পাঁচটি প্রশ্ন

উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমি সমাজের অসংগতি তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী : চাণক্য বাড়ৈ

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০ | ১১:৫৪ অপরাহ্ণ | 590 বার

উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমি সমাজের অসংগতি তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী : চাণক্য বাড়ৈ

দেশের বইয়ের একটি নিয়মিত আয়োজন পাঁচটি প্রশ্ন। লেখক-প্রকাশকের কাছে বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নগুলো করা।

আজকের পাঁচটি প্রশ্ন আয়োজনে আমরা মুখোমুখি হয়েছি তরুণ লেখক চাণক্য বাড়ৈ-এর

 

 

প্রশ্ন ১। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
উত্তর : আমার প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো; উত্তেজনাকর। আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০১২ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। অনেকের মতো আমারও একটা দুশ্চিন্তা ছিল প্রকাশক পাব কি না, তা নিয়ে। আমার বন্ধুদের প্রায় সবারই তত দিনে বই প্রকাশিত হয়েছে। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। বলে রাখি, আমার প্রথম বই ছিল কবিতার। প্রকাশনী সংস্থা ঐতিহ্য প্রতিবছর নবীন কবির প্রথম বইটি প্রকাশ করার দায়িত্ব নেয়। আমার তখনকার কলিগ কবি শতাব্দী কাদের আমাকে পাণ্ডুলিপিটি ঐতিহ্যে জমা দিতে বলেন। তাঁর কথা ও সহযোগিতায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাণ্ডুলিপি জমা দিই। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ঐতিহ্যের স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম নাঈম ভাই আমাকে ডাকেন। একদিন ঐতিহ্যের কার্যালয়ে সদাহাস্য, সদালাপী নাঈম ভাইয়ের সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথা হয়। আমি ২০০১ সাল থেকে প্রায় সব দৈনিকে নিয়মিত লিখেছি। এছাড়া মাসিক ‘কালি ও কলম’ এবং বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘উত্তরাধিকার’-এও আমার লেখা একাধিকবার ছাপা হওয়ার সূত্রে আগে থেকেই আমার সম্পর্কে নাঈম ভাইয়ের একটা ধারণা ছিল। তিনি আমাকে জানালেন, পাণ্ডুলিপিটি পাঠ শেষে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ঐতিহ্য এটি বই আকারে প্রকাশ করবে। নাঈম ভাই রহস্য করে বললেন, বইয়ের জন্য আপনি দুটি নাম প্রস্তাব করেছেন। দুটো নামই কি রাখবেন? তখন আমি বললাম, দুটো নামই পাণ্ডুলিপিটির জন্য উপযুক্ত। এর মধ্যে আপনি যেটাকে বেছে নেবেন, সেটাই এর নাম হবে। যা-ই হোক শেষ পর্যন্ত বইটি ‘পাপ ও পুনর্জন্ম’ নামে প্রকাশিত হলো। শিল্পী গৌতম ঘোষ চমৎকার একটা প্রচ্ছদ এঁকে দিলেন। নাঈম ভাইও খুব পছন্দ করলেন। মেলার দ্বিতীয় দিন থেকেই স্টলে জায়গা করে নিল ‘পাপ ও পুনর্জন্ম’।

 

প্রশ্ন ২। লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলো?
উত্তর : এই প্রশ্নের উত্তরটা বেশ কঠিন। যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, কেন আমার সমুদ্র দেখতে ভালো লাগে? অথবা ফুলের বনে কাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে হেমন্তের চন্দ্রালোকিত রাত? তার কী জবাব দেব আমি? ঠিক এমনই, লেখালেখির ইচ্ছেটা যে কেন হলো, তার সঠিক উত্তর আমার নিজের কাছে নেই। তবু, যদি বলতেই হয় তাহলে বলব, নিজের ভেতরের অভিব্যক্তিগুলো মুক্তি দেওয়ার যতগুলো মাধ্যম আছে, তার মধ্যে লেখালেখিকেই তুলনামূলক কার্যকর বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। আর ছোটবেলা থেকেই ক্লাসিক সাহিত্য পড়ার প্রতি তীব্র একটা আকর্ষণ আমার ছিল। ক্লাসিক সাহিত্যের একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তা মানুষের অন্তর্লোককে জাগ্রত করে তোলে। হয়তো তারই একটা প্রভাব ছিল। মানুষমাত্রই তো নিজেকে প্রকাশ করতে পছন্দ করে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আমার মনে হলো, সে জন্য লেখালেখি হবে আমার সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম।

 

