ঈদ সাময়িকী ॥ ছোটোগল্প

অনুপমা চক্রবর্তীর ছোটোগল্প ‘ঈদকার্ড’

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০ | ১১:১৭ অপরাহ্ণ | 416 বার

অনুপমা চক্রবর্তীর ছোটোগল্প ‘ঈদকার্ড’

ঈদকার্ড
॥ অনুপমা চক্রবর্তী ॥

‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’- এ পাখি কোনপাখি! মনপাখি! ব্যাপারটা আসলে পুরোটা ক্ষেত্রবিশেষ মাত্র যার ফায়দা লুটে কিছু কাকতালীয় ঘটনা আবার কখনো স্বনির্ভর কোনো ব্যক্তি চেতনা। একে সহজ মনে করলে সহজ আবার জটিলভাবে ভাবলেও যেন কম যাওয়া যায় না। তবে প্রিয় মানুষটির কথা এক্ষেত্রে আপেক্ষিক বিষয় বলা যায়। কেননা, আজ যে প্রিয় কিছুকাল আগেও সে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি মুখ। মূলত, অতি প্রয়োজনের তাগিদেই এই শ্রেণিবৈষম্য, যেখানে প্রত্যেক ‘আমি’র মাঝে অন্য আমি সত্তার স্বার্থপরতার অনুভব। কিন্তু, এ স্বার্থপরতা কেন!

 

 

মানুষ মরে যায়, মানুষ চলে যায়, শূন্যস্থানটাও একসময় ভরাট হয়ে ওঠে শুধু প্রিয় মুখটির বেলায় অনুভূতিগুলোর বিশেষত্ব থেকে যায়, এরা জন্ম নিলেও মেয়াদোত্তীর্ণ হবার নয়; স্মৃতিতে যার জ্যান্তনিবাস।একটু তুলনা করলে লক্ষ করা যায়, ঘড়ির কাঁটা যেমন ডানদিকে যাবার আগে একটা হালকা কাঁপুনি দিয়ে বামে যায় তেমনি জীবনটাও হালকা কাঁপুনিতে ক্ষণে ক্ষণে স্মরণ করায় প্রিয়মুখ, প্রিয় ব্যক্তিত্ব। এ যেন দূরত্ব নয়, দূরত্বের মাঝে বুঝে নেয়া, মানুষটি কতটা জুড়ে আছে!
মাস তিনেক হলো প্রাণঘাতি করোনার কারণে নিজ গ্রামে ফিরেছে সেজুঁতি। প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে দুর্লভ সময় কাটানো, মা’র সাথে হরেক খাবারের আয়োজন করা, বন্ধু-বান্ধবের সাথে একঘেয়েমি ভার্চুয়াল সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনের পরও এক অসাড় আলস্য জীবনে ভর করেছে সে। চোখে মুখে তার গলা চেপে ধরা এক অসহনীয় অনিশ্চয়তা গ্রাস করে চলেছে দিনের পর দিন। এ যেন বোবাকান্না। না পারছে কাউকে বলতে না সহ্য করতে। কী নিয়ে এত কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটি!
করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ক্যাম্পাস বন্ধ হবার দুদিন আগে থেকে সেজুঁতি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও নিশাদকে পায়নি। নিশাদ তার একজন খুব ভালো বন্ধু, হয়তো এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু যা এত দিন বুঝতে না পারলেও এখন বেশ টের পাচ্ছে সে। প্রিয়মুখটিকে ঘিরে আকস্মিক এ সংযোগ বিচ্ছিন্নতা মানসিকভাবে আহত করলেও মনে মনে অনুভূতির লাগাম টেনে ছিল ভার্চুয়াল মাধ্যমটিকে শেষ আশ্রয় ধরে। কেননা, স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় খণ্ডকালীন এ সামাজিক দূরত্বের বোঝাটা কিছুটা লাঘব করেছে এ অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থা যেখানে দূরে থাকলেও পারস্পরিক আবেগ-অনুভূতির ভাগাভাগি চলে প্রায় সারাবেলা।
দিন গেল, সপ্তাহ গেল, মাস গেল কিন্তু কোনোভাবেই যে নিশাদের সাথে যোগাযোগ হলো না। ছেলেটি যেন অদৃশ্যের মাঝে হারিয়ে গেছে, বন্ধু-বান্ধব কারো কাছে তার কোনো খবর নেই। এদিকে তাকে কেন্দ্র করে করোনাকালীন মহামারি সেঁজুতিকে অনেকটা ভাবিয়ে তুলেছে হারানোর হতাশায়। দিন-রাত নিজেকে নানাভাবে পোড়াচ্ছে সে আবার অন্যদিকেও যেন অভিমান ছুঁড়ে দিয়ে যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছে – সে তাহলে ভুলে গেছে! তবে শত ভ্রান্তি নিয়েও মেয়েটি এবার এক নির্দিষ্ট সীমারেখায় নিশ্চল দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রলাপ বুনছে – নিশাদ, তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি, নিজের চাইতেও অনেক অনেক বেশি। বন্ধু বলে ঘনিষ্ঠ হলেও তাদের মাঝে বয়স এবং শিক্ষাবর্ষ দুটোতে ছিল বছর দুয়েকের ব্যবধান তাই হয়তো তুমি থেকে তুই সম্বোধনটা কখনো পথ অতিক্রম করতে পারেনি।
সামনে ঈদ, আর বেশি দেরি নেই। ডিজিটাল যুগের সভ্যতায় দাঁড়িয়ে সবাই যখন নিজস্ব ইনবক্সে ছোটো ছোটো ভাষায় নিজের মনের ভাব প্রকাশ করছে, সেজুঁতি তখন পাথর সমঅভিমান বুকে আগলে বসেছে একটা শক্ত কাগজ-কলম হাতে নিয়ে; খুব কষ্ট করে নিশাদের ঠিকানাটা জোগাড় করেছে এবার সে, একটি চিঠি দিতে চায়।

