মুক্তকলাম

অমর একুশে বইমেলা : কিছু আশার আলো, কিছু সংশয়

শনিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১১:০৬ অপরাহ্ণ | 359 বার

অমর একুশে বইমেলা : কিছু আশার আলো, কিছু সংশয়

হাসান তারেক চৌধুরী


করোনাকালের ভয়াবহ থাবায় গত দু’বছরে আমাদের প্রকাশনা শিল্প প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। বেশিরভার শিল্প, এমনকি আইন পেশায় নিয়োজিত উকিলরাও প্রণোদনার আশ্বাস পেলেও আমাদের প্রকাশনা শিল্প সবরকম সহায়তাবঞ্চিত। উপরন্তু, অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাঠক-ক্রেতা বর্জিত দুইটি বইমেলা আয়োজন করে অনেক প্রকাশকই আজ ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার।

 

এবারের বইমেলা সেদিক থেকে সুরঙ্গের কোণে এক আশার আলো। গত কয়েকদিন মেলা ঘুরে মনে হলো, এবার পাঠক ও উৎসাহীদের আনাগোনা বেশি। প্রথমদিকে বিক্রি খুব বেশি না হলেও, বোঝা যায় সময়ের সাথে এটা বাড়বে।

তবে এটাও সত্যি পাঠক ও দর্শকরা যতটা না ছিলেন বইয়ের সঙ্গে, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন সেলফি তুলতে ও ফেসবুক লাইভে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশকরাও এক্ষেত্রে সহায়তা দিচ্ছেন তাদের স্টলের প্রচারণার স্বার্থে। সেলফি তোলার জন্য স্টলে আলাদা জায়গা রেখেছেন তাদের কেউ কেউ।

 

প্রতিবারের মতো এবারও প্রচারের নানা রকম অভিনব কৌশল দেখলাম। একইসাথে বিনোদন পেলাম ও হতাশ হলাম। এক নামকরা প্রকাশনার প্যাভিলিয়ন সাজানো হয়েছে লেখকদের ছবি দিয়ে, যেখানে বই প্রায় অদৃশ্য। যেখানে জনপ্রিয় লেখক তো আছেনই, সঙ্গে ইংলিশ স্পোকেন বই, ইউটিউব সেলিব্রেটিও আছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি বোধহয় ভুলে গেছেন, লেখকরা নায়ক বা নায়িকা নন এবং তাদের কাজ লেখকের প্রচার করা না বরং ভালো বইয়ের প্রচার করা।

 

লেখকের ছবি দিয়ে এভাবে প্রচার ব্যক্তিগতভাবে সবসময়ই আমার কাছে কুরুচিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। অবশ্য সদ্যপ্রয়াত কোনো লেখক, সর্বজন শ্রদ্ধেয় কোনো লেখকের বিশেষ সম্মানে মাঝে মাঝে এমনটা করা যেতে পারে। এভাবে লেখকের নায়কসুলভ প্রচার এই শিল্পের জন্য অশনিসংকেত।

 

এই শিল্পের প্রথম অবক্ষয় শুরু হয় যখন ফেসবুক পোস্ট লেখকরা কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়াই রাতারাতি লেখক হয়ে উঠলেন। নিজের টাকায় বই ছাপাতে শুরু করলেন, মুনাফার লোভে প্রকাশগণ তাদের সঙ্গী হলেন। আরেক দফা অবক্ষয় হয় যখন প্রকাশকগণ ঝুঁকে পড়লেন ছোট পর্দার নায়িকা, গায়ক, গায়িকা , অভিনেতা, ইউটিউব সেলিব্রিটি, মোটিভেশনাল স্পিকার এদের বই ছাপাতে। আমি বলছি না তাদের মধ্যে যোগ্য লেখক নেই। অবশ্যই আছে, তবে সেই সংখ্যা নগন্য। প্রায় সব ক্ষেত্রেই বই ছাপানো হয়, ইউটিউবে কার ফলোয়ার বা সাবস্ক্রাইবার কত, এই অংক কষে- বইয়ের মলাটের ভেতর কী আছে, সেটি মোটেই বিবেচনায় আনা হয় না।

তার ওপর বর্তমানে বইসংশ্লিষ্ট ও গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যেও সমকালীন সাহিত্য ও বই নিয়ে জানাশোনা কমে গেছে। যারা একটু-আধটু খবর রাখেন, তারা শুধু সেলিব্রিটি লেখকদের খোঁজ-খবরই রাখেন। ফলে লাইভ বা রিপোর্টে বইমেলা নিয়ে যে সাংবাদিকতা হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো তারা করছে মৌসুমি লেখকের অনুরোধ রক্ষা করে।

 

এই অবস্থায় বইয়ের মান রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে প্রকাশকদের, এটা তাদেরই কাজ। তরুণ প্রকাশকরা এক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে পারেন। অভিজ্ঞ প্রকাশকদেরও সহায়তা প্রয়োজন। সময় এসেছে আমাদের শক্তিশালী সম্পাদনা পরিষদের দিকে নজর দেয়া। এ ছাড়া ভালো বই বের করা অসম্ভব।

 


লেখক : বিজ্ঞান লেখক, উপন্যাসিক, সম্পাদক : বাতায়ন

Facebook Comments Box