ভাষাচিত্র ঈদ সাময়িকী

অদিতি চক্রবর্তী তৃণা’র পত্রসাহিত্য

সোমবার, ১৭ মে ২০২১ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ | 209 বার

অদিতি চক্রবর্তী তৃণা’র পত্রসাহিত্য

।। পত্রসাহিত্য ।।


 

সুরঞ্জন,
আগামী এগারোই জৈষ্ঠ্য আমার বিয়ের দিন ধার্য্য হয়েছে।মেয়ে হওয়ার এই এক জ্বালা। আর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া আরও বড় অভিশাপ। তোমার কাছে এসব নতুন কথা নয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হয়ে যে সংগ্রাম তুমি সেই নবম শ্রেণি থেকে করে যাচ্ছ, তার প্রতিটা মুহূর্ত আমার চোখে দেখা। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার এত চাপ সামলে তুমি রাতের দশটা/এগারোটা পর্যন্ত টিউশন করেছ। বাসায় এসে ক্লান্তি ভুলে আবার বসেছো বইতে মুখ গুঁজে। সেই নবম শ্রেণিতে ম্যাথ স্যারের বাসায় আমাদের পরিচয়। পড়ালেখায় তুমি বরাবর আমার থেকে ভালো ছিলে। প্রকৌশলী হওয়ার তীব্র ইচ্ছে ছিল দুজনের। পড়ালেখার খাতিরেই তোমার সাথে আমার আলাপ বাড়তে থাকে। সেই আলাপ একটা সময় বন্ধুত্বের বাঁধ ভেঙে প্রেমে পরিণত হয়। তোমার ব্যস্ত সময়ে আমার কোথাও জায়গা ছিল না। সপ্তাহে একবার রাস্তার ধারে ফুচকা না হয় ঝালমুড়ি খেতে যতটুকু সময় লাগে সেটুকু সময় ছিল তোমার আর আমার। তবুও তোমায় ছেড়ে যেতে পারিনি কখনো। তুমি বারবার আমায় তোমাকে ছাড়ার কথা বলতে। তুমি ভাবতে আমায় তুমি অবহেলা করছো। আমি কখনো তা মনে আনিনি। তাই হয়তো তোমার সাথে থেকে যেতে পেরেছিলাম। তোমার মুখে প্রথমবার তৃপ্তির হাসি দেখেছিলাম যেদিন তুমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে।সেদিন টিউশনের বেতন থেকে টাকা ভেঙে প্রথমবার তুমি আমায় একডজন নীল রঙের কাচের চুরি কিনে দিলে। তুমি বলেছিলে সেদিন পাঁচবছর পর তুমি পাশ করে বের হলে একটা চাকরির চেষ্টা করবে। ততদিনে আমিও অনার্স মাস্টার্স শেষ করে ফেলবো। সেদিন আমরা একে অপরকে সারাজীবন আগলে রাখার কথা দিয়েছিলাম, পাশে থাকার কথা দিয়েছিলাম। বেশ ভালোই যাচ্ছিল জীবন। সপ্তাহে একবার থেকে এখন দুইবার দেখা হতো আমাদের। একসাথে কত স্বপ্ন দেখি আমরা। সময় গুণতে থাকি। আর মাত্র একবছর, তিনশত পয়ষট্টি দিন… তারপর পাশ করে বের হলেই চাকরির চেষ্টা। এমন সময় চারদিকে শুরু হলো করোনার থাবা। লকডাউনে বিপর্যস্ত হয়ে গেল জনজীবন। বন্ধ হয়ে গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাবার চাকরিটা চলে গেল। অল্প আয়ে সংসার চলতো। সেই আয়ের রাস্তাও বন্ধ। টিউশনও বন্ধ। জমানো টাকা ভেঙে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে বাবা। তোমার অবস্থাও এর থেকে ভিন্ন কিছু নয়।শহরের বাসা ছেড়ে তোমরা চলে গেলে বাড়িতে। আমাদের যাওয়ারও কোনো জায়গা নেই। আত্মীয় স্বজনের একটাই কথা, মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিন। একবছর চোখের নিমিষেই পেরিয়ে গেল। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা হলো না। তোমরাও এলে না আর শহরে। করোনার প্রথম ঢেউ সামলাতে না সামলাতেই আবার দ্বিতীয় ঢেউ। এইবার বাবা নারাজ। গতবছর অনেক করে বাবাকে বুঝিয়েছিলাম। এইবার আর বাবার জেদের কাছে পেরে উঠলাম না। বিয়েতে মত দিতেই হলো।
আমাদের শেষ কবে দেখা হয়েছিল মনে পড়ে তোমার? আমাদের হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না। আর একসাথে বাঁচা হবে না, রং-বেরঙের স্বপ্ন দেখাও হবে না। গোধূলির মিষ্টি আলোয় তোমার সাথে হাঁটাও হবে না। তোমার হাত ছেড়ে এখন অন্যের হাতে হাত রাখতে হবে। তোমার পাশে থাকার কথা দিয়েছিলাম, পারলাম না সুরঞ্জন।
এই অতিমারী একদিন শেষ হবে। আবার সুস্থ পরিবেশে বুক ভরে নিশ্বাস ফেলবে মানুষ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে। আমরা পাশ করে বের হবো। তুমি চাকরি করবে। তোমারও একদিন সংসার হবে। কিন্তু আমাদের একবছরের সেই অপেক্ষা অনন্তকালের অপেক্ষা হয়ে যাবে। আমাদের না হওয়া সংসারটা ছাদে শুকানো কাপড়ের মতো বাতাসে দুলবে।জীবন বয়ে যাবে জীবনের নিয়মে। শুধু আমার আর তোমার মাঝেই জীবনের দাড়ি টানা হয়ে গেল। ভালো থেকে সুরঞ্জন।খুব ভালো থেকো।

 

ইতি
নীলাঞ্জনা

Facebook Comments Box