 

প্রিয় নিশাদ,
বাড়ি ফেরার আগে অনেক চেষ্টা করেও তোমার মুখটা দেখা হয়নি। হ্যাঁ,
ঠিক সেদিনের পর থেকে আমি আর দেখার চেষ্টাও করিনি, কারণ তুমি আমার পুরো কল্পনাজুড়ে ছিলে।
সেদিনের পর থেকে আমার আর তোমার সাথে দেখা হয়নি কিন্তু দেখেছি তোমায় অন্য মানুষগুলোর চেহারায়, চোখ নাক মুখটা মিলিয়ে মিলিয়ে। আমি দেখেছি তোমায়!
সেদিনের পর থেকে তোমার নম্বর থেকে আর কোনো কল আসেনি কারণ আমার সংযোগটা তুমি বিচ্ছিন্ন করেছিলে, সেই অভিমানে শতবার মুছে দিয়েও আবার নম্বরটা যত্ন করে তুলে রেখেছি।
ঠিক সেদিনের পর থেকে কতগুলো সন্ধ্যা কেটে গেল আমার, কিছু না বুঝলেই আগের মতো মোবাইল হাতে নিয়ে তোমার নম্বর খুঁজতে থাকি কিন্তু পরক্ষণে আবার সব মুছে দেই, আমার দুহাত উঠে যায় আল্লাহর দরবারে এ মহামারি যেন তোমাকে ছুঁতে না পারে, নিজের বিনিময়ে হলেও যে তোমার প্রাণভিক্ষা চাই আমার। আর কিছু না হোক তুমি বেঁচে থেকো, প্লিজ!
সেদিনের পর থেকে আমাদের আর যোগাযোগ হয়নি, হয়তো দূরত্বটাই কয়েকশ গুণ এগিয়ে গিয়ে সম্পর্কটা নিলামে উঠে সর্বস্বান্ত করে গেছে সব কিন্তু বিশ্বাস করো রেশটুকু আজো আমার আদ্য প্রান্তে ছুঁয়ে আছে।
আমায় কি একটু বলবে, নিশাদ! আকাশের ছোটো ছোটো তারাগুলোও তো অনেক দূরে থাকে, যারা অস্পৃশ্য হলেও আমার কাছে দেখতে অনেকটা স্পষ্ট। তুমি কী তাদের থেকেও দূরে আছো যে তোমাকে আর কোনোভাবে আমি দেখতে পাই না! এতই কী দূরত্ব!
ঠিকানা লিখে খামটি ডাকবাক্সে ফেলতে যাবে তখন ঠিক পেছন থেকে স্থানীয় ডাকপিওনের ডাক আসলো। সেজুঁতি পেছন ফিরল। হাতে একটা বড়োমাপের রেজিস্টার্ড খাম ধরিয়ে দিয়ে লোকটি চলে গেলেন। নিজের লেখা চিঠি তখন প্রায় ভুলে বসেছে সে, এমন অদিনে চিঠি! কে লিখবে! তাই কেমন যেন একটা অস্থির তা নিয়ে তড়িঘড়ি করে খামটি খুলল। একটি লালকার্ড যার সাথে আছে একটি চিঠি। কিন্তু কে লিখেছে চিঠিটি তাতে আর যেন মেয়েটির কোনো তাড়া নেই; মূলত, কী লেখা আছে সেটাই দেখার জন্য উদগ্রীব সে। প্রাণঘাতি করোনাকাল, প্রিয় মানুষটির কিছু হলো না তো! কিন্তু এ যুগে এত কিছুর ব্যবহার থাকতে চিঠিতেই বা কেন! নানা সংশয় নিয়ে পড়তে শুরু করল সেজুঁতি।
“না হয় একটু কষ্ট হলো তাও তো
শূন্য খাতায় আমি নামটি শক্তভাবে বসে গেল।
নিয়মিত দেখার ছলে প্রতিক্ষণটাই না হয় আমার হলো।
বিচ্ছিন্ন সংযোগে দূরত্ব যখন বেড়ে আকাশ পেল,
ঠিক উলটো রথেই পাহাড় বেয়ে ঝরনা জোড়া বয়ে গেল।
সবশেষে এই দূরত্বটুকু ছিল যে চ্যালেঞ্জ আমার
সম্পর্কটা হারতে গিয়ে জিতটা এলোপূর্ণ মায়ায়,
না বুঝেও যদি পারো আমায়
একটু তুমি বুঝ কায়ায়,
ভালোবাসা যে দূরত্ব সয়,
বিশ্বাস বুকে ধৈর্য রয়!”

