পাঁচটি প্রশ্ন

আমার মৃত্যু হলেও যেন আমার লেখারা বেঁচে থাকে অনন্তকাল

বৃহস্পতিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ | 5911 বার

আমার মৃত্যু হলেও যেন আমার লেখারা বেঁচে থাকে অনন্তকাল

দেশের বইয়ের একটি নিয়মিত আয়োজন পাঁচটি প্রশ্ন। লেখক-প্রকাশকের কাছে বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নগুলো করা। আজকের পাঁচটি প্রশ্ন আয়োজনে আমরা মুখোমুখি হয়েছি সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় তরুণ লেখক তৌফিক মিথুন-এর


 

প্রশ্ন ১। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
কৈশোর থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির অভ্যাস থাকলেও, বই প্রকাশের সাহস হয়নি কোনো দিন। অন্য অনেকের মতো যা খুশি লিখে বই প্রকাশ করে ফেললাম, এটা আমি চাইনি। এভাবে চলে গেছে অনেকগুলো বছর। বেসরকারি চাকরিতে যোগ দেয়ার ফলে, এই সকল সৃজনশীল চিন্তারও ধীরে ধীরে মৃত্যু হতে লাগল।

 

চমকটা লাগল আমার ছেলে মুশফিকের জন্মের পর। ওর যখন আড়াই বছর, তখন থেকেই তাকে ঘুম পাড়াতে বিভিন্ন গল্প বানিয়ে বানিয়ে বলতাম। সে গল্পের কি বুঝতো জানি না, তবে প্রতিদিন তাকে নিত্য-নতুন গল্প বলা লাগত। একদিন বুঝলাম, মুশফিকের পাশাপাশি তার মা’ও এই গল্পগুলোর একজন মুগ্ধ শ্রোতা। তার পরামর্শে এই গল্পগুলো ফেসবুকে পোস্ট করতাম। অধিকাংশই ভৌতিক গল্প। ধীরে ধীরে এই গল্পের পাঠক বাড়তে লাগল। একদিন বাবা বললেন, লেখাগুলো এলোমেলো না রেখে, পাণ্ডুলিপি করে কোনো প্রকাশককে দেখালে, তিনি হয়তো প্রকাশনার ব্যাপারে পরামর্শ দিতে পারবেন।

 

এভাবেই একদিন কীভাবে কীভাবে যেন সাহস করে পাণ্ডুলিপি তৈরি করলাম। স্থানীয় লেখিকা ছোট বোন ডা. ফাল্গুনী পরিবার পাবলিকেশন্সের খোঁজ দিলো। যোগাযোগ করলাম পরিবার পাবলিকেশন্সে। সময়টা ২০১৮ সালের মাঝামাঝি। প্রকাশনীতে অসংখ্য মানুষ। অধিকাংশই লেখক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। একেক জনের একেক রকমের কাজ। একজন ভদ্রলোক চেষ্টা করছিলেন সবাইকে সমানভাবে সময় দিতে, কিন্তু একা পেরে উঠছেন না। তবুও তার মুখের কোণে হাসিটা লেগেই আছে। পোড় খাওয়া মানুষ আমি। মেকী, প্রাণহীন হাসি টের পাই। অনেকদিন পরে অপরিচিত কারো মুখে সত্যিকারের প্রাণবন্ত হাসি দেখে ভাল লাগল। আমি কথা না বলে চুপচাপ সোফার এক কোণায় বসে রইলাম। একটা সময় আমার কথা বলার পালা এলো। সেই ভদ্রলোক হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। আমার প্রথম বই ‘প্রেত’ প্রকাশের প্রাথমিক কথাবার্তা হলো। তিনি পাণ্ডুলিপি পড়ে, পরবর্তীতে কথা বলবেন বলে জানালেন। আমাকে বেশিদিন অপেক্ষা করা লাগল না। পরদিনই তিনি ফোন করে জানালেন, গল্পগুলো তার ভালো লেগেছে। এই বই প্রকাশে পরিবার পাবলিকেশন্স আমার পাশে আছে। আমার লেখক হয়ে ওঠার গল্পে, যে মানুষটার নাম বারেবারে ফিরে আসবে, আসতেই হবে। তিনি সোহানুর রহীম শাওন। পরিবার পাবলিকেশন্সের প্রকাশক। আমার একজন নিঃস্বার্থ শুভাকাঙ্ক্ষী।

পরিবার পাবলিকেশন্স থেকেই ২০১৯ বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার প্রথম বই ‘প্রেত’। আলহামদুলিল্লাহ, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পাঠকরাই আমাকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

প্রশ্ন ২। লেখালেখির ইচ্ছেটা কেন হলো?
বই প্রকাশের অভিজ্ঞতার অংশেই বলেছি, কীভাবে গ্রন্থ প্রকাশের জগতে এলাম। সেই হিসাবে বলতে পারেন, লেখালেখির ইচ্ছেটা জেগেছে আমার ছেলে মুশফিককে গল্প শোনাতে গিয়ে।

 

প্রশ্ন ৩। লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
২০১৯ বইমেলায় আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে।  ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে আমি স্টলে গিয়েছি। নতুন লেখক, কেউই চেনে না। মেলা তখনও জমে ওঠেনি। অল্প-স্বল্প বই বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশই নামী-দামী লেখকদের। আমিও কিনলাম কিছু। লজ্জায় স্টলে জিজ্ঞেসও করতে পারছি না, ‘প্রেত’ দুই এক কপি বিক্রি হয়েছে কি না!
এমন সময় স্টলে একটা ছেলে এলো। বয়স ১৮-২১ এর মধ্যে হবে। পিঠে ব্যাগ ঝোলানো। আর ব্যাগ যে বই দিয়ে ভর্তি, সেটা অনুমানে যে কেউ বুঝবে। ছেলেটা আমার বইটা হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখছিলো। কেনা উচিত হবে কি হবে না এই নিয়ে হয়তো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল। একসময় স্টলের দায়িত্বে থাকা জহিরুলকে বইবিষয়ক কিছু জিজ্ঞেস করলে, জহিরুল সোজা দেখিয়ে দিলো আমাকে। লেখককে দেখিয়ে দিয়ে সে অন্য বই বিক্রিতে মনোযোগী হলো।
আমিও বেশ খুশী খুশী মনে অপেক্ষায় আছি। যাক্ বাবা এক কপি বিক্রি হবে তাহলে! তবে ছেলেটার প্রথম প্রশ্নেই আমি ধরা খেলাম। লেখালেখির চাওয়া-পাওয়ার বিস্তর ব্যবধান চোখে পড়লো।

‘আপনার এই বই পড়ে আমি কী শিখতে পারবো?’
আমি থতমত খেয়ে উত্তর দিলাম, ‘কিছুই না’।
‘কিছুই না মানে? পয়সা দিয়ে যদি কিছু না শিখতে পারি তবে বই পড়ে কী লাভ?’
‘ভাই, আমি নিজেই এখনও শিখছি, কাউকে শেখানোর মতো ক্ষমতা এখনও হয়নি।’

ছেলেটার মনে হয় এই উত্তরে কিঞ্চিৎ দয়া হলো, গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনার বইটা কি পুরোটাই ভৌতিক নাকি সায়েন্সের কিছু আছে?’
‘না ভাই, আমি সাহিত্যের সাথে সায়েন্স মেশাতে শিখিনি এখনও। অনেকেই পারে তোকমার শরবতের মতো ঝাকাঝাকি করতে। কিন্তু দিনশেষে আমি ঐ শরবতওয়ালা, যার তোকমা শরবতে মেশে না। ভেসে থাকে।’
‘হাহ হাহ হা তাহলে আপনি বলছেন, শেখার মতো কিছুই নেই? Nothing?’
‘বিনোদনের জন্য গল্পগুলো লিখেছিলাম, বলার মতো শিক্ষণীয় কিছু আমার চোখে তো পড়েনি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে’- বলে ছেলেটা চলে গেল। স্টলে বসা, জহিরুল ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এ আবার কেমন লেখক? যে পাঠককে একটা বই ধরিয়ে দিতে পারে না।
কিছুক্ষণ পরে ছেলেটা আবার এলো। এবার তার ব্যাগটা আরও ভারী। বুঝলাম, পড়ুয়া ছেলে। অনেক বই সংগ্রহ করেছে। দয়া করেই হোক, আর যেভাবেই হোক আমার বইটা কিনলো। খুব সম্ভবত বইয়ের দাম বেশি না হওয়ায় দয়াটা পেয়েছিলাম। যাওয়ার সময় আমাকে বলল, পড়ে দেখি বিনোদন পাই কি না।
ঘাম দিয়ে জ্বর নামার মতো অবস্থা আমার। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যাক্ বাবা একটা কপি তো বিক্রি হলো। ফেসবুকের ফ্রি লেখা পড়ার মতো না, আমার লেখা পড়ার জন্য অপরিচিত কেউ একজন তো টাকা খরচ করলো!

এরমধ্যে কেটে গেল আরও ছয়টি দিন। কর্মজীবি মানুষ! প্রতিদিন মেলায় সময় দিতে পারি না। পরের সপ্তাহে স্টলে গিয়েছি। জহিরুল জানালো, আপনার এক পাঠক আপনার খোঁজে এসেছিল দুই দিন।
আমি মাথা চুলকে ভাবলাম, আমার আবার পাঠক শ্রেণি তৈরি হলো কবে?
সেদিনই সন্ধ্যার দিকে সেই পাঠক স্টলে এলেন। আমি চিনলাম তাকে। বুঝলাম আজ আমার খবর আছে। বিনোদন দিতে না পারায় পয়সা ফেরত দিতে হয় কি না সেটাই ভাবছি। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি তার বইটা এগিয়ে দিলেন, ভাইয়া একটা অটোগ্রাফ দিন।
আমি সারাজীবন অটোগ্রাফ নেয়া মানুষ, দিতে সংকোচ হচ্ছিল। আমি বললাম, ভাই সেই যোগ্যতা এখনও হয়নি।
জবাবে তিনি যা বললেন, সেসব না লিখি। নিজের ঢোল পেটানো হয়ে যাবে। শুধু এটুকু বলি, তার জোরাজুরিতে অটোগ্রাফ দেয়া শিখেছিলাম।
জহিরুলের কাছে জানলাম, সেই পাঠক এরই মধ্যে আরও ৫-৭ কপি নিয়ে গিয়েছে। মনে হয় বন্ধু-বান্ধবদের বিনোদনের জন্য।

এ থেকে আমি যা শিখলাম, পাঠককে মিথ্যে বলে বই বিক্রির চেষ্টা করলে, নিশ্চিত প্রতারিত পাঠক পরবর্তীতে আপনার লেখা ছুঁয়েও দেখবে না। বরং সত্যিটা জেনে, যে পাঠক আসবে, সে ভালোবাসবে আজীবন। মৃত্যুর পরেও হুমায়ুন আহমেদের বই এখনও কেন এত জনপ্রিয় সেটা চাক্ষুষ উপলব্ধি করলাম।
আর পাঠক যা শিখলেন, সব বইকে বিসিএস গাইডের মতো শিক্ষামূলক না ভেবেও, পড়ার মতো সৃজনশীল অনেক কিছুই চারপাশে আছে।

 

প্রশ্ন ৪। বাংলাদেশের সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
এগুলো বেশ ভারী ভারী কথা। এগুলো নিয়ে বলার যোগ্যতা আমার এখনও হয়নি। তবে একটা জিনিস কষ্ট দেয়, সেটা বলতে পারি। এমনিতেই আমাদের পাঠক সংখ্যা অনেক কম। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পরে সেই সংখ্যাটা আরও কমেছে। তার উপর পরবর্তী প্রজন্মের ‘অবসর’ নামক সময়টুকু দখল করে নিচ্ছে মোবাইল-ইন্টারনেট। পাঠক যে একেবারেই নেই, তা নয়। তবে এই সংখ্যাটা বাড়াতে যে ধরনের লেখক-লেখিকার প্রয়োজন, তেমন ম্যাজিকাল জাত লেখক এই সময়ে চোখে পড়ে না। আমার এই কথায় সিনিয়র-জুনিয়র অনেকেই কষ্ট পেলেও এটাই সত্যি। সৃজনশীল লেখালেখি করে কিংবা সেই লেখা প্রকাশ করে, লেখক এবং প্রকাশক উভয়ে আর্থিকভাবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, এমনটা নিয়মিত দেখা যায় না। সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ যদি উন্নত দেখতে চাই, আমার মনে হয় আমাদের প্রচুর পরিমানে পাঠক তৈরি করতে হবে। শৈশব থেকেই সৃজনশীল বই পড়ার পাঠাভ্যাস তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে।

ক্লাস টু-এর বাচ্চাকে আপনি বিভিন্ন বিষয়ের ১৮টি বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করে, যদি আশা করেন সে তার অবসরে আরও অসংখ্য বই পড়বে- এই চাওয়াটা আমার মনে হয় অলীক স্বপ্ন। শিশু বয়সেই স্কুলের বইয়ের এই ধরনের চাপ, তাদের মধ্যে বই বিমুখতা তৈরি করছে কি না, সৃজনশীল লেখালেখির পাঠক তৈরিতে সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

 

 প্রশ্ন ৫। লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন?
সত্যি বলতে লেখালেখি নিয়ে আমার তেমন কোনো স্বপ্ন নেই। প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল নিজের ইচ্ছায়। এরপরের সবগুলোই পাঠকের এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের আগ্রহে। যতদিন পাঠকের ভালোবাসা সাথে আছে, লেখার তাগিদ থাকবে। যেদিন থেকে বুঝবো পাঠকের আগ্রহ আর নেই, সেদিন নিঃশব্দে বিদায় নিবো। তবে লেখালেখি যেদিনই বন্ধ করি না কেন, ইচ্ছা আছে ওপার বাংলায় ভৌতিক গল্পের যে সমৃদ্ধতা, তেমনটা আমাদের এখানেও থাকবে। ভৌতিক গল্পের বই সাজেস্ট করতে গিয়ে ওপার বাংলার লেখকদের নাম না বলে, একজন মানুষও যদি আমার নাম বলে, সেই পাওয়াটাও আমার জন্য হবে অনেক। কারণ মানুষ বাঁচে তার কর্মে। আমার মৃত্যু হলেও যেন আমার লেখারা বেঁচে থাকে অনন্তকাল। অন্য লেখকদের মতো আমারও এই সুপ্ত চাওয়াটা নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু হবে না।

Facebook Comments Box