ঈদ সাময়িকী ॥ ছোটোগল্প

আরিফুর রহমান-এর ছোটোগল্প ‘ময়নামতি’

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০ | ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ | 350 বার

আরিফুর রহমান-এর ছোটোগল্প ‘ময়নামতি’

ময়নামতি
॥ আরিফুর রহমান ॥

ময়নামতি যমুনার পশ্চিমপারের কুখ্যাত সর্দারপাড়ার জসিম সর্দারের মেয়ে ছিলেন! মকবুল হোসেন খানের দাদা মশাই নাটোর থেকে ফেরার পথে খেয়া নৌকা মিস করে তাদের বাড়ি গিয়েছিলেন রাত্রিযাপনের জন্য।

 

 

বহুকাল আগের কথা।
আষাঢ় মাসের শেষ বিকেলে একজন অপরিচিত যুবককে তাদের বাড়ির উঠোনে উঠতে দেখে লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে অপলক তাকিয়েই ছিলেন ময়নামতি! অমন সুপুরুষ যে তিনি আগে কখনো দেখেননি! তার পলক যেন পড়ছিল না। নড়াচড়া করতেও যেন সায় দিচ্ছিল না তার মন। কিছুক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিলেন যখন আগন্তুক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাড়িতে বড়ো কেউ নেই খুকি? একটু ডেকে দাও।
তিনি মোটেই খুকি ছিলেন না, কিন্তু আগন্তুকের কণ্ঠে কী সুন্দর মানিয়ে গেছিল খুকি ডাকটা! ‘একটু ডেকে দাও’ হুকুমটা তাকে ধাক্কা মেরে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে বাধ্য করেছিল। আর তিনিও হুকুম পালনে ছুটছিলেন এ-ঘর ও-ঘর, আব্বা, আব্বা! কই আপনে?
অথচ জসিম সর্দারের মেয়েকে হুকুম দেয় এমন মানুষ ওই পাড়ায় তখন খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না!
জসিম সর্দার খুব অবাক হয়েছিলেন, মেয়ে তাকে ডাকছে! অবাক হয়েছিলেন বাড়ির অন্য লোকজনও। কারণ তার বাবার পেশা নিয়ে ঘোরতর আপত্তি ছিল ময়নামতির। আর সে-কারণে বহুদিন ধরে তিনি তার বাবার সাথে একটা কথাও বলে না!
ছোটোবেলা থেকেই তিনি তার নানার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতেন। বছরে দুয়েকবার দুচার দিনের জন্য বেড়াতে আসতেন বলে জানতেন না কিছুই। একবার ভরা শীতে, তিনি তখন প্রাইমারির শেষ পরীক্ষা দিয়ে ছুটিতে গ্রামে এসেছেন, বাড়িতে পুলিশ এসে জসিম সর্দারকে খুঁজে না পেয়ে খুব শাসিয়ে গেলে মা-কে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে তিনি জানতে পেরেছিলেন তার বাবার পেশা সম্পর্কে। তার বাবা জসিম সর্দার একজন ডাকাত! তারপর টানা তিনবছর ময়নামতি সর্দারপাড়ায় আসেননি!