 

নীরবে অঝোরে কেঁদে উঠল, মেয়েটি। শরীর বেয়ে কেমন যেন প্রশান্তিতে ক্লান্তি নেমে আসছে তার। দীর্ঘ উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের বোঝা এবার বুঝি কাঁধ থেকে কিছুটা নেমে এলো। এ কান্না কী তাহলে আনন্দের নাকি একটি গভীর সংশয় থেকে মুক্তির দীর্ঘশ্বাস! কিন্তু কেন! চিঠির কোনোপ্রান্তেই তো কারো নাম চোখে পড়ল না যা তার চলমান যন্ত্রণাকে কিছুটা লাঘব করতে পারে। তারপরও এই নামহীন চিঠিটির আকুতিতে সেজুঁতি নিজেকে কেন সাড়া দিল! তাহলে কী, না বুঝেও বুঝে নিল সে- ভালোবাসা দূরত্ব সয় যেখানে বিশ্বাস আর ধৈর্য এক সুতায় বাঁধা, অবিচ্ছিন্ন!
দু’পা এগিয়ে সামনে একটা গাছের ছায়ায় বসলো সেজুঁতি। এবার চিঠিটি ভাঁজ করে রেখে বেশ ভালোলাগা নিয়ে কার্ডটির দিকে চোখ পড়ল তার। লালকার্ডটি খোলামাত্র তীব্র একটা ঘ্রাণ অনুভব করতে পারলো, প্রিয় পারফিউমের। প্রিয় জিনিসগুলো তো একজনই জানে, সে আর প্রিয়জন ছাড়া কে! মৃদুহাসিতে চোখ নেমে এলো।
কার্ডটি ঈদ কার্ড, বর্ণ গন্ধে যেখানে অনেক ভালোলাগার অনুভব তারপরও মাঝখানটায় চোখপড়া মাত্র দীর্ঘ অপেক্ষার ঘানি ছেড়ে ফেলে কোয়ারেন্টাইনের যন্ত্রণাময় দিনগুলোর সমাপ্তি ঘটে যায়। পোস্ট না করা লেখা চিঠিটি হাতে নিয়েই সেজুঁতি পা বাড়ায় বাড়ির পথে।
“‘পাগলি আমার ঘুমিয়ে পড়েছে মুঠোফোন তাই শান্ত,
আমি রাত জেগে দিচ্ছি পাহারা মুঠোফোনের এই প্রান্ত।’
কবি, যথার্থ বলেছেন। ঈদ মোবারক।”


দেশের বই পোর্টালে লেখা পাঠাবার ঠিকানা : desherboi@gmail.com

Facebook Comments