসেবে লুৎফর ভাই অনেক অনেক কথা বলেছেন বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে। কী হয়েছে আর কত কী হতে পারতো, কেন হয়নি… কতশত কথা! হয়তো একসময় কিছু লিখবো। কিন্তু একজন অনুজ হিসেবে সরলমনা আর তার শিশুর হাসিটি দেখবো না আর কোনোদিন এটা ভাবতেই চোখের এক কোণে জল ছলছল করে ওঠে! ম্যাসেঞ্জারের মেসেজগুলো দেখি আর আক্ষেপ করি, হায় জীবন এত ছোটো ক্যানে?
কত কত প্ল্যান ছিল। ভারতের বাইরে বাংলাদেশের প্রকাশনা নিয়ে একটা বিশ্বব্যাপী পরিকল্পনা সাজিয়েছিলাম তাকে সামনে রেখে। কিন্তু বিধিলিপিতে তা ছিল না।
প্রিয় অগ্রজ, যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। আপনার ছোটো ছোটো অভিমানগুলো আর দেখবো না- এই ভাবলেও বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে!

Facebook Comments