অবশ্য কেন ময়নামতি সর্দারপাড়ামুখী হন না তা তার নানাবাড়ির কেউ জানতে পারেননি। তার অন্যতম কারণ ময়নামতি ছাড়া ওই বাড়ির সাথে সর্দার বাড়ির আর কারোর কোনো যোগাযোগ ছিল না! তার কারণও সেই ডাকাত জসিম সর্দার!
তিনি মনে মনে স্বীকার করেন যে, তাঁর জীবনের সেরা ডাকাতিটা তিনি করেছেন ময়নামতির মা-কেই!
বগুড়া শহরের উপকণ্ঠ থেকে একটি পরিবার দল বেঁধে যমুনায় নৌবিহারে এসেছিল। আনন্দ-উল্লাসে সন্ধ্যা পার হতে চললেও তাদের নৌকা পারে ফিরছিল না। এগিয়ে যাচ্ছিল সর্দারপাড়ার সামনের ডাকাতিয়া ঘাটের পাশ দিয়ে। মাঝি তাদের এই এলাকা সম্পর্কে সতর্ক করেছিল কয়েকবার, কিন্তু তারা কানে তোলেননি।
জসিম সর্দারের বাবা তখনও বেঁচে এবং তিনি আঁখখেতের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে থাকা তাঁর সাগরেদদের ইশারা করেছিলেন নেমে যেতে। জসিম সর্দাররা দ্রুতই নৌকাটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন।
আর্থিক দিক বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তাদের অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ নৌবিহারে আসা কারো কাছেই তেমন মূল্যবান কোনোকিছু পাওয়া যায়নি। তবে জসিম সর্দার পেয়ে গেছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ! মেয়েটিকে একপলক দেখেই তাঁর খুব ভালো লেগেছিল। তাই তিনি তাকেই তুলে নিয়েছিলেন নিজেদের নৌকায়। যদিও তাঁর হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল, কিন্তু ওটা ধরে রাখায় কোনো নির্মমতা ছিল না! তিনি অবাক হয়েছিলেন, মেয়েটি তেমন ভয় পায়নি কিংবা চিৎকারও করেনি!
পরদিন সকালে পাড়ার সবাইকে অবাক করে দিয়ে একদল পুলিশের সামনেই মেয়েটি তার বাড়ির লোকদের বলেছিল, এখানে আমাকে কেউ জোর করে আনেনি! আমি নিজের ইচ্ছাতেই এসেছি, আর ফিরে যেতেও চাই না!
রাতেই অবশ্য দুজনের বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল এবং তখনও মেয়েটা কোনো আপত্তি করেনি!
শেষরাতের দিকে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জসিম সর্দার জানতে চেয়েছিলেন, বুইঝলাম না, তুমি একবারও আপত্তি জানাইলা না ক্যা? ভয়ও ত’ সেরাম পাও নাই!
স্বামীর চওড়া বুকের জমিনে হাত রেখে ময়নামতির মা সেদিন বলেছিলেন, আপত্তি করলে আপনে খুশি হইতেন? …মেয়েরা ঠিক বুঝতে পারে কোনটা প্রেমিক পুরুষের স্পর্শ আর কোনটা ডাকাতের!
কি বুলছ? আমি ত’ ডাকাইত-ই!
হ, ডাকাত! ছাড়েন, ফজরের আযানের সময় হইছে।
সেই থেকে দুই বাড়ির মানুষের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না।

ময়নামতি একটু বড়ো হলে জসিম সর্দারের স্ত্রী একটা চিঠি লিখে যমুনার পারে দেখা হওয়া তাঁর এক বান্ধবীর সাথে ওকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বাপের বাড়ি। তাঁর বিশ্বাস ছিল বড়ো ভাই ময়নামতিকে ফেরত পাঠাবেন না। বিয়ের পর সেই প্রথম ওই বাড়ির সাথে সম্পর্কটা মেপে দেখবার সুযোগ তাঁর সামনে এসেছিল।
জসিম সর্দার অবশ্য কিছুটা আপত্তি জানিয়েছিলেন মেয়েকে ওখানে পাঠাতে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী তাঁকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, দেখেন, এখানে আশেপাশে একটাও স্কুল নাই। ওরে পড়ালেখা শিখাইতে হইবে না? আপনে কি চান এ-পাড়ার সব ছেলেমেয়েদের মতন আপনের মেয়েও অশিক্ষিত থাকুক? নাকি চান আপনের মেয়ে ডাকু রানী হয়ে দলের হাল ধরুক?
কি বুলছ? কিন্তু…
কোনো কিন্তু নাই। অনেক চেষ্টা করেও আমি আপনে রে এই পেশা ছাড়াইতে পারি নাই। আমি ফেল! কিন্তু আমি চাই আমাগো মেয়ে পড়ালেখা করুক। আমি ওরে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে চাই। সেটাই আমার জীবনের পাশ!
সত্যি সত্যিই তাঁর নিঃসন্তান বড়ো ভাই-ভাবী ময়নামতিকে পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন। ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন প্রাইমারিতে। সেখানে থেকেই ময়নামতি নিম্নমাধ্যমিক পাশ করে দুবছর আগে বাড়ি ফিরেছে এবং এসেই বাবার পেশা পরিবর্তনের জন্য খুব চেষ্টা চালিয়েছে। অবশ্য জসিম সর্দারের সাথে সরাসরি সে কোনো কথা বলে না!
শেষে মেয়ের অভিমান বুঝতে পেরে তিনি ধীরে ধীরে দলের দায়িত্ব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিলেন, আর বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন ছোটো ভাইয়ের ছেলেকে। সেই ছেলে আবার বছর খানেক ধরে ময়নামতি-কে মনে মনে পছন্দ করে এবং অপেক্ষায় আছে দলের সর্দার হয়ে গেলেই জ্যেঠাকে সরাসরি প্রস্তাব দেবে। ভেবে রেখেছে, সোজা কথায় কাজ না হলে প্রয়োজনে বাড়িতে রক্তের বন্যা বইয়ে দেবে!
তেমনই দিনগুলোর একটিতে সর্দার বাড়িতে পা রেখেছিলেন বড়ো খান সাহেব, মানে মকবুল হোসেন খানের দাদা মশাই।
বহুদিন পর মেয়ের ডাকে বাষ্পপূর্ণ হয়ে উঠেছিল জসিম সর্দারের দু’চোখ! পাষাণ হৃদয়ও গলে গেছিল হঠাৎ! চেহারার কাঠিন্য মুছে গিয়ে ফুটে উঠেছিল আবেগ! আর আগন্তুকের আশ্রয় প্রার্থনা বিনা বাক্য বেয়ে মঞ্জুর হয়েছিল।
জসিম সর্দার কখনো ভাবেননি তাঁর কাছে কেউ আশ্রয় চাইতে আসতে পারে। কারণ তিনি ডাকাতদের সর্দার! সর্দারপাড়া মূলত ডাকাতপাড়া! সেই পাড়ায় কোনো অপরিচিত মানুষ দূরে থাক আশেপাশের গ্রামের পরিচিত মানুষজনও ঢুকতে সাহস পেত না!
মাগরিবের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে বড়ো খান সাহেব জসিম সর্দারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এ-পাড়ায় মসজিদ নাই? আযান শোনা গেল না!
বহুবছর পর জসিম সর্দার লজ্জা পেয়েছিলেন, সত্যি তো এ-পাড়ায় একটা ওয়াক্ত মসজিদও তো নাই!
সারা পাড়ার লোকজন মাঝরাত অব্দি অতিথির কাছ থেকে দ্বীন দুনিয়ার কথা শুনেছিলেন। শুনেছিলেন দেশের মানুষের কষ্টের কথা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুফলের কথা।
পরদিনও অতিথিকে থাকতে হয়েছিল। কারণ সূর্যোদয়ের পরপরই পাড়ার কয়েকজন জসিম সর্দারের বাড়ির বাইরের উঠোনে মসজিদ নির্মাণের কাজে লেগে গেছিলেন। শনের ছাউনি ও পাটখড়ির বেড়া দিয়ে দুপুরের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেছিল সর্দারপাড়ার প্রথম মসজিদ!

