আবু হাসান শাহরিয়ার-এর স্মৃতিগদ্য

বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯ | ৩:৫১ অপরাহ্ণ | 241 বার

আবু হাসান শাহরিয়ার-এর স্মৃতিগদ্য

[ এক ]

পদ্মাস্মৃতি

পুরানো চাল ভাতে বাড়ে। পুরানো দিন চোখ মোছে স্মৃতির পাহাড়ে। ফিরে তাকালে সেই পদ্মাকে মনে পড়ে, যে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা। রাজশাহীর পদ্মা। একসময় রানি ভবানীর পরগনা ছিল এই জনপদ। পুকুর ও দিঘি ছাড়াও সুপেয় পানীয় জলের জন্য বিখ্যাত ছিল শহরের ঢপকলগুলো। এখন কেবলই ‘হেরিটেজ’। রাজশাহী আমার জন্মশহর। এই শহরেরই কোথাও আমার নাড়ি পোঁতা আছে। অতি দূর শৈশবের কথা মনে হলে প্রমত্তা পদ্মার আছাড়িপিছাড়ি ঢেউ আমার মনেও নোঙর ফেলে। চোখ বুজলেই তার চণ্ডীমূর্তি দেখতে পাই, যার কথা কবিকঙ্কন মুকন্দরামের কবিতায় আছে—
চণ্ডীর আদেশে ধায় নদ-নদীগণ
মগড়া নদীর সঙ্গে করিতে মিলন
প্রবল তরঙ্গা ধাইল পদ্মা…
পদ্মার সেই ‘প্রবল তরঙ্গা’ রূপ দেখতে দাদুর হাত ধরে রোজ বিকেলে সাগরপাড়া থেকে বোসপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি ছুঁয়ে পদ্মার বাঁধে উঠতাম। ওঠার সময় বাঁধলগ্ন রাজবাড়িতে বিশাল দুই সিংহকে দেখতাম রক্তবর্ণ চোখে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে। এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের ওপর। ভয়ে দাদুর হাত শক্ত করে চেপে ধরতাম। দাদু বলতেন, “ওগুলো মাটির সিংহ; আগের দিনের রাজারা মাটির বাঘ-সিংহ দেখিয়ে প্রজাদের ভয় দেখাত; চিড়িয়াখানা গিয়ে আমরা আসল সিংহ দেখে আসব একদিন।”
ছবির সিংহের পর মাটির সিংহ দেখলেও তখন পর্যন্ত আমি আসল সিংহ দেখিনি। তবে, আসল পদ্মার অপরূপ ঢেউ দেখেছি শৈশবেই। প্রথমে পিতামহের হাত ধরে, পরে পিতার। একসময় বন্ধুদের অথবা আমার পিঠাপিঠি ছোটোবোন মুন্নীকে পাশে নিয়ে। পদ্মায় তখন ঢেউয়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলত ঝাঁক ঝাঁক রুপালি ইলিশ। নোনা সাগরের মাছ নদীতে ডিম পেড়ে আবার নোনা সাগরে ফিরে যাওয়ার সময় জেলেদের জালে ধরা পড়ছে— বড়ো হয়ে রাতের মেঘনায় এই দৃশ্যও দেখেছি। আর, ভুস করে উঠেই চারপাশে বৃত্তাকার তরঙ্গ তুলে ডুব দিত শুশুক। পদ্মায় দেখা এই জলজ প্রাণীটি ছিল আমার শৈশবের বিস্ময়। এখন আর বাংলার নদ-নদীতে শুশুক তেমন চোখে পড়ে না। দূরের বন্দর থেকে আসা মহাজনি নৌকাগুলোও না। আগে পদ্মার যেখানে থইথই পানি দেখেছি, এখন সেখানে ধূ ধূ বালিয়াড়ি। বাঁধের ওপারেও বেশ অনেকদূর অব্দি মানুষের ঘর-বসতি।
রবি ঠাকুরের ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’ কবিতাটি প্রথম যখন শুনি, মনে হয়েছিল, এ আবার কেমন নদী? নদীর আবার হাঁটুজল হয় নাকি? কোনও কোনও বর্ষায় পদ্মার জল বাঁধ উপচে আমাদের শহরে ঢুকে পড়ত। সেই জল ভাসিয়ে নিত পাড়ার রাস্তা-পুকুর আর বসতবাড়ির উঠোন। বড়োরা উৎকণ্ঠিত হলেও আমরা ছোটোরা তাতে খুশিই হতাম। গামছা, লুঙ্গি পলো, খলুই— যার যা আছে— তাই নিয়ে মাছধরার উৎসবে মেতে উঠতাম। কেউ কেউ খালি হাতেই ধীবর। পদ্মার ইলিশ না পেলেও প্লাবিত পুকুর-দিঘির সব ধরনের মাছই ধরা দিত আমাদের ফাঁদে। সেই ধীবরপ্রতিম ছেলেবেলা সার্বিক অর্থেই মাছেভাতে বাঙালির ছেলেবেলা ছিল।
একসময় যেখানে সিংহদরজাওয়ালা রাজবাড়িটি ছিল, সেখানে এখন ‘শাহ মখদুম কলেজ’। বালুর কঙ্কাল ফেলে শীর্ণদেহী পদ্মা অনেক দূরে সরে গেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের নদীশাসনের ফলে। হায়, ফারাক্কা! নদীশাসনে নিজেরাও আমরা কম যাই না। আছে নদীদূষণ-নদীদখলও। তাই, কবিকঙ্কনের ‘প্রবল তরঙ্গা’ পদ্মার পরিবর্তে রবি ঠাকুরের ‘আমাদের ছোটো নদী’ই এখন ভরসা। বৈশাখ মাসে কোথাও কোথাও তার হাঁটুজলও থাকে না।