প্রশ্ন ৩। লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
উত্তর : খুব উল্লেখযোগ্য ঘটনা নেই। তবে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, আমার প্রথম বই যে বছর প্রকাশিত হলো, সেবার জানুয়ারি মাসে দৈনিক ইত্তেফাক সাহিত্য সামিয়কী একটা আয়োজন করল, যেখানে প্রথম বই বের হচ্ছে, এমন চারজন তরুণ কবির চারটি কবিতা, কবিতা ভাবনা আর কবির ছবি ছাপা হবে। তখন ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতা দেখতেন গল্পকার রাজীব নূর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মাইনুল শাহিদ। একদিন মাইনুল ভাই আমাকে ফোন করে তার পরিচয় দিয়ে বই প্রকাশের অগ্রগতি ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তারপর বললেন, আপনার ৫/৬টি কবিতা, ৩০০ শব্দের মধ্যে কবিতা-ভাবনা, বইয়ের প্রচ্ছদ আর আপনার ছবি পাঠিয়ে দিয়েন। আমরা একটু দেখতে চাই। পরদিন আমি পাঠিয়ে দিয়ে মাইনুল ভাইকে ফোন করলাম, তিনি মেইল পেয়েছেন কি না, তা জানতে। তিনি আমাকে প্রাপ্তিস্বীকার করলেন। স্বাভাবিকভাবেই তখন আমার একটা কৌতূহল ছিল, এগুলো তাঁরা কেন নিলেন, তা জানার। কিন্তু তিনি কিছুতেই আমাকে বললেন না। বললেন, রাজীব ভাই জানেন। আমি শুধু আপনাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছি। এর পরের শুক্রবার সাকলেই আমার ঘুম ভাঙল একজন আগন্তুকের দরজা নক করার শব্দে। আগন্তুক আমার বন্ধু, কবি অথির চক্রবর্তী। হাতে একটি পত্রিকা। আমাকে বলল, এই দেখ, তোর বই বেরোনোর আগেই বইয়ের কবিতা পড়ে ফেলেছি। আর তুই তো ছবি তুলতে চাস না, সেদিন বনানী রেলস্টেশনে যে ছবি তুলে দিয়েছিলাম, তা-ই ছাপা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, একটি জাতীয় পত্রিকার পৃষ্ঠাজুড়ে আমার ছবি আর লেখা। মনে মনে ভেবেছিলাম, হয়তো একটা কবিতা ওরা ছেপে দেবে বড় জোর। কিন্তু এত বড় জায়গা যে আমার জন্য দেবে তা আমি ভাবিনি। ঘটনাটি আমার কাছে বেশ স্মরণীয় হয়েই থাকবে।

 

প্রশ্ন ৪। বাংলাদেশে সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
উত্তর : বাংলাদেশের সৃজনশীল লেখালেখির ‘বর্তমান’ যে খুব ভালো তা আমি মনে করি না। কারণ, ভালো হলে ১৮ কোটি মানুষের দেশে বহু লেখকই এটাকে পেশা হিসেবে নিতে পারতেন। যেহেতু ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে থাকে বর্তমানের ওপর, সেহেতু এর ‘ভব্যিষৎ’ও যে খুব ভালো হবে, তা বলা যায় না। তবে হ্যাঁ, প্রযুক্তির এই দানবীয় আবির্ভাবকে যদি ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায় এবং আমাদের কূপমণ্ডূক মনোবৃত্তির পরিবর্তন করা যায়, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াবে। বর্তমান বিশ্বে ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, চিনের এমনকি পাশের দেশ ভারতেরও একজন লেখকের বই বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অনুবাদ বেরিয়ে যাচ্ছে এবং তা বিশ্ববাজারে বেস্টসেলার হচ্ছে। আমরা যদি বলি, আমাদের পাঠক নেই, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি হবে না, তাই সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষৎ নেই, তাহলে হবে না। পরিবর্তনের জন্য আমাদের নতুন নতুন আইডিয়া বের করতে হবে, প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে, বিশ্ব বাজারে বাংলা বইয়ের বাজার তৈরি করতে হবে। আমি মনে করি, লড়াইটা চালিয়ে যেতে পারলে এর সবই সম্ভব। শুধু দেশের ক্ষেত্রে যদি বলি, প্রত্যন্ত গ্রামের একজন পাঠক, যিনি অনলাইনে বা কারও মুখে একটা বইয়ের সন্ধান পেয়েছেন এবং সেই বইটি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, কত সহজ উপায়ে তার কাছে সেটি পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এইসব ক্ষেত্রে আমরা কতখানি সফল হতে পারছি, তার ওপর নির্ভর করছে আমাদের সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ। আমাদের লেখক-প্রকাশক-বিতরণকারী-পাঠকদের আরও পেশাদার হতে হবে। এই চারটি সংশ্লিষ্টজনদের আলাদা ও সমন্বিত প্রশিক্ষণ এবং পারস্পরিক বিনিময়েরও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। প্রকাশকেরা গুচ্ছ গুচ্ছ দল করে চেন শপের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে বইয়ের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলেও পরিবর্তন আসবে।

 

প্রশ্ন ৫। লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন?
উত্তর : লিখব। এটাই স্বপ্ন। কবিতা দিয়ে শুরু করলেও ‘কাচের মেয়ে’ এবং ‘জলমানুষ’ নামে দুটো উপন্যাস যথাক্রমে ২০১৯ ও ২০২০ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ভাষাচিত্র’ থেকে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমি সমাজের অসংগতি তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী। যদি একজন পাঠকেরও দৃষ্টিভঙ্গির সামান্যতম পরিবর্তন হয়, তাহলেই আমি সফল। ভবিষ্যতের পাঠক আমার উপন্যাসের মধ্য দিয়ে এই সমাজচিত্র দেখুক, বুঝতে চেষ্টা করুক, এটাই আমার চাওয়া। আর কবিতার ক্ষেত্রে শিল্পশুদ্ধতার প্রতি মনােযোগী হতে চাই। মূলত, উপন্যাস এবং কবিতায় নতুন ভাষা বা স্বর তৈরি করতে পারাই হলো আমার লেখালেখির ভবিষ্যৎ লক্ষ্য।

 

অনুলিখন : তাসলিমা তনু

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments