রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী

আমার রবীন্দ্রনাথ ‘একব্রহ্মাণ্ড আলোকের হাত’

শনিবার, ০৮ মে ২০২১ | ৭:২২ অপরাহ্ণ | 292 বার

আমার রবীন্দ্রনাথ ‘একব্রহ্মাণ্ড আলোকের হাত’

।। স্বপন পাল ।।

‘জীবনের শেষ লগ্নে ধর্ম, ঈশ্বর বা মানবতা কোনও কিছুতেই আর রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস ছিল না।’ এভাবেই সমাপ্তি টেনেছেন রবীন্দ্র-অনুধ্যায়ী লেখক সন্দীপন সেন তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ : ধর্ম ঈশ্বর এবং বিশ্বাস’ শিরোনামের এক আলোচনার। উক্ত আলোচনায় সন্দীপন সেন রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর বিশ্বাস থেকে আলোচনা শুরু করে ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনোভঙ্গি তুলে ধরে এক পর্যায়ে দেখাতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন মানুষে-মানবতায়। কিন্তু এখানেই থামেননি, তিনি বলেছেন যে, একসময় সেই বিশ্বাসও ভেঙে যায়। এর জন্যে নানা প্রসঙ্গ উত্থাপন করে শেষ করেছেন লেখার শুরুতে যে বাক্যটি উল্লেখ করেছি সেটি দিয়ে। এ ক্ষেত্রে তিনি তাঁর আলোচনায় কবি’র জীবনের সর্বশেষ কবিতাটাকে উল্লেখ করে সেখানে ব্যবহৃত ‘ছলনাময়ী’ বা ‘ছলনা’ শব্দটিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি লিখেন, ‘কবি ভেবেছিলেন তাঁর জীবনদেবতা-যাঁকে তিনি শেষ কবিতায় ছলনাময়ী বলে সম্বোধন করেছেন চাতুর্যের সঙ্গে তাঁকে প্রতারণা করেছেন, তাঁকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন এমন কোনো বস্তুতে বাস্তবে যার অস্তিত্ব নাই’। এরপর সন্দীপন সেন বলেছেন মূল কথাটি, ‘কী সেই বস্তু? সে বস্তু কি মানবধর্ম নয়?’ এমন সব কথার পরে স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন জাগে, এর মাধ্যমে সন্দীপন সেন মূলত কেমন বা কোন রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন? কারণ এর পরের স্তবকেই তিনি বলেছেন, ‘তাই যদি হয়, তবে তো রবীন্দ্রনাথের পক্ষে তা মর্মান্তিক ছিল।’ এ প্রেক্ষিতে কথাটিকে একটু এদিক-সেদিক করে বলা সঙ্গত যে, তাই যদি হয়, তবে তা তো পুরো মানবজাতির পক্ষেই মর্মান্তিক!

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সন্দীপন সেনের লেখার মনোযোগী একজন পাঠক বলেই দাবী করি নিজেকে। রবীন্দ্রনাথকে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে তাঁর অনেক লেখাই আমাকে সাহস জুগিয়েছে। এই লেখাটি প্রথমবার পড়ার পর থমকে গিয়েছি। সেটি কাটিয়ে উঠতে আরও কয়েকবার পড়েছি। না, তাঁর শেষ লাইনের সাথে রবীন্দ্রনাথকে মেলাতে পারিনি, আমিও মিলতে পারিনি। এটি বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, আমার এই লেখা কোনোভাবেই সন্দীপন সেনকে আক্রমণ করা কিংবা তাঁর বক্তব্য খণ্ডন করার জন্য নয়। এমন স্পর্ধা ও সাধ্য কোনোটাই আমার নেই! বছর দুয়েক আগে আমার লেখা রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি গ্রন্থ (অক্টোবর বিপ্লব ও রবীন্দ্রনাথ) প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটি তিন ভাগে বিভক্ত। এর এক ভাগের শিরোনাম ‘কেমন মানুষ রবীন্দ্রনাথ?’ সেই লেখাটিকে বিস্তৃত করা বা রবীন্দ্র-বিষয়ক ভাবনাকে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এই লেখাটি শুরু করি। এটি করতে গিয়ে হাতের কাছে রবীন্দ্র-বিষয়ক যত লিখা ছিল, সে সব পড়তে গিয়ে সন্দীপন সেনের লেখাটি পড়া হয়ে যায়। সত্যিই কি রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত মানুষ তথা মানবতার উপর আস্থা হারিয়েছিলেন!

 

যে কবিতা এবং যে কবিতার শব্দাবলী নিয়ে সন্দীপন সেন তাঁর লেখায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এমন একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রয়াস চালিয়েছেন, সেই শব্দকে ( ছলনা) নিয়ে রবীন্দ্র-অনুধ্যায়শীল সদ্য প্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষ কি বলেন সেটা একটু শুনে নিতে পারি। শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘হওয়ার দুঃখ’ পুস্তিকায় বলেন, ‘দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে আসে, তাকে যদি ছলনা বলে বুঝে নিয়ে মুখোমুখি হতে পারি তার, যদি জানি প্রতি পদে পদে আঘাত পেতে পারে আমার বিশ্বাস, তবে সেই ছলনা সইতে পারলে ভিন্নরকম শান্তির এক অক্ষয় অধিকার পেতে পারে কেউ’। এখানে ‘ছলনা’ কিন্তু সম্পুর্ন ভিন্ন এক অর্থে ধরা দিয়েছে। কোনোমতেই তা আমাদের ভাবনাকে মুহূর্তের জন্যেও বিশ্বাস ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় না। এর মধ্যে দিয়ে বরং নিজেকে জানার, সত্যকে চেনার একটা পথ খুঁজে পাওয়া যায়, বিশ্বাসের মনোভূমি আরও পোক্ত হয়।
রবীন্দ্রনাথ যে কবিতায় ‘ছলনা’ ও ‘ছলনাময়ী’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেই কবিতাটিতেও শব্দ দু’টির প্রয়োগ করে এর রূপকতার ব্যাখা দিয়ে বলেছেন যে,
‘সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।’
কবিতাটি শেষ করেছেন এই বলে যে,
‘অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার’
কাছাকাছি সময়ে লেখা অন্য একটি কবিতায়ও বলেছেন,
‘চিনিলাম আপনারে
আঘাতে আঘাতে
বেদনায় বেদনায়;
সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,
সে কখনো করে না বঞ্চনা।’
এর আগে ঊনাশিতম জন্মদিনে লিখেছিলেন,
‘সবচেয়ে সত্য ক’রে পেয়েছিনু যারে
সবচেয়ে মিথ্যা ছিল তারি মাঝে ছদ্মবেশ ধরি’

 

এমন উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে প্রচুর আনা যাবে। এতে করে লেখার কলেবর বৃদ্ধির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে যারা পড়াশোনা করেন, -তাদের বিরক্তি বৃদ্ধি করারও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এটুকু উপস্থাপন করা হলো এটি উপলব্ধি করার জন্যে যে, ‘ছলনা’ শব্দটি কোনোভাবেই নেতিবাচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি রবীন্দ্রনাথের লেখায়। এটাকে বড়জোর সত্যের ছদ্মবেশ বলা যেতে পারে।
অতীতে যেমন, এখনও রবীন্দ্রনাথকে নানাভাবে কখনো কখনো বিপরীতমুখী ভাবনায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। মূলত ‘কেমন মানুষ রবীন্দ্রনাথ’, এটার কথা বলতে গিয়ে কিংবা এর এর স্বরূপ খুঁজতে গিয়ে ‘কেমন রবীন্দ্রনাথ চাই’-এটিতেই বেশি জোর দেওয়া হয়। যে যার মতো করে রবীন্দ্রনাথকে গঠন করেন বা করার প্রয়াস চালান। এর জন্যে কি রবীন্দ্রনাথ দায়ী?

না, সরাসরি দায়ী বললে বিষয়টি যেমন শোভন হয় না, তেমন পুরোটা সত্যও বলা হয় না। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টি ও কর্মের (সংগীত, সাহিত্য, রাজনৈতিক-ভাবনা, ধর্ম-ভাবনা, শিক্ষা-ভাবনা ও সমাজকর্ম) এমন এক বিশাল জমিন রেখে গিয়েছেন যে, অনেকেই সেখান থেকে যার যতোটুকু প্রয়োজন, ততটুকু নিয়ে নিজের প্রয়োজনে নিজের মাপে ব্যবহার করেছেন-করছেন এবং এর মধ্যে দিয়ে যার যার মতো ফসল তুলছেন, তোলার চেষ্টা করেছেন। এটি যেমন রবীন্দ্রনাথকে বোঝার ক্ষেত্রে একটা জটিলতা তৈরি করে, তেমনি তা আমাদের জন্যে মঙ্গলকর নয় কোনোভাবেই। রবীন্দ্র গবেষক অনুরাধা রায় যেমন বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এখন রবীন্দ্রনাথ। কিছুদিন আগে পর্যন্ত কমিউনিজম তথা সমাজতন্ত্র ছিল বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার একদা কিছু সংঘাত হলেও পরে বেশ একটা সাযুজ্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি সমাজতন্ত্র অন্তর্নিহিত। বাঙালির এখন শুধুই রবীন্দ্রতন্ত্র।’ এখন অবশ্য রবীন্দ্রতন্ত্রও পরিত্যাজ্য, কেবলই ক্ষমতাতন্ত্র! যেটিকে বলিয়ান করতে চলছে ধর্মতন্ত্রের যথেচ্ছ প্রয়োগ। ক্ষমতাতন্ত্রের সাথে আছে রাজনীতির গভীর যোগ। রবীন্দ্রনাথ ‘রাষ্ট্রনীতি ও ধর্মনীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘বিচারের নিক্তিতে সক্ষম-অক্ষম এবং কালো-সাদায় ওজনে কমবেশি নাই। কিন্তু পোলিটিকাল প্রয়োজন বলিয়া একটা ভারি জিনিস আছে, সেটা যেদিকে ভর করে সে দিকে নিক্তি হেলে।…আমরা প্রতিদিন নানা দৃষ্টান্তের দ্বারা শিখিতেছি যে পোলিটিকাল প্রয়োজনের যে বিধান তাহা ন্যায়ের বিধান সত্যের বিধানের সাথে ঠিক মেলে না।’

অনুরাধা রায় আরও বলেন, ‘বাঙালির এই রবীন্দ্রময়তা বলা যায় একটি ফেনোমেনন, যার ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা আজও যথেষ্ট হয়নি।’ এই আলোকেই তিনি তাঁর ‘রেখেছো বাঙালি করে মানুষ কর নি’ শিরোনামে প্রায় ২৮ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ লিখেছেন, যে প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের ভাবনার জগতকে যাচাই করতে অনেক বেশি সহযোগিতা করে। নানা আলোকে রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে গিয়ে অনেকের মতো তাঁর ভেতরেও গভীরভাবে সেই প্রশ্নেরই পুনরাবৃত্তি হয়েছে, ‘কেমন মানুষ রবীন্দ্রনাথ।’
বিদগ্ধ রবীন্দ্র গবেষক ইরাবান বসুরায় যেমনটা বলেন, ‘উল্টো ধরনের কিছু ভ্রান্তি সত্ত্বেও আজ রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখতি চাইছি আমাদের পৃথিবীতে, তাকে বুঝতে চাইছি আমাদের মতো করেই। রবীন্দ্র-জিজ্ঞাসার আধুনিকতাও এখানেই।’
হ্যাঁ, এটি সত্য যে, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নানামুখী লেখার কারণে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হলেও রবীন্দ্রনাথকে আমরা আমাদের সময়ের পৃথিবীতে দেখতে চাই, তাঁকে বুঝতে চাই আরও বেশি করে। এখানেই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেন আধুনিক। কেমন সেই আধুনিকতা? শঙ্খ ঘোষ বলেন,
‘নিজের মধ্যে অনেকখানি জায়গা শূন্য রেখে তিনি তাই মিলনের দিকে এগিয়ে চলেন কেবলই, আত্মবলয় ভাঙ্গা সেই যোগের মধ্যেই আছে তাঁর চিরকালীন আধুনিকতা, সমস্ত আত্মপরাভবের গ্লানি থেকে মাথা তুলতে শেখায় যে-আধুনিকতা, অন্ধ প্রাণশক্তির প্রভুত্বকে তুচ্ছ করে দিয়ে কেবলই কোনো চিত্ত শক্তির দিকে এগোতে চায় যে আধুনিকতা।’
কুহেলিকাপূর্ণ জীবন ও জগতের পর্দা সরিয়ে সারাজীবনের সাধনার মাধ্যেম রবীন্দ্রনাথ দেখতে চেয়েছিলেন জীবনের অমৃত রূপ। এটি করতে গিয়ে তাঁর ভেতরেও কাজ করেছে নানান দ্বন্দ্ব। তাই তিনি বারবার চেয়েছেন, ‘এ আমির আবরণ সহজে স্খলিত হয়ে যাক’ তিনি বলেছেন, ‘দ্বার ছুটায়ে বাধা টুটায়ে/মোরে করো ত্রাণ মোরে করো ত্রাণ। আরো প্রেমে আরো প্রেমে/ মোর আমি ডুবে যাক নেমে।’ মংপুতে বসে মৈত্রেয়ী দেবীকে লিখেছেন, ‘নিজের কাছ থেকে নিজের যে মুক্তি সেই দুর্লভ মুক্তির জন্য চেষ্টা করি। সে চেষ্টা প্রত্যহ করতে হয়, তা না হলে আবিল হয়ে ওঠে মন।’

তাই যেভাবেই পথ চলতে চাই, রবীন্দ্রনাথ যদি হয় পথের সারথী, সে পথ হয়ে উঠে অনেক বেশি প্রাণময়, স্বচ্ছ এবং সত্য! এটি মেনে না নিয়ে কি করে আমরা চিনবো ‘আমাদের রবীন্দ্রনাথকে?’
রবীন্দ্রনাথ তো কেবলই সীমা আর অসীম নয়, জীবনদেবতা আর মৃত্যুচেতনা নয় শুধু; ঔপনিষদিক ভাবনা আর কালিদাসের সঙ্গে মিল খুঁজে তাঁর সহস্রাংশকেও বোঝা যায় না। ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি জন্ম নিলেও তিনি আমাদের মতোই এ কালেরই মানুষ। বেঁচে থাকার মহিমা ও মলিনতাকে আমাদের মতো করেই মোকাবেলা করেছেন, অতিক্রম করেছেন। তাঁকে আমাদের মতো করে বুঝতে গেলে তাই তাঁর দিকে নতুন করে বারবার তাকাতে হবে, খুঁজতে হবে আনাচে-কানাচে।
আমরা যেদিন তাঁর মতো করেই বলতে পারবো, ‘বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো, সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো’, সেইদিন হয়তো আরও বেশি করে রবীন্দ্রনাথকে আমাদের মতো করে আমাদের পৃথিবীতে পাবো।

 

লেখাটি শেষ করতে চাই কবি স্নেহাশীষ পাল এর কয়েকটি লাইন উল্লেখ করে, যে লাইনগুলোতে ‘আমাদের রবীন্দ্রনাথের’ স্বরূপ আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে।
‘সন্ধে গাঢ় হয়, রাতের বয়স বাড়ে…
মনে হয়: কি হবে-সাপের গায়ের মতো শীতল জীবন নিয়ে বেঁচে থেকে…
তখন দেখি, দেখতে পাই: অন্ধকার চিরে
কে যেন একব্রহ্মাণ্ড আলোকের হাত
বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের দিকে
সেটা খুব চেনা-চেনা, আপন, মুক্তির নিশানা…
ওটা আমদের রবি ঠাকুরের হাত…’

Facebook Comments Box