যে বই লিখছি

মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৯ | ১২:৫৮ অপরাহ্ণ | 258 বার

যে বই লিখছি

ঊনসত্তর থেকে একাত্তর : শৈশবের সিঁড়িগুলো

॥ ॥

পদ্মাস্মৃতি

পুরানো চাল ভাতে বাড়ে। পুরানো দিন চোখ মোছে স্মৃতির সিঁড়িঘরে। শৈশবস্মৃতি মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যদিও অধিকাংশ মানুষ এর মূল্য বোঝে না; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শৈশবকে ভুলতে থাকে। আমার ক্ষেত্রে উলটোটি ঘটেছে। শৈশবের স্মৃতিই আমার আমার নির্ভেজাল স্মৃতি। তার কাছে বাকি সব স্মৃতি গৌণ।

পেছনে ফিরে তাকালে সবার আগে আমার মাকে মনে পড়ে। স্কুলের শুরুর দিকে কবি গোলাম মোস্তফার একটি কবিতা পাঠ্যপুস্তকে পড়েছিলাম, যার একটি পঙ্‌ক্তি ছিল, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’। যতই বয়স বেড়েছে কবিতাটির এই পঙ্‌ক্তিটিৌ আমার ভুল মনে হয়েছে। শিশুদের মনে বাবার চেয়ে মায়ের জন্য বেশি টান থাকে। কতটা টান থাকে, তা আমি সিক্সে উঠে গাঁবরগাঁতি নামের একটি দূরের গ্রামে গিয়ে বুঝেছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। সেকথা যথাসময় আসবে। তার আগে মা সম্পর্কে সামান্য দুটি কথা বলে নিই। আমার মা রাবেয়া সিরাজ লেখালেখি করতেন। বেশ কয়েকটি বইও আছে তার। আমার নিরক্ষরবেলায় তার ‘তিন কন্যার কাহিনি’র গল্পগুলো ভারি মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে মা ঘুম পাড়াতেন ছেলেকে। তাই, আমার অন্তরে বাবার চেয়ে মা ঘুমিয়ে ছিলেন বেশি। তার মানে, কবিমাত্রই ঠিককথা বলেন না। গোলাম মোস্তফাও ভুল বলেছিলেন।

মায়ের পরই পদ্মা নদীর কথা মনে পড়ে। পদ্মা ছিল আমার জীবনের প্রথম প্রেমিকা। রাজশাহীর পদ্মাই আমার শৈশবের পদ্মা। একসময় রানি ভবানীর পরগনা ছিল এই জনপদ। পুকুর ও দিঘি ছাড়াও সুপেয় পানীয় জলের জন্য বিখ্যাত ছিল শহরের ঢপকলগুলো। ঢপকল এখন কেবলই ‘হেরিটেজ’। ঢপকল ও টমটমের জন্য রাজশাহী বিখ্যাত ছিল। ছোটোদের কাছে মুড়কি, কদমা, কটকটি ও বাটা বিস্কুটের জন্যও।

রাজশাহী আমার জন্মশহর। এই শহরেরই কোথাও আমার নাড়ি পোঁতা আছে। অতি দূর শৈশবের কথা মনে হলে প্রমত্তা পদ্মার আছাড়িপিছাড়ি ঢেউ আমার মনের নির্জন ঘাটে নোঙর ফেলে। চোখ বুজলেই তার স্রোতঃস্বতী রূপ দেখতে পাই, যার কথা কবিকঙ্কন মুকন্দরামের কবিতায় আছে—
চণ্ডীর আদেশে ধায় নদ-নদীগণ
কলিঙ্গ দেশের সঙ্গে করিতে মিলন