কীভাবে যেন খবর ছড়িয়ে পড়েছিল আশেপাশের গ্রামে। ফলে সেই মসজিদ এবং সর্দারপাড়ার লোকজনের এমন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন ঘটানো মানুষটাকে দেখতে দু-তিন গ্রামের মানুষ এসেছিলেন একের পর এক, দল বেঁধে। বাদ আছর যে দলটি এসেছিল তার-ই একজন ভক্তিভরে বড়ো খান সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাবাজীরে ত’ দেখতে পীরসাবের মতােন লাগে! বাবা, আপনে কি পীর-এ-কামেল?
মনে মনে আঁতকে উঠেছিলেন বড়ো খান সাহেব, এই ধারণা তিনি কারোর অন্তরে জন্মাতে দিতে চান না!
বিদায় নিয়ে একটু পরই বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনি। যদিও বাদ জোহরই শেষ নৌকা ঘাট ত্যাগ করে গেছিল পূর্ব পারের দিকে। আর সবার থেকে বিদায় নেয়াও ছিল বেশ কষ্টকর। তবু তিনি হাঁটতে হাঁটতে যমুনার পারে এসে দেখেছিলেন ঘাটে কয়েকটি জেলে নৌকা। সন্ধ্যা মিলিয়ে যেতেই ওগুলো ভাসতে শুরু করবে নদীর বুকে।
রাতটা ওদের কোনো নৌকায় কাটিয়ে সকাল সকাল খেয়া নৌকা ধরবেন ভেবেছিলেন বড়ো খান সাহেব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। তক্ষুণি সর্দারপাড়ার একজন লোক দৌড়ে এসে তাঁকে জানিয়েছিল, তিনি ফিরে না গেলে সর্দারের বাড়িতে বড়ো কোনো অঘটন ঘটে যাবে!
বড়ো খান সাহেব মুচকি হেসে বলেছিলেন, কিচ্ছু হবে না। তুমি ফিরে যাও, আর তাকে বলো আমি এই ঘাটেই তার অপেক্ষায় থাকব।
লোকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কারে বুলব?
সে তুমি ও বাড়িতে ফিরে গেলেই বুঝতে পারবে।
জসিম সর্দারের বাড়িতে তখন তাঁর সমালোচনা করেছিল কেউ কেউ। বাপদাদার পেশা ছেড়ে হঠাৎ সবার সাধুসন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া পছন্দ হয়নি যাদের, তারাই চেষ্টা করেছিল জসিম সর্দারসহ ডাকাতদলের অন্যান্য সদস্যদের খেপিয়ে তুলতে।
শেষ পর্যন্ত ওদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। জসিম সর্দার হাতের ইশারায় সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, গায়ের শক্তি এবার ভালা কামে নাগাও বাহে।
কেউ একজন ক্ষোভ ঝেড়েছিল, আর আমাগো বাড়ির এক ছেমড়ি রে যে পাগলি করে থুয়ে যাইচ্চে তার বিচার হবি নে?
বিচার! হ, বিচার ত’ করাই নাগবি, তয় পরের না ঘরের মাইনষের!
তিনি বাড়ির ভেতরে ঢুকে ডেকেছিলেন, ময়নামতি, ময়নামতি!
ময়নামতি যে ঘরে বসে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলেন তিনি সেই ঘরে ঢুকতেই তাঁর স্ত্রী দুহাত প্রসারিত করে সামনে দাঁড়িয়ে গেছিলেন এবং বলেছিলেন, মেয়েটা সেই তখন থেকেই খালি কাঁদতিছে। আপনে ওরে বকাবকি করতে পারবেন না।
তুমি আমারে অতো বেরহম ভাবতিছ ক্যা? আমি অর সাথে কতা কইতি চাই। শুনি ময়না কী কয়।
ময়নামতি কাঁদতে কাঁদতেই বলেছিলেন, আপনে আমাকে অনুমতি দেন আব্বা, আমি তাঁর কাছে যাই।
পাগল হইছ মা! সে অচেনা যুবক, চইলা গেছে।
না আব্বা, তিনি আমার অপেক্ষায় ঘাটে বসে আছেন।
জসিম সর্দার বা তাঁর স্ত্রী, কেউ-ই মেয়েকে ঠিকঠাক চিনতে পাচ্ছিলেন না! ময়নামতি অন্যরকম স্বরে কথা বলছিলেন!
ময়নামতি-র মা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোকে কে বলল?
উত্তর বাড়ির কালু কাক্কুর ছেলে।
অথচ কালু মিয়ার ছেলেকে কেউ এ বাড়িতে ঢুকতে দেখেনি! সে ডাকাতিয়া ঘাট থেকে সোজা ওর বাড়িতে চলে গেছিল।
ময়নামতি-র মা সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেছিলেন। আর বাড়ির ভেতরের উঠোন থেকে কেউ কেউ বলেছিলেন, ঐ ছেমড়া কবরেজ, ময়না রে তাবিজ করিছে!
না রে কবরেজ না, যাদুকর! পাড়ার হগল রে যাদু করিছে!
হ হ, ঠিক! বড়াে কবরেজ ডাকা নাগবি। মন্ত্র কাটাইতে হবি।
জসিম সর্দার অবশ্য ওসব বিশ্বাস করেননি। তিনি বড়ো খান সাহেবের চোখে-মুখে অন্যরকম আলো দেখেছিলেন। দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিলেন, বড়ো কঠিন সিদ্ধান্ত!
চল মা, ত’রে নিয়া ঘাটে যাই।
ময়নামতির মা তাঁর হাত চেপে ধরে বলেছিলেন, কী বলছেন আপনে!
ময়নামতি আগের মতোই অন্যরকম স্বরে বলেছিলেন, ওনার ইচ্ছে আমি একলা যাই।
শেষ পর্যন্ত ময়নামতি একাই হাঁটা দিয়েছিলেন ঘাটের দিকে! ততক্ষণে মাগরিবের আযান শেষ হয়ে গিয়েছিল। কাউকে তার সাথে নিতে রাজি হননি ময়নামতি! শুধু শত নিষেধ স্বত্তেও পিছু নিয়েছিল তার চাচাতো ভাইটা। সে তার শেষ চেষ্টাটুকু করতে বদ্ধপরিকর।

ঘাটের কাছাকাছি গিয়ে তারা দেখেছিলেন তিনি নামাজ পড়ছেন। আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করেছিলেন তিনি।
ময়নামতি শেষ পর্যন্ত তার হাত ফসকে চলে যাচ্ছে দেখে চাচাতো ভাইটা মরিয়া হয়ে তার বাহুতে হাত দিতেই তিনি চোখ তুলে তাকিয়েছিলেন। আর সাথে সাথে কোত্থেকে এক ঝাপটা বাতাস এসে ধাক্কা দিয়ে ছেলেটাকে সাত-আট হাত দূরে ফেলে দিয়েছিল! অথচ চারপাশের পরিবেশ আগের মতোই শান্ত ছিল। আর ময়নামতির কেবল ঘোমটা খুলে গিয়ে চুলগুলো উড়ছিল।
ময়নামতি একটু ঘুরে অবাক চোখে একবার তার চাচাতো ভাইকে দেখে ফের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে পৌঁছে গেছিলেন মানুষটার কাছে!
সে রাতে আষাঢ়ে পূর্ণিমার জোছনায় ঝলমল করছিল যমুনার জল, আর তাতে ময়ূরপঙ্খি নায়ে পূর্ব পারের দিকে এগিয়ে চলেছিলেন বড়ো খান সাহেব ও ময়নামতি।
মাঝ নদীর একটা চর থেকে একজন হুজুর এবং আরও চারজন মানুষ উঠিয়ে নিয়েছিলেন বড়ো খান সাহেব। তাঁরাই সেই রাতে যমুনার জলে ভেসে চলা সেই নায়ে তাঁদের দুজনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন!
পরদিন সূর্যোদয়ের আগে আগে যমুনার জলের স্পর্শে ঘুম ভাঙলে ময়নামতি দেখেছিলেন তিনি তার স্বামীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছেন অচেনা একটি ঘাটে। লজ্জা পেয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। দেখেছিলেন, একটু দূরে বসে আছেন হুজুরসহ সেই চারজন।

এতবছর পর সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তির শংকায় টালমাটাল খান বাড়ি! আর তার আঁচ টের পাচ্ছে তালুকদার বাড়ির লোকজনও!
মকবুল হোসেন খান যখন ফোনে আকাশ তালুকদার-কে পেয়েছেন তখন ওরা যমুনার কিলোমিটার খানেক ভেতরে চলে গেছে। কাজী সাহেব লেখালেখির কাজও প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। তিনি পাত্র-পাত্রীর পরিচয় পেয়ে আঁতকে উঠেছিলেন এবং বিয়ের কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। অনুনয় করে বলেছিলেন, তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও। এ বিয়ে পড়ালে আমার অস্তিত্ব থাকবে না।
কিন্তু আকাশের বন্ধুরা তাকে বাধ্য করেছে।
শেষ পর্যন্ত নিতান্ত অনিচ্ছায় খাতা খুলে প্রয়োজনীয় লেখালেখির কাজ গুছিয়ে এনেছেন তিনি। তখনই মোবাইলে নেটওয়ার্ক চলে আসায় মকবুল হোসেন খানের কলটা এসেছে আকাশের কাছে। তিনি খুব রাগারাগি করলেও আকাশ খুব একটা ভয় পায়নি। কিন্তু তক্ষুণি অন্য একটা মহাবিপদ ওদের নৌকার গতিরোধ করে দিল। একদল ডাকাতের কবলে পড়ল ওরা!
ডাকাত দলের সদস্যরা নৌকার ছইয়ের ভেতর বিয়ের আয়োজন দেখে বেশ অবাক হলো। দলটির সর্দার অস্ত্র দেখিয়ে ধমকে ধমকে ওদের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা শুনল এবং জেনে নিল সকলের পরিচয়। তারপর কাজী সাহেবকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করল ছেলে-ছোকরাদের সাথে তিনিও তাল মিলিয়ে বিয়ে দিতে চলে এসেছেন বলে! ভয়ে কাঁপতে থাকা কাজী সাহেব একটা কথাও বলতে পারলেন না।
হঠাৎ ডাকাত দলটির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটি এগিয়ে এসে বললেন, সদ্দার, অগো দুই বাড়িরই এলাকায় খুব নাম ডাক আছে। তুমি চিনো কিনা, তয় আমি মাইয়াডার দাদা রে চিনি। অর দাদার বাপের বিয়াও হইছিল যমুনায়! এমুনি নাওয়ের ভিত্রে।
কী কও মে বাই? সর্দারের কণ্ঠে অবিশ্বাস।
হ সদ্দার, তোমার দাদা আর আমার দাদা সাক্ষী আছিল সেই বিয়ার! কয়বছর আগে যে চরডা নদী ভাইঙ্গা নিছে অতে তোমাগো আর আমাগো যত জমিজিরাত আছিল তার বেবাক অর দাদার বাপে দান করছিল।
হ মে বাই, মনে পরছে। দাদায় তারে খান সাব কইতেন। তিনি নাকি জ্বীন-ভূত পালতেন?
হ হ সদ্দার, অহন চিনছ।
দুটো নৌকারই ইঞ্জিন বন্ধ। দুটোই স্রোতে গা ভাসিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণে। আকাশদের নৌকার মাঝি ও তার সহকারীকে বেঁধে ফেলেছে ডাকাতরা। ভয়ে কাঁপছে ওরা। ওদের আশংকা ‘নায়ের সাতে জানডাও হারামু নাকি!’ ছইয়ের ভেতরে কাজী সাহেব, আকাশ, মনা বা আকাশের বন্ধুরা কেউই কোনো কথা বলবার সাহস পাচ্ছে না।
সর্দারকে কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছে। সে কাউকে উদ্দেশ্য না করে প্রশ্ন করল, তাইলে এগোরে নিয়া এহন কী করমু?
যেন অসীম আঁধারে হঠাৎ একটা আলোর রেখা দেখতে পেল আকাশ। সেই আলোয় নিজেদের মুক্তির সম্ভাব্য পথ খুঁজে নিতে সে সর্দারকে বলল, প্লিজ, আমাদের ছেড়ে দিন!
সাথে সাথে ধমকে উঠল সর্দার, চুপ হারামি! বাপ-দাদার ইজ্জতের ডুগডুগি বাজাইতে আইছস, তগোরে এম্নেই ছাড়মু? তর বাপের নাম কী কইলি তহন? দাদার নাম কী?
আকাশ চুপ করে রইল। ও খুব অপমানিত বোধ করছে। ওকে নিরুত্তর থাকতে দেখে ওর এক বন্ধু বলল, ওর বাবার নাম আতা তালুকদার। দাদা বাঘা তালুকদার, মারা গেছেন।
আতা তালুকদার, বাগা তালুকদার। বিড়বিড় করল ডাকাত সর্দার। তারপর গলা চড়িয়ে জলিমদ্দি নামের কাউকে ডাকল, অই জলিমদ্দি, পুবপারের কারোর নম্বর আছে? ফোন দে।
জলিমদ্দি নামের লোকটা ছইয়ের ভেতরে ঢুকে বলল, আমার শালার ভায়রা’র নম্বর আছে সদ্দার। অরে ফোন দিমু?
এর চায়া লম্বা লতা-পাতায় ইষ্টি আর নাই? হারামজাদা! দে, অরেই ফোন দিয়া ক’ তালুকদার বাড়ি’ত খবরডা পৌঁছায়া দেক। কইতে কবি, এরা আমাগো জিম্মায় আছে। আইসা নিয়া যাক। পুলিশের ঝামেলা হইলে এগো খুন কইরা ফালামু!
কিন্তু জলিমদ্দি ফোন করবার সুযোগ পেল না। তার আগেই তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল!

মনা এতক্ষণ ধরেই চুপ করে ছিল। ও কোনো কথা বলেনি বলে ওর দিকে কেউ মনোযোগ দেয়নি। কিন্তু সব দেখেশুনে ও ভেতরে ভেতরে খুব রেগে যাচ্ছিল।
‘খুন করে ফেলবে’ কথাটা শুনে মনার রাগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল আর সেই সাথে ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। তখনই শুরু হলো তাণ্ডব! মনাকে নিজের জায়গা থেকে এতটুকুও নড়াচড়া করতে হলো না। ও কেবল আগুন চোখে জলিমদ্দির দিকে তাকাল, সাথে সাথে সে নৌকার পাটাতনে পড়ে ছটফট করতে লাগল! হঠাৎ এমন ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গেল ডাকাত সর্দার। বয়স এখনো চল্লিশ স্পর্শ না করলেও এরইমধ্যে ছোটোবড়ো অনেকগুলো ডাকাতিতে নেতৃত্ব দিয়েছে সে। তার কোনো কোনোটায় আবার নির্মমতার কমতি ছিল না! তাতে একটুও ঘাবড়ায়নি, কিন্তু এমন ভূতুড়ে পরিস্থিতিতে সে কখনো পড়েনি।
সর্দার কিছু বলবার আগেই মনা তার দিকে তাকাল আর সাথে সাথে এক ঝাপটা বাতাস ধাক্কা মেরে তাকে নৌকার পাটাতনে ফেলে দিল!
ব্যথায় ককিয়ে উঠল সর্দার। মনা তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়েই আছে। তারপর কী ভেবে ছইয়ের পেছন দিকটায় তাকাল সে। ওখানে অস্ত্র হাতে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা পড়ে গেল উল্টো দিকে! এই ফাঁকে সর্দার ও জলিমদ্দি পড়িমরি করে ছইয়ের বাইরে বেরিয়ে গেল। ভেতর থেকে শোনা গেল সর্দার ঘড়ঘড়ে গলায় বলছে, বাঁচতে চাইলে এই নাও ছাইড়া দে!
আকাশে তখনই মেঘের আড়াল থেকে ক্ষণিকের জন্য বেরিয়ে এলো আষাঢ়ে পূর্ণিমার চাঁদ। মনা চোখ ফিরিয়ে দেখল জোছনায় ঝলমল করতে থাকা যমুনার জলে একটা নৌকা ছুটে পালাচ্ছে। কিন্তু তক্ষুণি ওটা ডুবে যেতে লাগল!
এসব দেখে আকাশ ও তার বন্ধুরা ভয়ে নীল হয়ে গেছে! কাজী সাহেব ক্রমাগত দোয়া-দরুদ পড়ছেন।
কেউই মনাকে চিনতে পারছে না। তাদের সামনে বসে থাকা মেয়েটা পরিচিত সেই মনা নয়! যেন অন্য কেউ!
হঠাৎ বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল। তুমুল বৃষ্টি!
যমুনার জলে বৃষ্টির ছুপ ছুপ ছুপ, ঝুপ ঝুপ ঝুপ শুনতে শুনতে শুয়ে পড়ল শ্রান্ত-ক্লান্ত মনা এবং সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল! ততক্ষণে যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন কাজী সাহেব। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, আল্লাহ রাসুলের নাম নিয়ে মেশিন ইস্টাট দেও মাঝি।
আর মনে মনে বললেন, বিয়ে পড়ানোর গুষ্ঠি কিলাই!

রাত দুপুর পার করে মনাদের নৌকা যখন ঘাটে ভিড়ল তখনও নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছে সে!
মেঘ মুক্ত আকাশ থেকে চাঁদও তখন জোছনা ঢালছে নিশ্চিন্ত মনে!
মকবুল হোসেন খান নৌকা থেকে ঘুমন্ত মেয়েকে নামিয়ে আনতে গিয়ে চমকে উঠলেন, ছইয়ের ভেতরের পুষ্পশয্যায় ঘুমিয়ে আছেন সতেরো কিংবা আঠারো বছর বয়সী তারই দাদী, মানে বড়ো মা, ময়নামতি!

 


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments