অনুবাদে গুরুত্ব ও সময় বেশি দেয়া উচিত : ইবনে শামস

শনিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২১ | ৪:০৮ অপরাহ্ণ | 522 বার

অনুবাদে গুরুত্ব ও সময় বেশি দেয়া উচিত : ইবনে শামস

দেশের বইয়ের একটি নিয়মিত আয়োজন পাঁচটি প্রশ্ন। লেখক-প্রকাশকের কাছে বই প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্নগুলো করা। আজকের পাঁচটি প্রশ্ন আয়োজনে আমরা মুখোমুখি হয়েছি তরুণ কবি –ইবনে শামস-এর


 

প্রশ্ন ১। প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

বই করার কথা কখনো মাথায় আসেনি। সাহিত্য নিয়া যখন কয়েকটা আড্ডা বা আলাপে গেলাম তখন বেশ ঝামেলায় পরতে হইছে। কোনো কথা যদি আমি জোর দিয়া কইতে যাই, তখন অনেকেই প্রশ্ন কইরা বসে আপনার কয়টা বই আছে বাজারে। মানে ব্যাপারটা এমন হইছে, আমি এই জায়গায় কোনো কথার স্টাব্লিশ করতে চাইলে আমার বই থাকতে হবে। এই জায়গা থেকে বই করা৷ প্রথমবার পাণ্ডুলিপি গুছানোর পর কোনো প্রকাশক রাজি হইলো না, ফেসবুকে তেমন পাঠক নাই আমার, বই বিক্রি হবে না এইসব অজুহাতে। পরে সোয়েব ভাই জানাইলো জেব্রাক্রসিং-এর কথা। জেব্রাক্রসিং-এর লগে কথা বইলা জানা গেল, টাকা ছাড়া বই হওয়ার কোনো পজিবিলিটি নাই৷ পরে, একটা করজা দেয়ার প্রতিষ্ঠান থেইকা করজা নিয়ে বই করি। আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু ‘স্বর্গ’ আমারে না করছিল করজ নিয়া বই করার ব্যাপারে। তারে কনভিন্স কইরা আমি ঠিকই করছি বইটা৷ পরে ঐ করজা শোধ করতে আমার তিন বছর লাগছে। যেহেতু টিউশনি ছাড়া আমার তেমন কোনো ইনকাম ছিল না৷ শেষপর্যায়ে, এই পর্যন্ত ঐ বইয়ের কোনো হিসেব আমি পাইনি।

প্রশ্ন ২। লেখালেখির ইচ্ছেটা কেনো হলো?

মাদরাসা থেইকা ডাক্তার বানানোর জন্যে প্রায় পাঁচ বছরের নিচে আইনা আমাকে ভর্তি করানো হয় স্কুলে। মাদরাসায় থাকতেই লেখালেখির আগ্রহ জন্মায়। বিশেষ করে আল মাহমুদ আর হুমায়ূন আহমেদ পইড়া। আমি দারুল মাআরিফ পড়াকালীন ঘটনা, সারা সপ্তাহের নাস্তার খরচ, বন্ধুদের করানো নাস্তায় বাইচা থেকে, মাদরাসা থেইকা প্রতি জুমাবার বহদ্দারহাট আসতাম, কেবল আল মাহমুদের একটা লেখা ছাপায় এমন একটা পত্রিকা কিনতে। তখন ‘অন্য দিগন্তে’ উনার লেখা ছাপানো হইতো। পড়ার এই জার্নির ভেতর একদিন মনে হইলো, লিখি। নিজের কথাটা৷ ঐখান থেকেই শুরু।

যদিও এর আগে গ্রামে থাকবার সময় আরো অনেক বিচ্ছিন্ন ঘটনা আছে লেখালেখি নিয়া৷ তবে একদম নিজের ভেতরে স্থিরভাবে এই বাসনা জন্মায় দাআরুল মাআরিফেই৷

ঐ সময়ে ডায়রিতে নিজের অন্তর্গত আলাপগুলা লেখার পাশাপাশি আমি ইমরুল কায়েসের কবিতার অনুবাদ করি। যেইটা বই আকারে গত বছর প্রকাশ করে আনন্দম। তখনকার কিছু লেখায় ইমরুল কায়েসকেই রিপিট করছিলাম, আমার সারউন্ডিংস নিয়া। ঐ কবিতাগুলাও অনুবাদটার শেষে যুক্ত করছিলাম।

প্রশ্ন ৩। লেখক জীবনের মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

লেখক জীবনের ঘটনার কথা উঠলে আমার বেশ কিছু ঘটনা মনে পড়ে। এই যেমন, প্রথম কবিতাটা লেখা হয় আরবীতে। মাদরাসার আবু তাহের হুজুরকে দেখানোর পর উনি ঐটা ছুঁড়ে মারে। কবিতার ছন্দ নিয়া কোনো জ্ঞান নাই। এইসব কইয়া আমারে বলে, আগে সেইসব জাইনা তারপর কবিতা লিখতে৷ যদি লিখতে পারি, তখন উনারে দেখাইতে। অনেকগুলা ছেলের মাঝে হেনস্তা হইবার পর, আমি আরবী কবিতার ছন্দ-টন্দ সব নিয়া ঘাটাঘাটি করলাম কয়েক বছর। পরে মনে হইলো, আমি বাকওয়াস সময় কাটাইতাছি এইসব করে। পরে আর কখনো ছন্দ-টন্দ এইসব নিয়া ভাবতে ইচ্ছা করেনাই।

আরেকটা ঘটনা, স্বর্গের গালিচায় আগুন বাইর হইবার পর। বাসায় বোন আমার ডেস্ক থেইকা পাইয়া আম্মার হাতে দেয়। আম্মা নাম পইড়া ‘নাউজুবিল্লাহ’, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পইড়া কয়, এই কাফেরের বই এইখানে কে পড়তাছে। আরিপ্পা? আরিফ আমার ডাকনাম৷ তো বোন জানায়, এইটা তার ছেলের লেখা কবিতার বই। মা তো সেইদিন খতমই দিয়া দিছে আমি যেন এই পথে না আগাই। তিনি কয়, খোদার স্বর্গে আগুন কেমনে? ছি ছি, তোরে তো নিশ্চিত জাহান্নামে দিবে। ঐদিনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এরপর তো, মেলায় আরেক কাণ্ড। প্রথম ঢাকা শহর গেলাম। ঢাকায় নামার পর অস্বস্তি শুরু হইলো আমার। মেলায় ঢুকে এতো এতো লোক দ্যাইখা আমি ভরকে গেছি। আমার লোকসমাগমে ফোবিয়া অনেক আগ থেইকাই। ঐখানে ভিতর ভিতর মইরা যাচ্ছিলাম। জেব্রাক্রসিং-এর সামনে গিয়া হাসনাত ভাইরে চিনলাম। উনার লগে কথা কইলাম। পরে একজন কইলো আমারে, সইরা দাঁড়ান, ছবি তুলব৷ তারা ফটোগ্রাফিতে মনোযোগ দিল। আমি একটা কোনায় দাঁড়াইলাম। কার্তু কয়তাছিলেন, এইটা কেমন ঘটনা ঘটলো? কইলাম, কিছু না। সুন্দর ঘটনাই। তখন আমাগো পাশেই চারটা ছেলে স্টল থেইকা ‘স্বর্গের গালিচায় আগুন’ খুইজা নিয়া গেল। আমারেও তারা চিনে না। আমিও তাগোরে চিনি না। এই ঘটনা দেইখা, আমি কার্তুরে নিয়া বেশ কিছু বই কিনা বাইর হইয়া গেলাম। আরো মজার ঘটনা হইলো, বই কিনতে গিয়া দন্ত্যনদার স্টলে থাকা কেউই আমারে চিনে না। পিচ্চি পাচ্চা ছেলে মনে কইরা স্টলের সামনে অযথা দাঁড়াইয়া থাকতে না করছিলো।

এরপরের ঘটনা চট্টগ্রামে ফেরার পর একদিন টেম্পোতে। আমি বইসা আছি। আমার অপজিটে দুইজন বসা। সম্ভবত প্রেমিক-প্রেমিকা। একজন আরেকজনরে টেম্পোতে ‘বিলাপ’ কবিতাটা পইড়া শুনাচ্ছিলো। আর আমি তাদের সামনে বইসা শুনতেছিলাম। কেউ কাউরে চিনিনা।

