অরুণ সেন! ওপার হতে প্রণতি জানবেন

রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২০ | ৩:০৪ অপরাহ্ণ | 75 বার

অরুণ সেন! ওপার হতে প্রণতি জানবেন

॥ সাইমন জাকারিয়া ॥

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম নন্দনতাত্ত্বিক, সাহিত্য-বিশ্লেষক অরুণ সেনের প্রতি বাংলাদেশের কবি, নাট্যকার ও সাহিত্যিকদের অকৃত্রিম ঋণ রয়েছে। কবি মোহাম্মদ রফিক থেকে শুরু করে নাট্যকার সেলিম আল দীনকে তিনি যেভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। এমনকি একজন আজ থেকে প্রায় একযুগ আগেই তিনি আমার সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম তথা নাটক, কবিতা, উপন্যাস; গবেষণাকর্ম এবং সম্পাদনা নিয়ে উদ্দীপনামূলক মন্তব্য পাঠিয়ে সীমাহীন ভক্তি-শ্রদ্ধায় প্রণম্য হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্নেহের কারণে ২০০৯-২০১০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে একবার তার কলকাতার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম কয়েকদিনের জন্য।

 

যখন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সে সময় তিনি একটি তথ্য দিয়ে আমাকে চমকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন: “সাইমন তুমি কি জানো, তোমার ‘ন নৈরামণি’ নাটক নিয়ে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে?” আমি একেবারেই তা জানতাম না, হয়তো জানা হতোও না কোনোদিন; তিনি শুধু প্রশ্ন করেই ক্ষান্ত হলেন না আমাকে বলে দিলেন কোন সংখ্যায় লেখাটি বেরিয়েছে! শেষে আমি তাঁর নির্দেশনামতো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে গেলাম এবং পত্রিকাটি সংগ্রহ করে দেখি- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বনাথ রায় চর্যাপদের নবসৃষ্টি বিষয়ক প্রবন্ধের সিংহভাগ আলোচনায় ‘ন নৈরামণি’ গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। আমি তখন অবাক হয়েছিলাম, অরুণ সেনের বিচিত্র দিকে নজরদারি দেখে। তাঁর বাসায় বাংলা অভিধানের ঈর্ষণীয় সংগ্রহ অভিভুত হয়েছিলাম! বিচিত্রমুখী ছিল আর জ্ঞানের জগত; লোকজ শিল্পকলা, চিত্রকলা নিয়ে তাঁর ছিল অনির্বচনীয় দৃষ্টিভঙ্গি!
অরুণ সেন ইমেইল যোগে একসময় নিয়মিত আমাকে চিঠি লিখতেন, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর ইমেল যোগে পাঠানো তাঁর লেখা একটি চিঠির ছবি এখানে দিলাম; পড়ে দেখুন, এই চিঠিতে তিনি কী সুন্দরভাবেই না আমার সকল সৃষ্টিকর্ম নিয়ে সুন্দর মূল্যায়ন করেছিলেন, অরুণ সেনের মূল্যায়নে “সেলিম আল রচনাসমগ্র” সংকলন-সম্পাদনায় আমার নিষ্ঠার কথা প্রশংসার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে, সেলিম আল দীনের পর এই সংকলন-সম্পাদনাকে কেন যেন অনেকে বড়াে করে দেখতে ভীষণ অনীহ, শুধু তাই নয়- মোটাদাগে অনেক সময় আমাকে সংকলক-সম্পাদকের অযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকে, এটা মাঝেমধ্যে আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত করে, কিন্তু যখনই সেলিম আল দীন রচনাসমগ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডে মুদ্রিত সেলিম আল দীনের প্রশংসাবাক্য পড়ি এবং পরবর্তীকালে অরুণ সেন প্রদত্ত মন্তব্য পাঠ করি তখন আবার নতুন করে আনন্দিত হয়ে উঠি। অরুণ সেন তাঁর মূল্যায়নের পরম্পরায় আমার “নাটকসংগ্রহ” প্রথমখণ্ডের জন্য একটি ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন, তাঁর রচিত ভূমিকাটি বাংলাদেশের প্রকাশনাসংস্থা অ্যাডর্ন থেকে প্রকাশিত “নাটকসংগ্রহে”র প্রথমখণ্ডে মুদ্রিত রয়েছে।
সর্বশেষ তিনি কলকাতার নয়াউদ্যোগ থেকে প্রকাশিত “বোধিদ্রুম: একটি বুদ্ধ নাটক” শীর্ষক গ্রন্থের ফ্ল্যাপ লিখে দিয়েছিলেন। কতটা স্নেহ ও ভালোবাসা থাকলে তাঁর মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন সাহিত্য-বিশ্লেষক নন্দনতাত্ত্বিক এমনটা করতে পারতেন!
আজ সকালে ঘুম থেকে জেগেই অরুণ সেনের তিরোধানে মর্মাহত হলাম। আমাদের ভালোবাসার মানুষ কমে আসছে প্রতিনিয়ত। অরুণদা ওপার হতে প্রণতি জানবেন। আপনার পবিত্র আত্মার মঙ্গল কামনা করি।

[ফেসবুক পোস্ট থেকে]

Facebook Comments