প্রবলতরঙ্গা ধাইল পদ্মা

পদ্মার সেই ‘প্রবলতরঙ্গা’ রূপ দেখতে দাদুর হাত ধরে রোজ বিকেলে সাগরপাড়া থেকে বোসপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি ছুঁয়ে পদ্মার বাঁধে উঠতাম। ওঠার সময় বাঁধলগ্ন জমিদার বাড়ির সদরদরজায় বিশালাকৃতির দুই সিংহকে রক্তবর্ণ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার গা ছমছম করত। এই বুঝি তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর। ভয়ে দাদুর হাত শক্ত করে চেপে ধরতাম। দাদু বলতেন, ‘ওগুলো মাটির সিংহ; আগের দিনের রাজা-জমিদাররা মাটির বাঘ-সিংহ দেখিয়ে প্রজাদের ভয় দেখাত; চিড়িয়াখানা গিয়ে তোমাকে আসল সিংহ দেখিয়য়ে আনব একদিন।’

ছবির সিংহের পর মাটির সিংহ দেখলেও তখন পর্যন্ত আমি আসল সিংহ দেখিনি। তবে, আসল পদ্মার অপরূপ ঢেউ দেখেছি প্রথম শৈশবেই। প্রথমে পিতামহের হাত ধরে; পরে পিতার। একসময় বন্ধুদের অথবা আমার পিঠাপিঠি ছোটোবোন মুন্নীকে নিয়ে পদ্মাপারে গিয়েছি। পদ্মায় তখন ঢেউয়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলত রোদ। রৌদ্রঢেউয়ের এই লুকোচুরি দেখে মুন্নী ও আমি ভাবতাম, ও বুঝি ইলিশের ঝাঁক। ভুস করে উঠেই চারপাশে বৃত্তাকার তরঙ্গ তুলে ডুব দেওয়া শুশুক দেখলে আমরা দুজনই আানন্দিত হতাম। পদ্মায় দেখা এই জলজ প্রাণীটি ছিল আমার শৈশবের অন্যতম বিস্ময়। এখন আর বাংলার নদ-নদীতে শুশুক তেমন চোখে পড়ে না। দূরের বন্দর থেকে আসা মহাজনি নৌকাগুলোও না। আগে পদ্মার যেখানে থইথই পানি ছিল, এখন সেখানে ধূ ধূ বালিয়াড়ি। শহররক্ষায় নির্মিত বাঁধের ওপারেও বেশ অনেকদূর অব্দি মানুষের ঘর-বসতি।

রবি ঠাকুরের ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’ কবিতাটি প্রথম যখন শুনি, মনে হয়েছিল, এ আবার কেমন নদী? নদীতে কখনও হাঁটুজল থাকে নাকি? কোনও কোনও বর্ষায় পদ্মার জল বাঁধ উপচে আমাদের শহরে ঢুকে পড়ত। সেই জল ভাসিয়ে নিত পাড়ার রাস্তা-পুকুর আর বসতবাড়ির উঠোন। বড়োরা তাতে উদবিগ্ন হলেও আমরা ছোটোরা খুশি হতাম। গামছা, লুঙ্গি পলো, খলুই— যার যা আছে— তাই নিয়ে মাছধরার উৎসবে মেতে উঠতাম পাড়ায়। কেউ কেউ খালি হাতেই ধীবর সাজত। পদ্মার ইলিশ না পেলেও প্লাবিত পুকুর-দিঘির সব ধরনের মাছই ধরা দিত আমাদের ফাঁদে। সেই ধীবরগন্ধাছেলেবেলা সার্বিক অর্থেই মাছেভাতে বাঙালির ছেলেবেলা ছিল।

একসময় যেখানে সিংহদরজাওয়ালা রাজবাড়িটি ছিল, সেখানে এখন ‘শাহ মখদুম কলেজ’। বালুর কঙ্কাল ফেলে শীর্ণদেহী পদ্মা অনেক দূরে সরে গেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নদীশাসনের ফলে। নদীশাসনে নিজেরাও আমরা কম যাই না। আছে নদীদূষণ-নদীদখলও। কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের ‘প্রবল তরঙ্গা’ পদ্মার পরিবর্তে রবি ঠাকুরের ‘আমাদের ছোটো নদী’ই একালের শৈশবের ভরসা। বৈশাখ মাসে কোথাও কোথাও তার হাঁটুজলও থাকে না।