তবে এগুলার বাইরে কবিতা নিয়া আমার বোঝাপড়া পরিবর্তন কইরা দেয়া একজনের লগে আমার দেখা হয়। ১৮এর শেষের দিকের ঘটনা। আমি অনেকদিন ধইরা লিখতে পারতেছিলাম না। হুদাই রাতে বাইর হইয়া ফুটপাতে ফুটপাতে ঘুরতেছিলাম। তখন একজন পাগলের লগে আমার আলাপ হয়। যারে আমি জিগ্যেস করছিলাম, আমি কবিতা লিখতে চাইতেছি, পারতেছি না৷ তখন সে কইছিলো, কবিতাটা খায় না গায়ে দেয়? যদি খাওয়া যায় তাইলে আমারে দেন, ক্ষুধা লাগছে। আর গায়ে দেয়া গেলে ঐখানে শুইয়া থাকা মাইয়াডারে দেন৷ তার শীত লাগতাছে। এইটা একটা বৃহৎ জার্নি। এইটা নিয়ে এখানে এতো বিশদ বলা যাচ্ছে না৷ এইটুক ব্যাপার জানানো দরকার মনে হইতেছে, আমার ‘নিরানন্দ দাশ’ নামের ‘উপবিতা’ তার লগে সাক্ষাতের পরই আমার লেখা হয়।

প্রশ্ন ৪। বাংলাদেশে সৃজনশীল লেখালেখির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।

বাংলাদেশে যে পরিমাণ সাহিত্য হইতেছে সেইটা অন্যকোথাও হইতেছে বলে মনে হয় না৷ প্রায় সব সাহিত্যেই ফার্নিশ একটা ব্যাপার আছে। আর আমাদের এখানে র কাজ হইতেছে যেইটা ফার্নিশের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী। আমাদের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা বাইরের পাঠকদের সাথে দূরত্ব৷ যেইটা না গুছাইতে পারলে, আমাদের এই সহিত্য থেইকা দুনিয়া বঞ্চিত হবে। তো এইক্ষেত্রে, আমাদের যারা বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী, তারা বিভিন্ন ভাষার কবিতারে বাংলায় করার চেয়ে, বাংলার কবিতাগুলারে অন্যভাষায় অনুবাদ করবার ক্ষেত্রে গুরুত্ব এবং সময় বেশি দেয়া উচিত মনে হয়।

প্রশ্ন ৫। লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন?

স্বপ্ন বলতে তেমন কিছু নাই৷ কেবল কয়েকটা ব্যাপার মনে হয়৷ একটা হইতেছে, আমাকে যেন শক্তির মতো কোন অনুষ্ঠানে গিয়া কবিতা পড়ার অরুচি জন্মায় এমন কোনো পরিস্থিতি এইদেশের সাহিত্য নিয়া না হোক। যেন আমারে অনুষ্ঠানে গিয়া, কবিতার বদলে শিস বাজাইয়া সাহিত্যের মানুষগুলারে ঘৃণা কইরা নাইমা আসতে না হয়৷ যেন সাহিত্য করছে এমন কারো, বিনয়ের মতো ‘কেবল ভাত খাওয়াবে’ এই পরিস্থিতে আইসা কবিতা পড়তে না হয় কোন রেডিও বা টিভিতে।

আর আমার নিজের সাহিত্যের ক্ষেত্র আমার খুব কাছের বন্ধু এমাজ আর হামেদের কথাগুলা সইত্য হোক। আমরা একবার ফরেস্ট একাডেমির পথ ধইরা হাঁটার সময় তারা মজা করতে করতে কইছিলো৷ আমরা একদিন শুনবো, একজন হাইজ্যাকার পথচারিকে দাঁড় করায়ে, পথচারির ব্যাগ থেইকা মোবাইল, টাকা কিছু না নিয়া, শামসের কবিতার বই নিয়া পালায় গেছে।


দেশের বই পোর্টালে লেখা ও খবর পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments Box

দ্বিতীয়বারের মতো ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় শওকত হোসেন লিটু